ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

এক কক্ষে দুই দলের কার্যালয় সভাপতির বসার ঘরও অফিস

এক কক্ষে দুই দলের কার্যালয় সভাপতির বসার ঘরও অফিস

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১৩:৪৯

রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পেতে সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয় থাকতে হবে। কিন্তু নিবন্ধন চেয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন করা অধিকাংশ দলেরই তা নেই। যেগুলোর কার্যালয় খুঁজে পাওয়া গেছে, সেগুলোও নামকাওয়াস্তে। কিছু দল নিবন্ধন পেতে ভূতুড়ে কমিটি করেছে। যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁরা জানেন না কমিটিতে কীভাবে নাম এলো!

১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০-ক ধারা অনুযায়ী, নিবন্ধন পেতে অতীতে কোনো একটি আসন পেতে হবে কিংবা যে কোনো একটি আসনে ৫ শতাংশ ভোট পেতে হবে। নতুন দলের ক্ষেত্রে সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও কমিটি, এক-তৃতীয়াংশ জেলায় কার্যকর অফিস এবং ১০০ উপজেলা বা মহানগরের থানায় ২০০ ভোটারের সমর্থনের প্রমাণ থাকতে হবে।

এক রুমে দুই অফিস :পুরান ঢাকার কোর্ট হাউস সড়কের ২৭ নম্বর বাড়ির নিচতলায় মুদি ও স্টেশনারি দোকান। দুই থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত উকিলদের চেম্বার। ষষ্ঠ তলায় একটি কক্ষে বাড়িটির তত্ত্বাবধায়ক পরিবার নিয়ে বাস করেন। আরেক কক্ষে দুটি টেবিল, চারটি চেয়ার, আলমারি ও বুকশেলফ রয়েছে। এই কক্ষকেই বাংলাদেশ ন্যাশনাল গ্রিন পার্টি নামে একটি দল কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে দাবি করে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে।

বুধবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, এই ঠিকানায় ন্যাশনাল গ্রিন পার্টি নামের দলটির অস্তিত্ব নেই। ভবনের বাকি ভাড়াটিয়ারাও দলটি সম্পর্কে জানেন না। ছয়তলার কক্ষে ভূমিহীন আন্দোলন নামে একটি দলের ব্যানার পাওয়া গেল। রুমে বসে এক ব্যক্তি ধূমপান করছিলেন। তাঁর নাম মোহাম্মদ ইকবাল আমীন। তিনিই এ বাড়ির মালিক।

আলাপে জানালেন, তিনি ভূমিহীন আন্দোলনের প্রধান উপদেষ্টা এবং ন্যাশনাল গ্রিন পার্টির উপনেতা। ন্যাশনাল গ্রিন পার্টির অস্তিত্ব না থাকলেও দলনেতা ও প্রতিষ্ঠাতা আবু বকর সিদ্দিক আলম চৌধুরীর এ কক্ষটিই তাঁর দলের প্রধান কার্যালয়। তিনি বলেন, ভূমিহীন আন্দোলন গ্রিন পার্টির সহযোগী সংগঠন। দুই সংগঠন মিলেমিশে কাজ করে। নামে ভিন্নতা থাকলেও এক জায়গা থেকেই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রতিটি জেলা-উপজেলায় কার্যক্রম চলছে আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে। একই কথা বলেন দলটির আহ্বায়ক ডা. মো. আবদুর রাজ্জাক।
ইকবাল আমীন বলেন, সবাই নিজ কাজে ব্যস্ত। কার্যালয়ে এখন কেউ নেই। গ্রিন পার্টি ও ভূমিহীন আন্দোলন- দুই দলেরই পৃথক গঠনতন্ত্র ও কমিটি রয়েছে। মতাদর্শে মিল থাকায় পরস্পরকে সহযোগিতা করে।

