ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

জলমগ্ন জনপদে ক্ষত সরানোর লড়াই

জলমগ্ন জনপদে ক্ষত সরানোর লড়াই

সাহাদাত হোসেন পরশ, দুর্গত এলাকা থেকে ফিরে

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১৩:৩৭

মঙ্গলবার; কার্তিকের মেঘাচ্ছন্ন ভোর। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং ক্ষমতা দেখায় উপকূলে, তবে ঝাঁপটা এসে লাগে রাজধানীতেও। ফলে নিত্যদিনের ঢাকার কোলাহল তখনও পায়নি পূর্ণতা। সোমবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রাজধানীবাসীও সিত্রাংয়ের ঝাঁকুনি ভালোভাবেই টের পান। গতকাল সকালেও মিরপুর থেকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরের ঘাঁটি বাশারের উদ্দেশে আসতে আসতেও আগের রাতের আঘাতের পর বিধ্বস্ত নগরীর ছবি চোখে লেগে রইল। বেশ কিছু এলাকার সড়ক বিভাজকের ওপরে তখনও পড়েছিল গাছগাছালি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেঘ কেটে আকাশে আলোর রেখা।

ঘাঁটি বাশার থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এমআই-১৭ হেলিকপ্টার দুর্গত এলাকায় রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত। প্রথম গন্তব্য খুলনার মোংলা বন্দর ও আশপাশের এলাকা। ঢাকার আকাশরেখা পার হওয়ার পরই 'পাখির চোখে' যেন বিস্তৃত দিগন্তের দিকে সবার ক্যামেরা। হেলিকপ্টারের শব্দ ছাপিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা যেন ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব কষতে ব্যস্ত। নীলাকাশ আর সবুজের সমারোহ একাকার। শহর, নগর-বন্দর, নদীনালার ওপর দিয়ে ছুটে চলছে এমআই-১৭।
কোথাও কোথাও চোখে পড়ে মানুষের চিরায়ত ব্যস্ততা। কোনো কোনো সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ক্ষেতে কাজ করছেন কৃষক। এ যেন বাঙালির সহজাত সরল জীবনযুদ্ধ। কোনো বিপর্যয় হলেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়।

হেলিকপ্টারের জানালার স্বচ্ছ কাচ ভেদ করে কেউ ভিডিও করছিলেন। কেউ আবার তুলছিলেন স্থির ছবি। জলমগ্ন জনপদে ক্যামেরার চোখে কোথাও ধরা দিল ক্ষতচিহ্ন, আবার কোথাও ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। উপকূলজুড়ে আইলা, সিডরের মতো ভয়াবহ তাণ্ডব সিত্রাং চালাতে পারেনি। তবে যেটুকু ক্ষতরেখার দাগ বসিয়ে গেছে এর পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য বিমানবাহিনীর দুটি হেলিকপ্টার গতকাল বাংলাদেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব, দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার ওপর উড়ে মানুষ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ও ভিডিও ধারণ করে। সংবাদকর্মীরা অন্য আরেকটি হেলিকপ্টারে আকাশ থেকে দুর্গত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।

এমআই হেলিকপ্টার তখন মোংলা অভিমুখে- পথে পথে বৃক্ষরাজি, সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে নদী। সিত্রাংয়ের প্রভাবে সোমবার মধ্যরাত পর্যন্ত তুমুল বৃষ্টি হয়। এ কারণে বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর ঘিরে জমে থাকে পানি। হেলিকপ্টার যখন মোংলায় পৌঁছাল তখন বন্দরের চেনা ছবিটাও চোখে ধরা দিল- রংবেরঙের সারি, সেগুলোই আমদানি করা শত শত গাড়ি। পাশেই পণ্যবোঝাই কনটেইনার। পশুর নদে সুশৃঙ্খলভাবে নোঙর করে রাখা রকমারি জলযান। দৃশ্যপট বলে দেয়, ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কসংকেতের কারণে নিরাপদে এনে এসব জলযান নদীতীরে করছে নোঙর।

