ঢাকা রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

প্রয়োজন মনোযোগ একটু সুযোগ

প্রয়োজন মনোযোগ একটু সুযোগ

সাজিদা ইসলাম পারুল

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:০২

শিহাব শাহরিয়ারের বয়স ২৭ বছর। এক সময় অটিজমে ভুগতেন। প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় যা-ই পেতেন, সবই কাটতেন কাঁচি দিয়ে। অভিভাবকরা তাকে ভর্তি করে দেন পিএফডিএ-ভিটিসিতে, যেটি অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য একটি বিশেষ ধরনের স্কুল। এ স্কুল থেকে শিহাবকে তার মতোই শেখানো হয় তার এই আচরণের অসামঞ্জস্যতা। শেখানো হয় কোনটা কাটতে হয় আর কোনটা কাটতে হয় না। এ বিষয় দুটো আলাদা করার ধারণা বদলে দিয়েছে তার জীবন।
পিএফডিএ থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর শিহাবের ওই আচরণগত সমস্যাই একটি উৎপাদনশীল ক্ষমতা হয়ে উঠেছে। শিহাব এখন একদিনে প্রায় ১৫০ জোড়া কার্পেট স্লিপার নিখুঁতভাবে কাটতে পারেন। ফলে কর্মসংস্থানের পথও উন্মুক্ত হয়েছে তার। তার তৈরি এসব কার্পেট স্লিপার এখন সরবরাহ করা হচ্ছে দেশের নামিদামি পাঁচতারা হোটেলে।
শিহাবের মতো রাহিবও অটিজমের শিকার। শৈশবে ঘর থেকে বের হলেই আশপাশের লোকজন 'পাগল' বলে টিটকারি দিত তাকে। ইচ্ছে হলেও কারও সঙ্গে তিনি খেলতে পারতেন না। কেউ তাকে খেলার সাথী হিসেবে নিতে চাইত না। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সহপাঠীরা তাকে পাগল ভেবে কাছে বসতে চাইত না। এসব কারণে বেশিদিন পড়াশোনা চালাতে পারেননি রাহিব। তিনি জানান, 'আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। জীবনটা বিষাদময় হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, জীবনই থেমে গেল।' কিন্তু রাহিবের জীবন থেমে থাকেনি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিশোর রাহিব মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা; বাবা-মায়ের বড় সন্তান। তিনি পিএফডিএ থেকে পাওয়া বিশেষ প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে উপার্জনক্ষম একজন মানুষে পরিণত হয়েছেন। নিরন্তর চেষ্টা আর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে নিজেকে তিনি তুলে নিয়ে এসেছেন সক্ষম মানুষের কাতারে। এখন তিনি পিৎজা, কেক, পুঁতির অলংকারসহ নানা জিনিস তৈরি করেন।
দেশে শিহাব, রাহিবের মতো অনেকেই আছেন, যারা অটিজমে আক্রান্ত। সঠিক সময়ে তাদের চিকিৎসা বা পরিচর্যা করা হয়নি বলে এদের কেউ কেউ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং বাকহীন। কেউ কেউ আবার স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন না। অথচ স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় নির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অটিজম রোগ-ব্যাধি নয়; জন্মগত স্নায়বিক দুর্বলতা। শিশুর জন্মের ২-৩ বছর বয়সের মধ্যে এর প্রকাশ ঘটে। বিএসএমএমইউ অটিজম সেন্টার সমন্বয় কর্মসূচির পরিচালক ও শিশু নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শাহীন আকতার বলেন, অটিস্টিক শিশুর মধ্যে কোনো না কোনো প্রতিভা বা বিশেষ গুণ লুকিয়ে আছে। সময়মতো মনোযোগের সঙ্গে নিবিড় পরিচর্যা করলে তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। একটু সুযোগ করে দিলে তাদের সুপ্ত গুণাবলিও প্রকাশ পায়।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করে, এমন সংগঠনের নেতারা জানান, প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীরও কাজ করার ক্ষমতা আছে। তেমন কাজ দেওয়া হলে তারাও পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে থাকবেন না। এমন বাস্তবতায় আজ সারাবিশ্বে পালিত হচ্ছে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য- 'ঞৎধহংরঃরড়হ :ড় ধফঁষঃযড়ড়ফ'. অর্থাৎ 'লেখাপড়া, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে চলা'। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ২০১১ সাল থেকে অটিজম সচেতনতা দিবস পালিত হয়ে আসছে। তবে এ বছর করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটায় দিবসটিতে কোনো অনুষ্ঠান-আয়োজন করা হচ্ছে না।
