ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

বিমানে নিয়োগের প্রশ্ন ফাঁস

হোতার নাম নিচ্ছে না কেউ

হোতার নাম নিচ্ছে না কেউ

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১৩:৪৮

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় নিয়োগ কমিটির এক সদস্য জড়িত বলে জানা গেছে। প্রশ্ন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি কৌশলে মোবাইল ফোনে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে নেন। পরে ফাঁস চক্রের অন্য সদস্যদের মাধ্যমে তা যায় চাকরিপ্রার্থীদের কাছে, যাঁরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেন। এভাবে শতাধিক পরীক্ষার্থীর কাছে বিক্রি করা হয় নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন। তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া টাকার মধ্যে মাথাপিছু দেড় লাখ করে নেন পরীক্ষা কমিটিতে থাকা বিমানের ঊর্ধ্বতন ওই কর্মকর্তা। সে হিসাবে প্রায় দেড় কোটি টাকা গেছে তাঁর পকেটে। দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেলেও তাঁর নাম প্রকাশ করছেন না তদন্ত-সংশ্নিষ্ট কেউ।

প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০ 'চুনোপুঁটি'কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যারা সবাই বিমানের কর্মচারী। তাঁরা নিয়োগ কমিটির সদস্যসহ বিমানের ঊর্ধ্বতন বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে কাজের সূত্রে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে আওলাদ হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, এনামুল হক, হারুন-অর-রশিদ ও মাহফুজুল আলমকে গত ২১ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পরে আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন- বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অফিসের এমএলএসএস জাহিদ হাসান, উপমহাব্যবস্থাপকের (নিরাপত্তা) এমটি অপারেটর মো. মাসুদ, পরিচালকের (প্রশাসন) অফিসের এমএলএসএস সমাজু ওরফে সোবাহান, ওয়ার্কশপ হেলপার জাবেদ হোসেন ও ফ্লাইট অপারেশনের এমএলএসএস জাকির হোসেন।

এ ঘটনায় তদন্তের অগ্রগতি জানাতে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে ডিবি-প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, নিয়োগের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় ওই দিনই জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সমন্বয়ে বিমানের পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি লালবাগ বিভাগ। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় ফরিদপুর, গাজীপুর ও বিমানভবন থেকে আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ পর্যন্ত তাঁদের কাছ থেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র বিক্রির দেড় লাখ টাকা, নিয়োগপ্রার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া ৩২টি চেক, ১৭টি ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, ১৪টি স্মার্টফোন, মালিকানাবিহীন একটি মোটরসাইকেল, টাকার হিসাব রাখার তিনটি ডায়েরি, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের হার্ড ও সফটকপি এবং নিয়োগপ্রার্থীদের ৫৪টি প্রবেশপত্র জব্দ করা হয়েছে। প্রশ্নপত্র সরবরাহে এখন পর্যন্ত ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য মিলেছে।

ডিবি-প্রধান বলেন, গোয়েন্দা তথ্য, ডিজিটাল অ্যানালাইসিস, পুলিশ ও আদালতের কাছে গ্রেপ্তারদের দেওয়া জবানবন্দি এবং সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, চক্রটি বেশ কয়েক বছর ধরে নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত। এবারের নিয়োগের প্রশ্নপত্র মহাব্যবস্থাপকের (প্রশাসন) সার্বিক তত্ত্বাবধানে ফটোকপি হচ্ছিল পরিচালকের (প্রশাসন) কক্ষে। গ্রেপ্তার ৯ জন কীভাবে এই নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন পেয়েছেন এবং প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, সে বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে জাহিদ হাসান গত ২০ অক্টোবর প্রশ্নপত্র ফটোকপি করার সময় নিজের মোবাইল ফোনে ছবি তুলে নেন। সেই ছবি পাঠান তাঁর সহযোগী সমাজু ওরফে সোবহানের কাছে। পরে তাঁরা অন্যদের সহযোগিতায় নিয়োগপ্রার্থীদের কাছে সেই প্রশ্ন বিক্রি করেন। এর আগে ১৯ অক্টোবর মহাব্যবস্থাপক প্রশাসনের কক্ষে প্রশ্নপত্র চূড়ান্ত করার সময় প্রিন্ট করা প্রথম কপির ছবি তোলেন দায়িত্বশীল একজন। পরদিন প্রশ্নপত্র থেকে বিমানের লোগো মুছে ফেলে ৮০টি প্রশ্নে টিক চিহ্ন দিয়ে দু'জনের কাছে সরবরাহ করা হয়। ওই দু'জন মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যান। বিমানের এমটি অপারেটর গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, মাহবুব আলম ও মাসুদ হোসেন বেশ কয়েক বছর ধরে নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রশ্ন ফাঁসে জড়িত।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জবানবন্দিতে বিমানের ঊর্ধ্বতন কারও নাম এসেছে কিনা- জানতে চাইলে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জাতীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান। নিয়োগ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে তাঁরা একটি কমিটি করেন। কিন্তু কমিটির সদস্যরা তাঁদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেননি। তাঁরা দায় এড়াতে পারেন না। এ ঘটনায় যাঁদের দায় রয়েছে, যাঁরা প্রশ্ন ফাঁস করেছেন, তাঁদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এরই মধ্যে নিয়োগ কমিটির সদস্যদের কারও সঙ্গে ফোনে এবং কারও সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলেছে ডিবি।
গত ২১ অক্টোবর বিকেলে বিমানের ১২টি পদে নিয়োগের পরীক্ষা ছিল। এর আগের দিনই প্রতিষ্ঠানটির অসাধু কিছু কর্মী প্রশ্ন ফাঁস করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে কর্তৃপক্ষ নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল করে। প্রথম দফায় গ্রেপ্তার পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা হয়েছে। এর তদন্ত করছে ডিবি লালবাগ বিভাগ।

আরও পড়ুন

×