নারীর ক্ষমতায়নে এগিয়ে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০১৭   

নাহিদ তন্ময়

মেধা-মননে এগিয়ে যাচ্ছেন নারী। কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করছেন। দেখাচ্ছেন কৃতিত্ব। নারীরা এখন রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, পর্বত জয় করছেন, অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন অর্থনৈতিক উন্নয়নে। সব ধরনের খেলায়ও পুরুষের পাশাপাশি আজকের নারীরা পারদর্শিতা দেখাচ্ছেন। নারী অধিকার ও ক্ষমতায়নে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।

তবু পরিবার ও সমাজে নারীর স্থান এখনও পুরুষের সমকক্ষ নয়। পুরুষশাসিত সমাজ মনে করে, পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে নারীর মতামতের খুব প্রয়োজন নেই। ফলে নারী তার ন্যায্য অধিকার এখনও পাননি। নারীর পথচলায় এখনও অনেক বাধা রয়েছে সমাজে। সুষ্ঠু কর্মপরিবেশের অভাব, বখাটের উৎপাত, যৌন হয়রানি, কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার মানসিকতার অভাবসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এখনও নারীকে পেছনে টানছে। ধর্ষণ, যৌতুকের জন্য নারী নির্যাতন এখনও নিত্যদিনের চিত্র। এ অবস্থায় আজ ৮ মার্চ বুধবার উদযাপিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য_ 'নারী-পুরুষ সমতায় উন্নয়নের যাত্রা, বদলে যাবে বিশ্ব কর্মে নতুন মাত্রা'। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

সমান অধিকার, মর্যাদার প্রশ্নে নারীরা তৎপর। সার্বিক বিচারে সমাজের প্রতিটি পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্রবাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিভিন্ন কারিগরি ক্ষেত্রে নারীরা উচ্চপদে রয়েছেন। দেশের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যুক্ত রয়েছেন অনেক নারী। ক্রিকেট, ফুটবলসহ পর্বতশৃঙ্গ জয়েও এগিয়ে এসেছেন নারীরা।

কুসংস্কারকে কাজে লাগিয়ে নারীকে অধিকারবঞ্চিত করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার কারণে সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে নারীর পদচারণা দ্রুতহারে বাড়ছে। সব পেশায়ই এখন নারীরা কাজ করছেন। নারী পুলিশ সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তি মিশনে কাজ করছেন। শিল্প প্রতিষ্ঠায়ও ভালো করছেন নারীরা। সরকার নারী উদ্যোক্তাদের বিনা জামানতে ও স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে। যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে যুব নারী-পুরুষকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ঋণ দিচ্ছে। এতে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বছরে বিপুলসংখ্যক নারী চাকরি নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন।

জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান মমতাজ বেগম বলেন, নারীরা পাহাড়সম বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে এখনও প্রতিনিয়ত নারীকে ঘরে-বাইরে নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

কিছু হতাশা থাকলেও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অর্জন অনেক। নারীর অগ্রগতির নানা সূচকে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। নারী-পুরুষের সমতা (জেন্ডার ইক্যুইটি) প্রতিষ্ঠায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে আছে বাংলাদেশ। আর বিশ্বের ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭২তম। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডবিল্গউইএফ) ২০১৬ সালের গেল্গাবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্সে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানের অবস্থান নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়। প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান ৮৭তম। ডবিল্গউইএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ বছরে বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে ১৯ ধাপ ওপরে উঠে এসেছে।

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৬টি দেশের নারীর আর্থসামাজিক অবস্থান তুলে ধরতে ২০১৫ সালে একটি জরিপ চালায় প্রযুক্তিভিত্তিক লেনদেন সেবা প্রদানকারী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান মাস্টারকার্ড। 'ইনডেক্স অব উইমেন্স অ্যাডভান্সমেন্ট' (আইডবিল্গউএ) শীর্ষক ওই জরিপে মূলত শিক্ষা গ্রহণ করে নারীরা কর্মসংস্থান বা নেতৃত্বে কতটা আসতে পারছে, সে চিত্রই উঠে আসে। জরিপে দেখা যায়, কর্মসংস্থান, সক্ষমতা এবং ব্যবসা ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব_ এ তিন সূচকেই বাংলাদেশের নারীরা এগিয়েছেন। তিনটি সূচকেই পুরুষের সঙ্গে নারীর ব্যবধান কমেছে।

