ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

নিভে যাচ্ছে ঝিলমিল প্রকল্পের আলো

নিভে যাচ্ছে ঝিলমিল প্রকল্পের আলো

অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৩ ডিসেম্বর ২০২২ | ২০:০৪

ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পের জন্য মালয়েশিয়ার বিএনজি গ্লোবাল কোম্পানিকে ১৬০ একর জমি দিয়েছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। তাদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এর ভিত্তিতে কোম্পানিটি নিজস্ব ব্যয়ে মধ্য আয়ের মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রায় ১৪ হাজার ফ্ল্যাট তৈরি করে দেবে। পাশাপাশি লেক, খাল, খেলার মাঠসহ নানা সুযোগ-সুবিধার অবকাঠামো তৈরি করবে। রাজউকের নির্ধারিত মূল্যে সেগুলো বিক্রি করে কোম্পানিটি তাদের নির্মাণ ব্যয় তুলে নেবে। চার বছরের মধ্যে এ কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু চুক্তির পাঁচ বছর পার হলেও একটি ইটও পুঁততে পারেনি কোম্পানিটি। এ অবস্থায় রাজউকে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বিএনজি গ্লোবাল কোম্পানি চুক্তি বাতিলও করছে না; নানা ওসিলায় কাজও করছে না। রাজউকের জন্য চুক্তিটি 'গলার কাঁটা'য় পরিণত হয়েছে। ফলে ঝিলমিল প্রকল্প নিয়ে যে আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখেছিল রাজউক ও নগরবাসী, তাও ধূলিসাৎ হওয়ার পথে।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদ সাদিক সমকালকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। এতে সিদ্ধান্ত হয়, রাজউক চেয়ারম্যান পূর্ত সচিব ও পিপিপিভিত্তিক এ প্রকল্পের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সঙ্গে দেখা করবেন। সেখানেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এক কর্মকর্তা বলেন, চুক্তি এমনভাবে করা হয়েছিল যে, এর শর্ত রাজউকের পক্ষে ছিল না। এ জন্য রাজউক এটা বাতিল করতে পারছে না। ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারছে না।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, চুক্তির পর বিএনজি গ্লোবাল বলে- পাইলিংগুলো মালয়েশিয়া থেকে তৈরি করে আনবে। এ ক্ষেত্রে তাদের শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। এতে সরকারের সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলো সম্মতি দেয়নি। কোম্পানিটি আরও দাবি করে, নকশার জন্য তারা রাজউককে কোনো ফি দেবে না; নকশার আবেদনও করবে না। রাজউককেই নকশা অনুমোদন-সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব পালন করতে হবে। যখনই রাজউকের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়েছে, তখন তারা কভিড, লকডাউনসহ নানা অজুহাত দেখিয়ে কাজ বন্ধ রেখেছে। অথচ ২০১৭ সালে চুক্তি হওয়ার পর দুই বছর কভিড ছিল না। সে সময় তারা প্রকল্পের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করতে পারত। সেটাও করেনি।

জানা যায়, চুক্তি অনুযায়ী কেরানীগঞ্জে ৪৮০ বিঘা জমিতে বিএনজি গ্লোবাল ৮৫টি বহুতল ভবন নির্মাণ করবে। ৬০টি ভবন হবে ২০ তলাবিশিষ্ট এবং ২৫টি হবে ২৫ তলার। মোট ফ্ল্যাট হবে ১৩ হাজার ৭২০টি। ফ্ল্যাটগুলোর আকার থাকবে ১ হাজার ৪০০ বর্গফুট থেকে ২ হাজার ২০০ বর্গফুটের মধ্যে। প্রতিটি ভবন হবে ভূমিকম্প প্রতিরোধী। ভবনগুলোতে ব্যবহার করা হবে সর্বাধুনিক নির্মাণ প্রযুক্তি। থাকবে লেক, পার্ক, খেলার মাঠ, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মসজিদ, বাজার ও কমিউনিটি স্পেস। সেগুলোও তৈরি করে দেবে কোম্পানিটি। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। রাজউক জানায়, রাজধানীর উপকণ্ঠে বৃহত্তর এ আবাসন প্রকল্পের মধ্যে এ ধরনের ফ্ল্যাট প্রকল্প নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, রাজধানীর ওপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমানো। কিন্তু সেখানে একটি সাইট অফিস ছাড়া কিছুই করা হয়নি। সেটিও করে দিয়েছিল রাজউক। সেই সাইট অফিসটিও বন্ধ। আশপাশে শুধুই কাশবন, গাছপালায় ভরা খালি মাঠ পড়ে আছে।

এ প্রকল্প সম্পর্কে রাজউকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে কোম্পানিটি ১০০ শতাংশ শুল্ক্ক মওকুফের জন্য আবেদন করেছিল। সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং এনবিআরকে চিঠি পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেই শুল্ক্কের পরিমাণ দাঁড়ায় বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। এই শুল্ক্ক মওকুফে সায় মেলেনি কারও।

এ প্রসঙ্গে বিএনজি গ্লোবাল কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মালয়েশিয়ার নাগরিক শরিফা সাবরিনার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। কোম্পানিটির ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি চীন, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শক্তি ও স্থাপত্য, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং নির্মাণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করে। অতীতে তারা কী কী কাজ করেছে, তার তথ্য নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এক কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়াভিত্তিক এ কোম্পানির পেছনে বাংলাদেশের এক মন্ত্রী কলকাঠি নাড়েন। ওই কোম্পানির প্রধান নির্বাহী শরিফা সাবরিনা মাঝেমধ্যে বাংলাদেশে আসেন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করেন।
এ প্রসঙ্গে রাজউক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিয়া বলেন, কভিড মহামারিতে ঘন ঘন লকডাউনের কারণে প্রকল্প কাজে বিলম্ব হচ্ছে। কখনও আমাদের দেশে লকডাউন, আবার কখনও কখনও মালয়েশিয়ায় লকডাউন ছিল। কোম্পানিটির সঙ্গে নতুন করে চুক্তির বিষয়ে ভাবছি। একটু সময় লাগবে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এক কর্মকর্তা চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, বিএনজি গ্লোবালের মান সম্পর্কে তাঁদের ধারণা স্পষ্ট হয়েছে। এ ধরনের কোম্পানির সঙ্গে আবার চুক্তি করলে রাজউক আরও বিপাকে পড়বে। চুক্তি বাতিল করাই রাজউকের জন্য কল্যাণকর। যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি বাতিলের চেষ্টাই রাজউককে করতে হবে। তা না হলে জমিও রাজউকের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।



আরও পড়ুন

×