সংসদ থেকে পদত্যাগ করলেন লতিফ সিদ্দিকী

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৫     আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৫   

সমকাল প্রতিবেদক

পবিত্র হজ ও তাবলিগ নিয়ে মন্তব্য করে মন্ত্রিত্ব ও আওয়ামী লীগের সদস্যপদ হারানো আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। আকস্মিকভাবেই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে বক্তৃতা শেষে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
 
সংসদ সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় পদত্যাগ করলেন টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের সাংসদ লতিফ সিদ্দিকী। প্রায় ১৫ মিনিটের বক্তৃতায় যুক্তরাষ্ট্র অবস্থানকালে হজ নিয়ে তার মন্তব্যের ব্যাখ্যাও দেন তিনি। এসময় সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন না।
 
এর আগে অষ্টম সংসদে অধিবেশন চলাকালে বিএনপির মাহী বি চৌধুরী পদত্যাগ করেছিলেন। তবে অধিবেশনে বক্তব্য দিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার নজির গড়লেন লতিফ সিদ্দিকী।
 
সংসদে দেয়া বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর বহিষ্কৃত সদস্য ও সাবেক টেলিযোগাযোগমন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী জানান, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সংসদ সদস্যপদ ছাড়লেন তিনি।
 
এর আগে গত ২৩ আগস্ট নিজের সংসদ সদস্য পদ থাকা না থাকার বিতর্কের শুনানিতে পদত্যাগ করবেন বলে জানিয়েছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওই শুনানিতে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, 'আমি এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করব। এটি নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই, শুনানির কিছু নেই।' তার এ বক্তব্য শুনে ৬ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানি ও আদেশের দিন ঠিক করে ইসি।
 
চলতি অধিবেশনের প্রথম দিনে মাগরিব নামাজের বিরতির পর অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন লতিফ সিদ্দিকী। এ সময় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। প্রথমে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ানোর জন্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও সাড়া পাননি লতিফ সিদ্দিকী।
 
পরে ফ্লোর পাওয়ার পর লতিফ সিদ্দিকী বলেন, 'আজ আমার সমাপ্তি দিন। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ জানাচ্ছি না। নতমস্তকে ক্ষমা চাচ্ছি, সবার কাছে। আমি মানুষের ভালোবাসায় বিশ্বাস করি।'
 
তিনি বলেন, 'আমার নেত্রীর অভিপ্রায়, আমি সংসদ সদস্য না থাকি।'
 
লতিফ সিদ্দিকী আরও বলেন, 'আমি মুসলমান, আমি বাঙালি, আমি আওয়ামী লীগার-এ পরিচয় মুছে দেওয়ার মতো কোন শক্তি পৃথিবীর কারো নেই। কারণ এ আমার চেতনা, আমার জীবনবোধ, প্রাণের রসদ, চলার সুনির্দিষ্ট পথ।'
 
ধর্ম ও হজ নিয়ে তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রচারণা সম্পর্কে লতিফ বলেন, 'আমাকে ষড়য্ন্ত্রকারী, প্রতিশোধপরায়ণ, ধর্মদ্রোহী, গণদুশমন ও শয়তানের রিপ্রেজেন্টেটিভ-এহেন ঘৃণার পাত্র সাজাতে সবশেষে ধর্মকে প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমি স্পষ্ট করে দৃঢ়চিত্তে বলতে চাই, আমি ধর্মবিরোধি নই। আমি ধর্মনুরাগী। একনিষ্ঠ সাচ্চা মুসলমান। ধর্মীয় অনুশাসনের নামে যে সকল গর্হিত কাজ ধর্মান্ধ-ধর্মব্যবসায়ী ও মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী যান্ত্রিকভাবে স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে তৎপর, তাদের বিরুদ্ধে শান্তির ধর্ম, ন্যায়ের ধর্ম, সত্যের ধর্ম, অন্ধকার থেকে আলোর পথে দিশার ধর্ম ইসলামের সঠিক তৎপরতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে অম্লান থাকবে আমার চলার পথ চলা।'
 
বক্তব্য শেষ করে যাওয়ার সময় তিনি কয়েক জন সাংসদের সঙ্গে করমর্দন করেন। লতিফ সিদ্দিকীর পদত্যাগপত্র গৃহীত হলে টাঙ্গাইল-৪ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হবে।
 
গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে পবিত্র হজ ও তাবলিগ নিয়ে মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন লতিফ সিদ্দিকী। এরপর প্রথমেই মন্ত্রিসভা থেকে তাকে বাদ দেয় সরকার। পরে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তার প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল করে দলটি। আর সবশেষ তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দু'পক্ষকে নিয়ে শুনানির আয়োজন করে ইসি।
 
উল্লেখ্য, টাঙ্গাইল-৪ আসনের চার বারের সাংসদ লতিফ সিদ্দিকী ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকারের বস্ত্র ও পাটমন্ত্রীর দায়িত্ব ছিলেন। টানা দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি।


টাঙ্গাইল-৪ আসনের এই সংসদ সদস্য ¯িক্সকারের অনুমতি নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার শেষ পর্যায়ে সংসদ  থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে পদত্যাগপত্রটি সংসদের কর্মীদের মাধ্যমে স্পিকারের কাছে পাঠান লতিফ সিদ্দিকী। নিজেকে মুসলমান, বাঙালি ও আওয়ামী লীগার বলে দাবি করে বক্তব্য শুরুর পর লতিফ সিদ্দিকী সবশেষে বলেন, 'আমার কোন আচরণে দেশবাসী দুঃখ পেয়ে থাকলে দেশবাসীর কাছে নতমস্তকে ক্ষমা চাচ্ছি। আমি আমার আসন থেকে পদত্যাগ করছি।'