নিবন্ধন পেতে রাতারাতি কমিটি, ভূতুড়ে কমিটি :বঙ্গবন্ধু দুস্থ ও প্রতিবন্ধী উন্নয়ন পরিষদ সামাজিক সংগঠন থেকে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হতে চাইছে। দলটির প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা ময়মনসিংহের পুলিশ লাইন্সের কাশর এলাকায়।

কার্যালয়ে কথা হয় দলের সাধারণ সম্পাদক বদরুল আলম দুদুর সঙ্গে। তিনি জানালেন, নিবন্ধনের জন্য গত ১৪ আগস্ট আবেদন করেছেন। ২০১৭ সালেও আবেদন করেছিলেন। তাঁর দাবি- ২১ জেলা ও ১০৭ উপজেলায় কমিটি ও কার্যালয় রয়েছে। প্রামাণ্য নথি ইসিতে জমা দিয়েছেন।
কিন্তু নথিতে পাওয়া যায় অসংগতি। সব কমিটিই জুলাই থেকে ইসিতে আবেদনের তারিখ ১৪ আগস্টের মধ্যে গঠন করা। গত ১ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত ময়মনসিংহ মহানগর কমিটিতে আইন সম্পাদক হিসেবে মো. সজিব মিয়ার নাম রয়েছে। তিনি সমকালকে বলেন, সত্যিকার অর্থে কিছুই জানি না। না জানিয়েই কমিটিতে রাখা হয়েছে।

জামালপুর জেলা কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছে ফরিদ উদ্দিনের নাম। তিনি বলেন, মাস তিনেক আগে একজন ফোন করে বলেছেন, 'কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলবেন জানি।' আরেক সদস্য আতিকুল ইসলাম জানান, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের জামালপুর সদরের শাহবাজপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক। বিএনপির রাজনীতি করেন। বঙ্গবন্ধু দুস্থ ও প্রতিবন্ধী উন্নয়ন পরিষদের সঙ্গে যুক্ত নন। তাঁকে সদস্য করার খবরও জানেন না।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা শাখার সভাপতি করা হয়েছে ফুরকান মীরকে। তাঁকে যে সভাপতি করা হয়েছে, তা জানেন না। তিনি বলেন, 'ফোন করে বলা হয়েছিল, লোকজন গিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করবে।'
দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. হোসেন আলী বলেন, নিবন্ধন পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ঠিকানায় অফিস নেই :বাংলাদেশ ডেমোক্রেসি মুভমেন্টের কার্যালয়ের ঠিকানা রাজধানীর বাড়ি নম্বর ২৪, লেন ১, মিরপুর সেকশন ৬/বি। এ ঠিকানায় পুরোনো দিনের একটি তিনতলা ভবন পাওয়া গেল। প্রধান ফটকে বাড়ির মালিকের নাম লেখা গোলাম রহিম কাজী। পাশের বিডি লন্ড্রির কর্মীরা জানালেন, ভবনটি আবাসিক বাড়ি। এখানে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় আছে বলে শোনেননি। কখনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও তাঁরা দেখেননি।

গণতান্ত্রিক মুক্তি আন্দোলনের (বিজিএমএ) ঠিকানা দেওয়া হয়েছে পল্টনে মেহেরবা প্লাজা। ওই ঠিকানায় পাওয়া যায় দৈনিক নবচেতনার কার্যালয়। দলটির চেয়ারম্যান মো. আশরাফ হাওলাদার নিজেকে দৈনিক নবচেতনার কর্মী পরিচয় দেন। পত্রিকার অফিসকেই দলের কার্যালয় হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

