সেপ্টেম্বর অন টেকনাফ রোড!

মৃত্যু উপত্যকা থেকে দলে দলে পালিয়ে আসছে রোহিঙ্গা

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭     আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭      

রাজীব নূর ও আবদুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার) থেকে

এ যেন সেই সেপ্টেম্বরের পুনরাবৃত্তি। টেকনাফ রোডের ৩০ কিলোমিটারের মতো পথ ঘুরে দেখার সময় বারবার মনে পড়ছিল অ্যালেন গিনসবার্গের অমর কবিতা 'সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড'। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যশোর রোড ঘুরে গিয়ে কবিতায় বাংলার শত শত মানুষের কলকাতার দিকে ছুটে যাওয়ার মর্মস্পর্শী বিবরণ দিয়েছিলেন গিনসবার্গ। 


এতকাল শরণার্থী জীবনের সেই সব গল্প ছিল শুধুই অন্যের কাছ থেকে শোনা, পড়ে পড়ে জানা। হাল আমলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটে যাওয়া শরণার্থীদের কিছু ছবিও দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু টেকনাফ রোডে এসে মনে হলো হালের সেই সব ঘটনা ছাড়িয়ে গেছে মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয়ের খুঁজে আসা রোহিঙ্গাদের সমস্যা। নিজ দেশের মানুষকে উচ্ছেদ করার যাবতীয় নৃশংসতার উদাহরণ মিয়ানমারে এসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। মাত্র দু-একদিন আগে নিউইয়র্ক 

টাইমসের হানা বিচ এমনটাই লিখেছেন। তার লেখা হুবহু অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, 'আমি যখন বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের সীমান্ত দিয়ে হাঁটছিলাম, তখন হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে দেখলাম। আমি এর আগেও শরণার্থী সমস্যা নিয়ে অনেক প্রতিবেদন লিখেছি। এটিই আমার দেখা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শরণার্থী সমস্যা। আমি শুধু দেখেছি অবিরাম মানুষ আসছে, কাদা এবং বৃষ্টির ঢলের মধ্যে। যারা ভাগ্যবান তারা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস, যেমন চাল-ডাল, সৌরবিদ্যুতের প্যানেল এবং পানির পাত্র বহন করছিল। অভাগারা কিছুই নিয়ে আসতে পারেনি।'


গতকাল বুধবার সকাল ৬টার আগে আগে টেকনাফ বাসস্ট্যান্ডে নামতেই এমন অভাগাদের একটি দলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। রোহিঙ্গাদের ওই দলটি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আবু সিদ্দিক মার্কেটের বারান্দায় অপেক্ষা করছিল। তখন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। ভালো করে আলো ফোটেনি। কথা বলার চেষ্টা করে বিফল হতে হলো। মিয়ানমারের সরকার রোহিঙ্গাদের বাঙালি বলে অভিহিত করলেও রোহিঙ্গারা নিজেদের স্বতন্ত্র জাতি দাবি করে। বহুকাল ধরে আরাকান রাজ্যে তাদের বসবাস। বেশির ভাগ মুসলিম হলেও রোহিঙ্গাদের মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীও রয়েছে, যাদের মধ্যে এবার মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা শ' পাঁচেক হিন্দু রোহিঙ্গার একটি দল এখন রয়েছে উখিয়ার হলিদিয়াং গ্রামের একটি মুরগির খামারে। রোহিঙ্গাদের ভাষা আমাদের পক্ষে বুঝতে পারা যেমন কঠিন, আমাদের ভাষা তাদের বোঝানো তার চেয়েও কঠিন। এরপর দিনভর পথে পথে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য দোভাষীর সহযোগিতা নিতে হয়েছে। রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে, তাদের নারীদের ধর্ষণ, নারী-শিশু-পুরুষ নির্বিশেষে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে একটি জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার অপরাধ করছে মিয়ানমার।