এই বিশেষ চাহিদার মানুষদের যোগ্যতা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মদক্ষ করে তুলতে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে পিএফডিএ ভিটিসিসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও অবকাঠামোর অভাবে সদিচ্ছা থাকার পরও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের বড় একটি অংশকেই দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তৈরি করা যাচ্ছে না। বেসরকারি খাতের কেউ কেউ এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে এলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই এদের আত্তীকরণ করার কোনো নিয়মনীতি নেই।
অটিজম নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন এমন অনেকেই বলছেন, দেশের সবচেয়ে বেশি লোকের কর্মসংস্থান হয় বেসরকারি খাতে। তাই এই জনশক্তিকে কাজে লাগাতে তাদেরই উদ্যোগী হতে হবে। সরকারকেও এটা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা এ ধরনের মানুষকে সঠিক কর্মপরিবেশ দেয়। সরকারি নির্দেশনা পেলে যারা অটিজম নিয়ে কাজ করেন তারাও প্রশিক্ষণ, মডিউল, কর্মসহায়ক পরিবেশ ইত্যাদি তৈরিতে বেসরকারি খাতকে সহযোগিতা করতে পারেন।
অটিজম নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পিএফডিএ ভিটিসির চেয়ারম্যান সানজিদা রহমান ড্যানি সমকালকে জানান, সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান ভিটিসি ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করে। এরই মধ্যে এটি নিবন্ধিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে নথিভুক্ত। প্রতিষ্ঠানটি ভোকেশনাল এবং ব্যক্তি উন্নয়নের কাজগুলোর সমন্বয়ে পরিপূর্ণ কারিকুলাম তৈরি করেছে। ২৩৭২টি টাস্ক সংবলিত ৪১টি বিষয়ে কারিগরি শিক্ষার গাইডলাইনের সঙ্গে 'কুমো' নামে গতিশীল সফ্‌টওয়্যার চালু করেছে। এতে শিক্ষার্থীদের পূর্ণ প্রোফাইলসহ অ্যাসেসমেন্ট এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টের বিস্তারিত পাওয়া যায়।
সানজিদা রহমান ড্যানি জানান, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের সরাসরি ইন্টারভেনশন বা সেবাদান, স্নায়বিক প্রতিবন্ধিতাসম্পন্নদের জন্য কারিগরি শিক্ষা দিয়ে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরিতে ভিটিসি কাজ করে যাচ্ছে। এদের পরিচালিত 'অ্যাঞ্জেল শেফ' নামে নতুন ফুড ব্র্যান্ড বাজারে চালু হয়েছে। ওপেন কিচেনসহ বিভিন্ন স্থানে ফুড কিওস্ক স্থাপিত হয়েছে, যেখানে প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করছেন।
অটিজম সচেতনতা উদ্যোগের শুরু যেভাবে :২০১১ সালের ২৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা হোসেনের প্রচেষ্টায় দেশে অটিজমবিষয়ক আঞ্চলিক সম্মেলন হয়। ভারতের কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধীসহ বিভিন্ন দেশের ফার্স্ট লেডিরা ওই সম্মেলনে অংশ নিয়ে একযোগে অটিস্টিক শিশুদের পুনর্বাসন আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। এই সম্মেলনের মাধ্যমে অটিজম ইস্যু দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। এ ছাড়া সায়মা হোসেনের নেতৃত্বে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দুটি অধিবেশনে অটিজম নিয়ে সাইড ইভেন্ট হয়। এমন প্রেক্ষাপটে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকের উপদেষ্টা নিযুক্ত হন। ফলে অটিজম আন্দোলন জোরদার হয়। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও দৃশ্যমান হয়। সায়মা হোসেন অটিজমবিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করছেন।

আরও পড়ুন

×