হোমিওপ্যাথি চেম্বার কাম অফিস :অনেক খুঁজে মিরপুর ১০ নম্বরের ব্লক সির ২০ নম্বর রোডের ১২ নম্বর বাড়ির ফটকে নতুন বাংলার সাইনবোর্ড পাওয়া গেল। দলটি দলীয় প্রতীক হিসেবে একতারা চেয়েছে। সাইনবোর্ডে লেখা, 'কোনো সংঘাত সংঘর্ষ নয়/সমঝোতায় রাজনীতি হয়।'
ভবনের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, নতুন বাংলার কার্যালয় তালাবদ্ধ। দলের চেয়ারম্যান আকবর হোসেন ফাইটনকেও পাওয়া গেল না। পাশের টেইলার্স ও সেলুনের কর্মীরা জানালেন, মাস দুই আগে নতুন বাংলার সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। যে কক্ষটিকে দলীয় কার্যালয় বলা হচ্ছে, তা আসলে হোমিওপ্যাথির চেম্বার।

এক ভবনেই একাধিক কার্যালয় :বাংলাদেশ বিদেশ প্রত্যাগত প্রবাসী ও ননপ্রবাসী কল্যাণ দলের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে ৮৫/১, নয়াপল্টন মসজিদ গলিতে। এই ভবনে বাংলাদেশ লেবার পার্টির কার্যালয়। দ্বিতীয় তলায় এক কক্ষের কার্যালয়ে পাওয়া যায় প্রবাসী কল্যাণ দলের আহ্বায়ক আবু আহমেদ ভূঞাকে। তিনি এ ঘরেই থাকেন। এক কোনায় রান্নার ব্যবস্থা। তিনি জানালেন, নিবন্ধন পেতে আশাবাদী।

বাংলাদেশ জনমত পার্টির প্রধান কার্যালয়ের ঠিকানা ২৭/৮-এ (তৃতীয় তলা), তোপখানা রোড। এই ঠিকানায় দলটির অস্তিত্ব মেলেনি। তবে দলের আহ্বায়ক সুলতান জিসান উদ্দিন প্রধানের দাবি, এসি লাগাতে সাইনবোর্ড খোলা হয়েছে।

নিবন্ধন পেতে নাম পাল্টে আবেদন :কাঁটাবনের রোজভিউ প্লাজা বাংলাদেশ জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির ঠিকানা। এক কক্ষের কার্যালয়ে বসে দলটির চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসাইন সমকালকে জানান, আগে নাম ছিল বাংলাদেশ কর্মসংস্থান আন্দোলন। ওই নামে ২০১৭ সালেও নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছিলেন। না পেয়ে আদালতে করা রিট বিচারাধীন রয়েছে। তাই নাম বদলে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির নাম দিয়ে আবেদন করেছেন।

নাম বৈরাবরী পার্টি, সভাপতিও জানেন না দলের কথা :টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার পীর সৈয়দ আলমগীর দল খুলেছেন বৈরাবরী পার্টি নামে। দলের সভাপতি সিরাজী সৈয়দ মনোয়ার বৈরাবরী। অবশ্য তিনি জানান, দল গঠন ও নিবন্ধনের আবেদনের খবর জানেন না।
সৈয়দ আলমগীর ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন নিজেকে বৈরাবরী পার্টির যুগ্ম সম্পাদক ও মুখপাত্র পরিচয় দিয়ে। হাঁটুভাঙা বাজারে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। লেদার টেকনোলজিতে বিএসসি ডিগ্রিধারী সৈয়দ আলমগীর টাঙ্গাইল-৭ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় দল খুলতে চান। প্রতীক চান হূৎপিণ্ড।

দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নাম রয়েছে পীরজাদা আবদুল আলীম অভির। তিনি বলেন, সৈয়দ আলমগীর তাঁর মুরিদ। তিনি নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছেন, এটা জানেন। তবে কোথাও আবদুল আলীম অভি স্বাক্ষর দেননি।

প্রধানমন্ত্রী হতে চান রতন :জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে মুসকিল লীগের প্রধান কার্যালয়। রায়কালী ইউনিয়নের উপশিয়ালা-চন্দনগাড়ী গ্রামের রতন দলটির প্রধান। তাঁর বাড়িই দলের অফিস। তিনি এলাকায় মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে পরিচিত। নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পোস্টারও ছাপিয়ে ছিলেন। এখন তিনি কোথায় থাকেন, কীভাবে নিবন্ধনের আবেদন করেছেন তা দলের কেউ জানেন না।