কর্মসংস্থান সূচকে বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনাম। শিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীরা নিজেদের উপযোগী করার ক্ষেত্রে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে এগিয়ে আছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। সরকার নারীর ক্ষমতায়ন ও তাদের উন্নয়নে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। নারীর উন্নয়নে অধিকার আদায়ে কাজ করছে বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন। এর পরও অধিকারবঞ্চিত নারী। ঘরে-বাইরে এখনও নির্যাতিত হচ্ছেন নারী। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যেসব পুরুষ নারী অধিকারের কথা বলছেন, ঘরে গিয়ে তারাই আবার স্ত্রীকে পূর্ণ মর্যাদা ও অধিকার দিচ্ছেন না। ঘরের ভেতরই নারীরা সমান অধিকার ও মর্যাদা আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছেন। এমনটাই উঠে আসে পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে।

'ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইম্যান সার্ভে ২০১৫' শীর্ষক এ জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিবাহিত নারীদের ৮০ দশমিক ২ শতাংশ স্বামী ও শ্বশুরপক্ষীয়দের দ্বারা কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার। সে নির্যাতন শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক বা যৌন হতে পারে। শহর এলাকায় এ হার ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকায় ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ৪১ শতাংশ নারী স্বামীর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিটি পেশায় বাংলাদেশের নারীরা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। অব্যাহতভাবে দৃশ্যমান, অদৃশ্যমান ভূমিকা রেখে চলেছেন; কিন্তু বিস্ময় ও উদ্বেগের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করি, নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়ে আমাদের জাতীয় পর্যায়ে অর্থাৎ রাজনৈতিক মহলে, জাতীয় সংসদে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয় না। সরকার ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আজ সময় এসেছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করার। এ কর্মপরিকল্পনা হবে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, প্রতিকার ও নির্মূলের কর্মসূচি, যার মাধ্যমে নারীর মানবাধিকার স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এতে এ পরিবর্তিত অর্থনীতির বিশ্বে নারীর টিকে থাকা, অংশগ্রহণ ও ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।

নারীর অধিকার আদায়ে জড়িত আন্দোলনকারীরা বলছেন, সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও যুগে যুগে নারীরা তাদের অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। সেটা রোধ করতে হবে। বঞ্চনার এ গ্গ্নানি থেকে মুক্তি পেতে অধিকার, মর্যাদায় সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সব ধরনের পেশায়ই নারীর অংশগ্রহণ আরও বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ অধিকার, মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমানে সমান হওয়া চাই, চাই কর্মক্ষেত্রে সমান অংশগ্রহণ। আর নারী-পুরুষ সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিরও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নের মডেল। কিন্তু এখনও তারা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। শুধু সরকারের চেষ্টায় এ নির্যাতন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসনে সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। নারীর উন্নয়ন বিষয়ে সরকার বদ্ধপরিকর।

প্রতিমন্ত্রী চুমকি বলেন, নারীর উন্নয়নে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছে সরকার। বর্তমানে প্রায় দুই কোটি নারীকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রমে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। সেলাই-ফোঁড়াই থেকে শুরু করে ড্রাইভিংসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে ২৫০ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে পাস করা হয়েছে। জয়িতাসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় নারীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। শিক্ষিত নারীর সংখ্যা বাড়ছে। দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়ায় পরিবারে অবস্থা পরিবর্তন হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নারীকে সাহসী করে গড়ে তুলছে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকার ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করেছে। এ ছাড়া নারী নীতি, মানবপাচার সংক্রান্ত আইন, পর্নোগ্রাফি আইন, শিশু নীতিসহ অনেক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।