ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

জিঙ্ক ধান মাঠে নেই আছে গবেষণায়

জিঙ্ক ধান মাঠে নেই আছে গবেষণায়

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ২৩:২৩

জিঙ্কসমৃদ্ধ চালের ভাত খেয়ে মেটানো যাবে পুষ্টির ঘাটতি- এমন লক্ষ্য নিয়ে তিন দশকের বেশি সময় গবেষণা করছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। ঢাকঢোল পিটিয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ নতুন ধানের জাত উন্মোচন হলেও সেগুলো এখনও কৃষক মনে জায়গা পায়নি। কয়েকটি জাত মাঠে চাষ হলেও সেই চাল পাওয়া যায় না বাজারে। আর এ সুযোগে বাজারে পুষ্টিহীন সরু চালের জয়জয়কার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্য চাহিদা পূরণে উচ্চ ফলনশীল সাদা চালের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তবে নানা ভিটামিনের ঘাটতি পূরণে সময় এসেছে ভাতের মাধ্যমেই মানুষকে পুষ্টি দেওয়ার। সব সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপে জিঙ্কসমৃদ্ধ জাত বড় পরিসরে চাষাবাদ সম্ভব। আর মানুষের অভ্যাস বদলাতে প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা।

পুষ্টির ঘাটতি: দেশের শিশু ও নারীরা উল্লেখযোগ্য হারে একাধিক অণুপুষ্টিকণা বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতিতে ভুগছেন। এর মধ্যে অধিকাংশ নারী ভিটামিন ডির স্বল্পতায় আছেন। নারীদের মধ্যে জিঙ্ক, আয়োডিন, ফলিক এসিড ও আয়রনের ঘাটতিও দেখা গেছে। দ্বিতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ২০১৯-২০ এর ফলাফলে বলা হয়েছে, অন্তঃসত্ত্বা নন কিংবা সন্তানকে বুকের দুধ দিচ্ছেন না- এমন নারীদের মধ্যে ৭০ শতাংশই ভিটামিন ডির স্বল্পতায় ভুগছেন। প্রায় ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুদের এবং ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশ নারীর মধ্যে জিঙ্কের ঘাটতি রয়েছে। নারীদের মধ্যে আয়োডিনের ঘাটতি রয়েছে ৩০ শতাংশের, ফলিক এসিডের ঘাটতি রয়েছে ২৯ শতাংশের এবং আয়রনের ঘাটতি রয়েছে ১৪ শতাংশের। দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ শিশু জিঙ্কের ঘাটতিজনিত কারণে খর্বাকৃতি হচ্ছে।

বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের পরিচালক ডা. জুবাইদা নাসরীন বলেন, যেসব অঞ্চলে জিঙ্কের অভাবজনিত সমস্যা বেশি, সেসব অঞ্চলের মানুষের মধ্যে জিঙ্কসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণের জন্য প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালানো উচিত। পাশাপাশি ওই সব অঞ্চলে খাদ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জিঙ্কসমৃদ্ধ চাল অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

কৃষি তথ্য সার্ভিস জানিয়েছে, বাংলাদেশে যেভাবে ভাত খাওয়া হয়, তাতে প্রতি ১০০ গ্রাম চাল থেকে প্রায় ১২৯ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। এর মধ্যে জিঙ্ক থাকে ১ দশমিক ১ গ্রামের মতো। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে জিঙ্কের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৮ থেকে ১২ মিলিগ্রাম। জিঙ্কসমৃদ্ধ চাল শরীরে জিঙ্কের চাহিদার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করতে পারে।