সকাল ৯টায় আবারও আবু সিদ্দিক মার্কেটে গিয়ে সকাল ৬টার আগে আগে মার্কেটের বারান্দায় দেখা রোহিঙ্গাদের দলটিকে আর পাওয়া গেল না। তবে অদূরে রাস্তার অন্য পাশে তখনও বন্ধ থাকা একটি দোকানের সামনে বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আশ্রয় নেওয়া ১১ জনের একটি দলের সঙ্গে আলাপ হলো। দলটির ফাতেমা খাতুন ও ফরিদা খাতুন ছাড়া সবাই শিশু। তারা থাকতেন রাখাইন প্রদেশের হাসসুরাতা গ্রামে। পুরো গ্রামটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দুই পরিবারের পুরুষরা কেউ বেঁচে আছে কি-না তা তাদের জানা নেই। শিশুদের নিয়ে দেড় সপ্তাহ ধরে রাখাইনের নানা গ্রাম ঘুরে অবশেষে বৃহস্পতিবার আরও ২৫ রোহিঙ্গার সঙ্গে ফাতেমা ও ফরিদার পরিবার দুটি এসে নামে শাহপরীর দ্বীপে। সেখান থেকে ভাটার সময় হেঁটে কাদামাটির খাল পেরিয়ে বৃহস্পতিবারেই আসে সাবরাং। এ ক'দিন সেখানেই ছিলেন। যারা ভাগ্যবান তারা হাতে কিছু বার্মিজ টাকা নিয়ে আসতে পেরেছেন এবং তা বাংলাদেশের টাকার সঙ্গে বিনিময় করে নিয়েছেন। ফাতেমা ও ফরিদার সেই সুযোগ হয়নি। তারা একবস্ত্রে বাচ্চাদের নিয়ে গ্রাম ছেড়েছিলেন। তাই সাবরাং থেকে কোনো যানবাহনের ভাড়া দিতে না পারায় হেঁটেই রওনা হয়েছেন লেদা ক্যাম্পের উদ্দেশে। তাদের ধারণা, লেদায় পেঁৗছতে পারলে কয়েক বছর আগে আসা এক আত্মীয়ের দেখা পেয়ে যাবেন।


টেকনাফ ও উখিয়া মিলে রোহিঙ্গাদের ছয়টি শরণার্থী ক্যাম্প রয়েছে। এগুলোর মধ্যে টেকনাফের লেদা ও নয়াপাড়ার দুটি এবং উখিয়ার কুতুপালংয়ের দুটি পুরনো ক্যাম্প। এ ছাড়া উখিয়ার ভালুখালিতে গত বছর অক্টোবরে রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করার পর নতুন করে একটি রোহিঙ্গা বস্তি গড়ে উঠেছে। গত এক সপ্তাহে উখিয়ার ঠেংখালি এবং টেকনাফের পুতিনের পাহাড়ে শরণার্থীদের নতুন বস্তি গড়ে উঠেছে। 

টেকনাফের লেদা ও নয়াপাড়ার ক্যাম্প দুটিরই অবস্থান টেকনাফ রোডের কাছাকাছি। গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের দলে দলে ওই দুটি ক্যাম্পের দিকে যেতে দেখা গেছে। রাখাইন প্রদেশের মেরুল্লা থেকে আসা আবদুল মুন্নাফদের দলটি বেশ বড়, তারা নয়াপাড়া ক্যাম্পে থাকার চেষ্টা করছেন। মুন্নাফ নিজেই তাদের দলে কতজন রয়েছে সেই সংখ্যাটি জানাতে ব্যর্থ হলেন। পরে গুনে দেখা গেল নারী-শিশুসহ তারা ৪০ জন। পুরুষের সংখ্যা এত কম কেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে মুন্নাফ জানান, পুরুষদের গুলি করে মেরেছে সেনাবাহিনী, যারা আহত হয়ে পালাতে পারেনি, তাদের পরে আবার কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা লোকজন এসে জবাই করে মেরেছে। মুন্নাফ তার দুই ভাগ্নেকে খুন হতে দেখেছেন। মুন্নাফের শাশুড়ি রাখাইনের উদং গ্রামের বাসিন্দা ফাতেমা খাতুন তার দুই ছেলে নিহত হওয়ার কথা বলতে গিয়ে কাঁদছিলেন। দুই নাতিকে আঁকড়ে ধরে আশি বছরের এই নারী এমনভাবে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন, যদিও তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল, আমাদের মনে হলো তিনি ধরে নিয়েছেন মায়ের সামনে সন্তান হত্যার এমন ঘটনা রাখাইনে খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। 

