সবুজ ঘাসে ভরে গেছে পুরো এলাকা। বুক চিরে দেখা দিচ্ছে নতুন কচি গাছগাছালি আর লতা-গুল্মের কুঁড়ি। পাখির কলতান আর ওড়াউড়িতে মুখর পুরো এলাকা। পশ্চিমের বঙ্গোপসাগর থেকে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে বিস্তৃত প্রান্তরে। স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে স্বচ্ছ জলে মাছের আনাগোনা। এমন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য নিয়ে ভোলায় সমুদ্রের বুকে জেগে উঠছে নতুন চর, হাতছানি দিচ্ছে বাংলাদেশের নতুন ভূখণ্ড।

নতুন এই চরের অবস্থান ভোলার চরফ্যাশনের চরকুকরিমুকরি থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে বঙ্গোপসাগরের মধ্যে। তারুয়ার চরের কাছাকাছি জেগে ওঠা এ ভূমি ভরপুর নানা জীববৈচিত্র্যে। এমনিতেই চরফ্যাশন উপজেলা আয়তনের দিক থেকে দেশের ১৮টি জেলার চেয়ে বড়। এখানে রয়েছে চারটি থানা। নতুন নতুন চরের সম্মিলনে জেলা-আয়তনকেও ছাপিয়ে ওঠা চরফ্যাশনবাসীর প্রত্যাশা, সরকার দ্রুতই এ উপজেলাকে জেলা ঘোষণা করবে।

গত ১৭ জানুয়ারি স্পিডবোটে নতুন জেগে ওঠা চর দেখতে গিয়ে বঙ্গোপসাগরের মেঘনার মোহনায় আরও একাধিক নতুন চর চোখে পড়েছে। কচ্ছপিয়া ফেরিঘাটের স্পিডবোট চালক সেলিম মিয়া জানান, চরটির আনুমানিক দৈর্ঘ্য আড়াই কিলোমিটার ও প্রস্থ দুই কিলোমিটার। স্থানীয় জেলেরা বলছেন, তিন বছর ধরে জেগে থাকা এ চর ভরা জোয়ারেও পানিতে তলায় না। এরই মধ্যে কয়েকটি জেলে পরিবার চরটিতে বসতিও গড়ে তুলেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের মেঘনা মোহনা সমীক্ষায়ও নতুন চর জেগে ওঠার প্রমাণ মিলেছে। ২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে একনেক সভায়  চরকুকরিমুকরির পাশে এমন একটি জেগে ওঠা নতুন চরে বনায়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন জেগে ওঠা চর স্থায়ী করতে সবুজ বেষ্টনী তৈরি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে এসব চরে ইকোপার্ক গড়ে তোলা হবে। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্তি স্থাপনে প্রকল্প নেওয়া হবে।

নতুন চরে ঘুরতে আসা চরফ্যাশনের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ইয়াসিন আরাফাত সমকালকে বলেন, দ্বীপের রানী চরফ্যাশনে এরই মধ্যে আটটি নতুন চর জেগেছে। এর মধ্যে ডাল চর, পূর্বের চর, ভাসান চর, বয়ার চর, চর আলিম, আন্ডার চর, কলাগাচিয়া চর ও শিব চরের আয়তন সাড়ে আট হাজার একর। স্থানীয় জেলেরা জেগে ওঠা এসব চরের একটি নাম রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে। এ চরের আয়তন প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর। এসব চরে কয়েক বছর আগেই জনবসতি গড়ে উঠেছে। বয়ার চরের বাসিন্দা সাইফুল মাঝি জানান, তারা এরই মধ্যে সরকার থেকে বন্দোবস্তও পেয়েছেন। বয়ার চরে বনায়নের দাবি জানান তিনি। তারুয়ার চরেও কয়েকটি জেলে পরিবার বসতি গড়েছে। এদের একজন জয়নাল ফকির। তিনি বলেন, আলম মাঝি প্রথমে এ চরে থাকতে শুরু করেন। এখন অনেকেই আসছেন। জোয়ারের সময় পানির সঙ্গে আসা কাদামাটি ভাটার সময় এ চরে নিয়ে লোকজন গাছপালা ও ঘর তৈরির কাজ করছেন।

পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব সমকালকে বলেন, চরফ্যাশনের দক্ষিণে জেগে ওঠা এসব চর দেশের আয়তন বাড়াচ্ছে। চরগুলোকে বসবাসের উপযোগী করতে বনায়ন হচ্ছে। কেবল-কার দিয়ে জেগে ওঠা চরগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার মোহনার চরকুকরিমুকরিতে এরই মধ্যে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। হরিণসহ বন্যপ্রাণী বিচরণ করছে। চরে পাখি আর সাগরে ডলফিনের অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে। বিচ্ছিন্ন চরগুলো মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে একত্র হলে চরফ্যাশন দেশের সবচেয়ে বড় জেলার আয়তনকেও ছাড়িয়ে যাবে।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম), একচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইডিপি) ও সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসের (সিইজিআইএস) গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে অন্তত ২০ বর্গকিলোমিটার নতুন চর জেগে ওঠে। তবে নদী-চ্যানেলের গতিপথ পরিবর্তন ও সমুদ্র উপকূলীয় ভাঙনের কবলে পড়ে সাত-আট বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড হারিয়ে যায়। এমন ভাঙাগড়ার মধ্যেও প্রতিবছর গড়ে ১২-১৩ বর্গকিলোমিটার ভূমি টিকে থাকে এবং তা দেশের মানচিত্রে মূল ভূখণ্ড হিসেবে যুক্ত হয়। এরই মধ্যে নোয়াখালী অঞ্চলে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে মানুষ।

আন্তর্জাতিক নদী বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল ইসলাম সমকালকে বলেন, হিমালয় থেকে নেমে আসা পানি পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যাওয়ার পথে প্রচুর পলিমাটি বহন করে। এই পলিমাটি বঙ্গোপসাগরের তলদেশের উচ্চতা বাড়িয়ে চর গড়ছে। এভাবে গত দুই দশকে দুই হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি স্থায়ী ভূখণ্ড বেড়েছে বাংলাদেশের।

বিষয় : চরফ্যাশন

মন্তব্য করুন