মাঠে যাচ্ছে না উদ্ভাবিত জাত: ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবনের যাত্রা শুরু করে। ভাতের মাধ্যমে জিঙ্কের অভাব দূর করতে এখন পর্যন্ত তারা সাতটি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এ জাতগুলো জিঙ্ক চাহিদার ৭৫ শতাংশ পূরণ করতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) জিঙ্কসমৃদ্ধ উচ্চফলনশীল আমনের একটি জাত 'বিনা ধান-২০' উদ্ভাবন করেছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ পর্যন্ত উদ্ভাবন করেছে ১৬টি জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত। ঘটা করে জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্তের খবর প্রচার হলেও মাঠে এসব ধানের হদিস নেই। পুষ্টিসমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধু ধান-১০০ সাড়া ফেললেও তার তেমন কোনো জাত মাঠে নেই। ফলে কৃষক এখনও সাধারণ জাতের ধানই আবাদ করে যাচ্ছেন। আবার সাধারণ চালেও যে পুষ্টিগুণ থাকার কথা, তা ছাঁটাই করে বাজারজাত করা হচ্ছে। ছাঁটাই করতে গিয়ে দেশে বছরে ১৬ লাখ টন চাল নষ্ট হচ্ছে বলে জানান খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। তিনি বলেন, গ্রাহকরা জিঙ্ক চালের জন্য উৎসাহ দেখান না। কৃষকরাও এই ধান চাষে আগ্রহী নন। কারণ জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের চাল মোটা। গ্রাহক চিকন আর চকচকে চাল পছন্দ করেন। তিনি বলেন, আজকাল আমরা রাসায়নিকভাবে তৈরি করা জিঙ্ক খাচ্ছি। কিন্তু ভাতের মাধ্যমে যে এই উপাদানটি আমরা প্রাকৃতিকভাবে পেতে পারি, তা জানি না। এই বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা দরকার।

অভিযোগ রয়েছে, বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অনীহা আর হাইব্রিডের দাপটে গবেষণার সাফল্য কৃষকের মাঠে যাচ্ছে না।

একদিকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে উদ্ভাবিত পুষ্টিসমৃদ্ধ ধান চাষ হচ্ছে না, আবার অন্যদিকে চালে আলাদা পুষ্টি মেশানোর ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের 'ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট' (ভিডব্লিউবি) কর্মসূচিতে চালে বিশেষ পদ্ধতিতে পুষ্টি বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর জন্য খরচ ধরা হয়েছে ৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। খাদ্যবান্ধব এ কর্মসূচির আওতায় বছরে ১০ লাখ ৪০ হাজার দুস্থ নারীকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে।

ব্রির মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবির বলেন, জিঙ্কসমৃদ্ধ জাত মাঠ পর্যায়ে দ্রুত সম্প্রসারণ ও সরকারিভাবে উৎপাদিত জাতগুলোর ধান ক্রয় ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় ব্রি সদর দপ্তর ও ১১টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে কৃষকের মাঠে প্রদর্শনী স্থাপন করে বীজের প্রাপ্যতা সহজলভ্য করতে হবে।

কী বলছেন নীতিনির্ধারক, গবেষক ও উদ্যোক্তারা :রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল রোববার 'বায়োফর্টিফাইড জিঙ্ক রাইস সম্প্রসারণের মাধ্যমে অপুষ্টি দূরীকরণে সম্ভাব্যতা ও করণীয়' শীর্ষক আলোচনা সভায় নানা পরামর্শ ও সুপারিশ তুলে ধরেন নীতিনির্ধারকরা। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইম্প্রুভড নিউট্রিশন (গেইন) বাংলাদেশ এ আলোচনা সভার আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল এম্পিরিক রিসার্স লিমিটেড।

এতে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, উদ্ভাবিত জাত কৃষকের হাতে যেতে অনেক ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ বছর লেগে যাচ্ছে। ১৫ বছর আগে উদ্ভাবন করা জাত এখনও মাঠে যায়নি। এটা সহজভাবে নেওয়া যায় না। নানা রকম প্রকল্প ও বরাদ্দ দেওয়ার পরও কাজ হচ্ছে না। জাতগুলো মাঠে নিতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুপরিকল্পিত টার্গেট নিয়ে আমরা কাজ করব।

কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তার বলেন, দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমছে। মানুষ আর আগের মতো কাজ করতে পারে না। অপুষ্টি দূরীকরণের জিঙ্ক চাল এখন সময়ের দাবি। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এ ঘাটতি পূরণ করতেই হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, গত বছর ৭২ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের চাষ হয়েছে। তবে জাতগুলোর চাল মোটা। এ চালে মিলারদের আগ্রহ কম।

এসিআই এগ্রিবিজনেসের প্রেসিডেন্ট ড. ফা হ আনসারি বলেন, অনেক মেগাভ্যারাইটি রয়েছে, যেগুলোতে কৃষক ও মিলারদের আগ্রহ বেশি। সে জাতগুলোতে জিঙ্ক ঢোকানো যায় কিনা, তা দেখা প্রয়োজন।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন গেইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. রুদাবা খন্দকার, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. শেখ মোহাম্মদ বখতিয়ার, বাংলাদশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যান আব্দুলল্গাহ সাজ্জাদ, বিনার মহাপরিচালক মির্জ্জা মোফাজ্জল ইসলাম প্রমুখ।

আরও পড়ুন

×