বড় ভাই এনামুল হক জানান, সে এখন কোথায় আছে জানি না। শুনেছি রাজশাহী শহরে মোটরসাইকেল গ্যারেজে কাজ করছে। রতনের মা মাহমুদা বিবি বলেন, 'আমার ছেলে পাগল। অনেক দিন বাড়িতে ছিল না। কিছুদিন আগে এসেছিল।'
ফোনে যোগাযোগ হলে রতন বলেন, 'কারও পরামর্শে দল করিনি। মানুষের কথা ভেবেই দল গঠন করেছি। আগামী নির্বাচনে অবশ্যই মুসকিল লীগ জিতবে। আমার দল ক্ষমতায় যাবে। আমিই হবো প্রধানমন্ত্রী। আমাকে যারা পাগল ভাবে, তারাই পাগল।'

নামমাত্র অফিস :বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা গাজীপুরের শিববাড়ি-শিমুলতলী সড়কের শহীদ স্মৃতি স্কুল মার্কেটের তৃতীয় তলায়। পাশের দোকানি জানালেন গত তিন মাসে ওই অফিস এক দিন কিছু সময়ের জন্য খোলা হয়েছিল। অফিসে কাউকে আসতেও দেখেননি।

কার্যালয়ের সাটারে পুরোনো ব্যানারে লেখা, 'সুস্থ রাজনীতি-সুশাসনের ভিত্তি'। সম্প্রতি লাগানো নতুন সাইনবোর্ডে খেলা- 'সুস্থ রাজনীতি-গণতন্ত্রের ভিত্তি'। দলের চেয়ারম্যান উপাধ্যক্ষ ডা. একেএম ফজলুল হক হোমিও চিকিৎসক। তিনি জানালেন, সাটার নষ্ট হওয়ায় নিয়মিত অফিস খোলা যাচ্ছে না। তবে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দলের ১৪০ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি আছে। ২৫টি জেলায় আছে কমিটি।

সভাপতির বসার ঘরে কেন্দ্রীয় কার্যালয় :বাংলাদেশ বেকার সমাজের কার্যালয় কলাবাগানের ক্রিসেন্ট রোডের ১৩১/১/এ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলায়। বাড়িটি আসলে দলের সভাপতি মো. হাসানের বসতবাড়ি। বসার ঘরে ঝুলছে দলের ব্যানার।

মো. হাসান জানান, তাঁর দল ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান বেকার সমাজের প্রার্থী হয়ে কুমিল্লা-১০ আসনে ১০ হাজার ৫২৯ ভোট পেয়েছিলেন। যা প্রদত্ত ভোটের ৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ওই নির্বাচনে পটুয়াখালী-২ আসনে বেকার সমাজের প্রার্থী আবুল বাশার হাওলাদার ৮ হাজার ১৭৬ ভোট পেয়েছিলেন, যা প্রদত্ত ভোটের ৯ দশমিক ০২ শতাংশ।

মো. হাসান বলেন, যে কোনো একটি আসনে ৫ শতাংশ ভোট পেলেই একটি দল নিবন্ধনের যোগ্য। বেকার সমাজ তা পেয়েছে। তাই সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়, কার্যকর জেলা অফিস, কমিটি থাকার শর্ত এই দলের জন্য প্রযোজ্য নয়।

[প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সমকালের প্রতিবেদক কামরুল হাসান ও মাজহারুল ইসলাম রবিন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ইমরান হুসাইন, গাজীপুর প্রতিনিধি ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি মোস্তাফিজুর রহমান, জয়পুরহাট প্রতিনিধি শাহারুল আলম এবং মির্জাপুর প্রতিনিধি দুর্লভ বিশ্বাস




আরও পড়ুন

×