একের পর এক হত্যার বিবরণ শুনতে শুনতে মনে হলো মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চল যেন এক মৃত্যু উপত্যকা। ওখানে নারীরা ধর্ষিত হবে, শিশুরা অনাহারে মারা যাবে, এটাই নিয়ম। তাই সর্বত্র উঠেছে 'পালাও পালাও' রব। টেকনাফ পৌরসভা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে খানজর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় নাফ নদীতে নৌকায় শত শত মানুষের দল। নদী থেকে কাদামাটি জল ডিঙিয়ে পাড়ে এসে কাদামাটি মাখা মানুষের দল এগোচ্ছে টেকনাফ রোডের দিকে। ঘরহীন ওরা, ঘুম নেই চোখে, ক্ষুধার অন্ন জোটেনি শিশুদেরও। খিদে পাওয়া শিশুদের পেটগুলো সব মিশে গেছে পিঠের সঙ্গে। 


খানজরপাড়া মসজিদের অদূরে দেখা হলো নদী পরিব্রাজক দলের কয়েকজনের সঙ্গে। দলটির টেকনাফ উপজেলা কমিটির সভাপতি জানান, মূলত শিশুদের জন্য পোশাক ও শুকনো খাবার নিয়ে এসেছেন তারা। অনেককে ব্যক্তিগতভাবেও খাবার বিতরণ করতে দেখা যায়। আগের রাতে নদী পার হয়ে আসা একটি দলকে বাড়ির আঙিনায় আশ্রয় দেন খানজরের হোসনে আরা। রাখাইনের জামবুনিয়া থেকে আসা দলটির প্রধান সলিমুল্লাহ বললেন, পুরো সাত দিন পর সকালে এক মুঠো করে ভাত খেয়েছেন তারা। জামবুনিয়া থেকে বহু পথ ঘুরে সোমবার আসেন ওপারের শিলখালি গ্রামে। পরে মঙ্গলবার রাতে এসেছেন খানজরে।

অন্য সব এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কড়াকড়ি করলেও শিলখালি থেকে খানজর আসার নদীপথটাকে মনে হলো উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এ পথ দিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বিজিবির তত্ত্বাবধানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে টেকনাফের পুথিন পাহাড়ে নতুন করে গড়া রোহিঙ্গা বস্তিতে। গতকাল পর্যন্ত ওখানে ৫০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় বিজিবি-২-এর পক্ষে সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো খুদেবার্তায় জানানো হয়, সীমান্তপথে অনুপ্রবেশকালে দুই হাজার ৬৪৯ জন রোহিঙ্গাকে প্রতিহত করা হয়েছে। কোস্টগার্ডও ছয়টি নৌকাসহ ৩৭০ জনকে প্রতিহত করেছে। 


বিজিবি-২ অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা অনুপ্রবেশকারীদের প্রতিহত করারই চেষ্টা করছি। তারপরও যারা সীমান্তের বিভিন্ন পথ দিয়ে আসার চেষ্টা করছে তাদের এক জায়গায় একত্রে রাখা হচ্ছে।

প্রায় অভিন্ন কথা কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেনের। তিনি জানান, উখিয়ার ভালুখালিতে একটি জায়গা খুঁজে নতুন করে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের রাখার প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। 

দু-একটি পথ ছাড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ খুব সহজ নয়। মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে সেন্টমার্টিন হয়ে শাহপরীর দ্বীপে আসার পথে নৌকাডুবিতে তিন নারী ও পাঁচ শিশুসহ মারা গেছেন আটজন। অসুস্থ হয়ে শাহপরীর দ্বীপে আশ্রয় নেওয়া দুই রোহিঙ্গা নারী মারা গেছেন। এ পর্যন্ত নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ২০টি। এ নিয়ে শুধু টেকনাফেই মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৬৬। 

এ পর্যন্ত কত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে তা জানাতে পারেনি স্থানীয় কোনো কর্তৃপক্ষই। তবে জাতিসংঘের স্থানীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, গত বছরের অক্টোবর এবং এ বছরের ২৪ আগস্টের সেনা অভিযানের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ ৭৪ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসেছে। গত অক্টোবরের পর বাংলাদেশে আসে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। এবার সংখ্যাটি আগেরবারের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।