বেশ কিছু সময় মোংলা ও আশপাশের এলাকায় চক্কর দেওয়ার পর হেলিকপ্টার যাত্রা করে ভোলার চরফ্যাসনের দিকে। কৃষি ও জেলেভিত্তিক উপজেলা এটি। উত্তরে লালমোহন, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে শাহবাজপুর চ্যানেল ও মনপুরা এবং পশ্চিমে তেঁতুলিয়া নদী, দশমিনা ও গলাচিপা। ইতিহাস বলছে, প্রায় ঘূর্ণিঝড়ে চরফ্যাসনের কমবেশি ক্ষতি হয়। ১৯৪১ ও ১৯৭১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এ উপজেলার প্রচুর লোক হতাহত হন। ১৯৮৮ ও ১৯৯১ সালের বন্যাও এই অঞ্চলকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সিত্রাংয়ের প্রভাবেও চরফ্যাসন ও আশপাশের চরাঞ্চল বিশেষ করে পাতিলা, কুকরী-মুকরী এলাকায় জলোচ্ছ্বাস হয়েছে। চরফ্যাসনের বেশ কিছু এলাকায় আমনের ক্ষেত পানিতে ভেসে যেতে দেখা যায়। আবার কিছু এলাকায় ধমকা হাওয়ার প্রভাবে আমন ধানের ক্ষেতের বিশাল সবুজের সমারোহ লুটিয়ে পড়ে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে আমনের ধানের কুঁড়ি গজানোর কথা। অনেকে নদী-খালবিল পাড়ি দিয়ে দুর্গত এলাকায় ঘুরে দেখার সময় কোনো নদীতে জেলেদের মাছ ধরার ছবি চোখে পড়েনি। ইলিশ রক্ষার জন্য ২২ দিন মাছ আহরণ নিষিদ্ধ। তাই স্বাভাবিক কারণে কোনো জেলেকে নদীতে দেখা যায়নি। দুর্গত এলাকা ঘুরে নিরাপদে হেলিকপ্টার ঘাঁটি বাশারে পৌঁছালে সেখানে কথা বলেন ৩১ স্কোয়াড্রনের অধিনায়ক উইং কমান্ডার চৌধুরী আবুল বারাকাত। তিনি বলেন, সিডর ও আইলার মতো এবারের ঘূর্ণিঝড় বড় ক্ষতির কারণ হতে পারেনি। আমরা ভাগ্যবান। দুর্গত এলাকায় কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে সেটা সরেজমিন দেখতে এই রেকি করা হয়েছে।


জানা গেছে, সিত্রাংয়ের প্রভাবে সোমবার সন্ধ্যা থেকে কক্সবাজারের সমিতিপাড়া, কুতুবদিয়াপাড়া, চরপাড়া, পদনার ডেইল এলাকার পানি বাড়তে শুরু করে। এর পর ৮৪০ স্থানীয় বাসিন্দাকে বিমানবাহিনীর ঘাঁটি কক্সবাজারে আশ্রয় দেয়। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য গতকাল বিমানবাহিনীর দুটি হেলিকপ্টার ঢাকা ও যশোর থেকে আকাশে ওড়ে। দুর্গত এলাকার ক্ষয়ক্ষতির স্থিরচিত্র ও ভিডিও ধারণ করে। এসব ছবি ও ভিডিও যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত হস্তান্তরের মাধ্যমে ওই এলাকাগুলোতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে যথাযথ ধারণা দেওয়া হয়েছে। সিত্রাং-পরবর্তী বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য বিমানবাহিনীর পর্যাপ্ত বিমান ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বিমানবাহিনীর ঘাঁটি বাশারে 'কেন্দ্রীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র' আলাদা আলাদা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছে।



আরও পড়ুন

×