মালিকরা গা ঢাকা দিয়েছেন বিপদে ১২ হাজার শিক্ষার্থী

বন্ধ দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০১৬   

সাবি্বর নেওয়াজ

সনদ বিক্রি, মালিকানার দ্বন্দ্ব ও নানা অনিয়মের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া বেসরকারি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ হাজার শিক্ষার্থী অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির পুরো কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় শিক্ষাজীবন শেষ করা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। দাবিদার চার মালিকপক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিদের সবাই গা-ঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কর্মকর্তারাও তাদের খুঁজে পাচ্ছেন না। মালিকদের হদিস না মেলায় শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তিও অনিশ্চিত। গত কয়েকদিন দারুল ইহসানের ধানমণ্ডির প্রধান ক্যাম্পাসসহ কয়েকটি ক্যাম্পাস ঘুরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

কয়েকটি সূত্র জানায়, মালিকপক্ষ সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পাসগুলোর সাইনবোর্ডও সরিয়ে ফেলেছে। সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আসবাবপত্রও। এখন দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এখানে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছিল। ব্যাংকে জমা বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকেও তুলে নেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা। সনদ বিক্রিসহ নানা অনিয়মের কারণে ২৫ জুলাই হাইকোর্ট দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধের আদেশ দেন।

আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে পরদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিশ্ববিদ্যালয়টির ১৩৫টি ক্যাম্পাসের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে।

সমকালের সঙ্গে আলাপকালে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা জানান, হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ায় তারা মহাবিপাকে পড়েছেন। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ।

দিশেহারা শিক্ষার্থীরা: বিশ্ববিদ্যালয়টির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের নবম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী গাজী আফিকুজ্জামান সমকালকে জানান, তার অনার্স ক্লাস প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন তিনি কোথায় যাবেন? দারুল ইহসান থেকে অন্য কোথাও ভর্তি হওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া এখান থেকে ক্রেডিট ট্রান্সফারেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। সব ক্যাম্পাস বন্ধ রয়েছে। ভিসি স্যারসহ সবার মোবাইল ফোন বন্ধ। শিক্ষক, অফিস সহকারী কেউ ফোন ধরছেন না। বিবিএ শেষ সেমিস্টারের ছাত্র মনিরুজ্জামান বলেন, আউটার ক্যাম্পাস বন্ধ হওয়া অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্রেডিট ট্রান্সফার করে মূল ক্যাম্পাসে আসতে পারছেন। কিন্তু আমরা কী করব? এখন অন্য কোথাও ভর্তিও হতে পারব না।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, রেজিস্ট্রারসহ সিনিয়র শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে জনসংযোগ কর্মকর্তা বলেন, আমরা খুব বেকায়দায় আছি। একদিকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চাপ; অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন আমাদের খুঁজছে। তিনি বলেন, সরকার সময় না দিয়ে এভাবে ক্যাম্পাস বন্ধ করায় নিয়মিত প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন হুমকির মুখে পড়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা শেষ করা পর্যন্ত সময় দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

সিদ্ধান্তহীন মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি: সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে দারুল ইহসানের বৈধ-অবৈধ ক্যাম্পাস ছিল প্রায় ১২০টি। ক্যাম্পাসগুলোয় প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছিলেন। তবে অধিকাংশ ক্যাম্পাসে সনদ বিক্রি করা হতো বলে জোরালো অভিযোগ ছিল। পুরো কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার পর গত দুই মাসেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত ১২ হাজার শিক্ষার্থীর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা ইউজিসি।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকালকে বলেন, দারুল ইহসান অসংখ্য শাখা খুলে সনদ বাণিজ্য করছিল। আমরা বন্ধ করে দিয়েছিলাম; কিন্তু তারা স্টে অর্ডার নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। সর্বশেষ হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী আইনগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধসহ সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আইন লঙ্ঘন করার কারণেই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল জানিয়ে নাহিদ বলেন, এজন্য ক্ষতিগ্রস্তদের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। যে শিক্ষার্থীর লেখাপড়া মাঝপথে থেমে গেছে, সে কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করতে পারবে। ক্ষতিপূরণ পেতে সরকার সহযোগিতা করবে বলে মন্ত্রী জানান।

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান সমকালকে বলেন, শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনও আসেনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সনদ নিয়ে বিভ্রান্তি:  হাইকোর্টের নির্দেশে বন্ধ হওয়ার পর বিতর্কিত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে সব সনদ অবৈধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউজিসি। এতে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি বিপদে পড়েছেন। একই সঙ্গে ২০০৬ সালের পর এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরিরতদের ব্যাপারে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের আলোকে তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দারুল ইহসান কর্তৃপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেছে। তারা যাই করুক, ইউজিসি হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী আপাতত এই সিদ্ধান্তে বহাল থাকবে।

জব্দ হচ্ছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পত্তি: বিশ্ববিদ্যালয়টির ব্যাংক হিসাব ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, দারুল ইহসানের সম্পত্তি জব্দ করতে পৃথক চারটি কমিটি করা হয়েছে। কমিটি শিগগির কার্যক্রম শুরু করতে ইউজিসিকে চিঠি দিয়েছে।

অতিরিক্ত সচিব হেলালউদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীরা ক্ষতিপূরণের টাকা কীভাবে পাবেন তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। গঠিত চারটি কমিটির সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাব এবং সাভার ও ধানমণ্ডির স্থাবর সম্পত্তি কীভাবে জব্দ করা যায় তা নিয়েও কাজ করবেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আদালতের নির্দেশে বন্ধ হওয়ার দিনেই চারটি মালিক গ্রুপ তাদের হিসাব থেকে লাখ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে। তাদের কোনো অ্যাকাউন্টেই এখন কোনো টাকা নেই বলে আমরা জেনেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি কী অবস্থায় আছে তা জানতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান আরও বলেন, 'দারুল ইহসানের কোনো পক্ষকেই তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। কেউ কেউ দেশের বাইরে চলে গেছেন। তাহলে শিক্ষার্থীরা কার কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করবেন? এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে উদ্যোগ নেবে ইউজিসি তা ধরে কাজ করবে। যদি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করতে হয়, প্রয়োজনে তা করা হবে।'