বিশেষ লেখা

পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতেই হবে

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৮      

শাহরিয়ার কবির

পাকিস্তানের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে কোনো ইতিবাচক মন্তব্য না করলেও ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তিনি একাধিকবার বলেছেন, পাকিস্তানের কারণেই বাংলাদেশ আলাদা হয়ে গেছে। এর জন্য তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক বাহিনী, বিশেষ করে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তাকেই দায়ী করেছেন। তিনি হামুদুর রহমান কমিশনের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, এই কমিশনের সুপারিশ যদি বাস্তবায়ন করা হতো তাহলে পাকিস্তানের আজকের এই দুর্দশা হতো না। হামুদুর রহমান কমিশনে যদিও আমাদের এখানকার গণহত্যার বিষয়টি খুবই কমিয়ে দেখা হয়েছে। তবু বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পেছনে তারা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে দায়ী করেছে এবং যারা এর জন্য দায়ী তাদের শাস্তিও কামনা করা হয়েছিল কমিশনের রিপোর্টে। এ রিপোর্টটি পাকিস্তান কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। নওয়াজ শরিফ সেই রিপোর্টের কথাই উল্লেখ করেছেন।

তিনি যখন তিনবার ক্ষমতায় ছিলেন তখন কিন্তু একবারের জন্যও এই কমিশনের রিপোর্টটি প্রকাশের প্রয়োজন বোধ করেননি। হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন হলে পাকিস্তানের এই দুর্দশা কিছুটা লাঘব হতো বলে আমি মনে করি। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছিল এবং তারা বিচার থেকে অব্যাহতি পেয়েছিল; সেই সামরিক বাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানের বেলুচিস্তানসহ অন্যান্য জায়গায় একই ধরনের অপরাধ করছে। এবং একই সঙ্গে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে জিহাদের নামে সন্ত্রাসী রফতানি করছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ দেখেছি। আমাদের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীকে তারা মদদ দিয়েছে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা চালানোর জন্য, বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব না হলেও একটা কনফেডারেশন করার চেষ্টা চালিয়েছে তারা। জামায়াতে ইসলামীকে পাকিস্তান প্রশ্রয় দিয়েছে, সাহায্য করেছে এবং বিভিন্ন ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা করেছে। দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সংশ্নিষ্টতা সর্বজনবিদিত।

কিন্তু নওয়াজ শরিফ ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানের হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন বলে আমার জানা নেই। আজকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ইতিহাসের কতগুলো সত্য তিনি উচ্চারণ করেছেন। দেরিতে হলেও তার এই বোধোদয়ের জন্য আমরা তাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতায় গেলে নওয়াজ শরিফ এর উল্টোটাই বলবেন বা করবেন।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের বুনিয়াদটাই হচ্ছে মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে। কয়েক বছর আগে পাকিস্তানের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র বানিয়েছিলাম 'জিহাদ উইদাউট বর্ডার' নামে। ওই প্রামাণ্যচিত্রে পাকিস্তানের গবেষক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা বলেছেন, যে রাষ্ট্রের বুনিয়াদ মিথ্যার ওপরে সে রাষ্ট্র কীভাবে টিকবে? পাকিস্তানের জন্মের সময় বলা হয়েছিল, মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি দেশ প্রয়োজন। হিন্দু-মুসলমান এক দেশে থাকতে পারবে না। অথচ সেই জিন্নাহই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের জন্মের পর বলেছিলেন, পাকিস্তানে হিন্দু-মুসলমান সবাই সমঅধিকার নিয়ে বাস করবে। যদি পাকিস্তানে হিন্দু-মুসলমানরা সমঅধিকার নিয়ে থাকতে পারে তবে অখণ্ড ভারতবর্ষে থাকতে তাদের সমস্যা কোথায় ছিল? এই কথার ভিত্তিতেই আমার প্রামাণ্যচিত্রে পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবীরা বলেছেন, পাকিস্তান মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে। তারা আরও বলেছিলেন, পাকিস্তানকে স্বীকার করতে হবে একাত্তরে তারা ভুল করেছে বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়ে, বাঙালির কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করে। সাতচল্লিশ সালের ভারত ভাগকেও তারা আবার পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি বলে মনে করেন। পাকিস্তানের সচেতন বুদ্ধিজীবীরাই এখন এসব প্রশ্ন তুলছেন। পাকিস্তানের বর্তমান প্রজন্মের লেখকরাও বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য দায়ী সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচারের কথা বলছেন।

গত বছরের জুলাই মাসে পাকিস্তানের তিন লেখক বাংলাদেশে এসেছিলেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আমন্ত্রণে। তাদের মধ্যে দু'জন তরুণ লেখক যাদের জন্ম হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে, তারা এখন একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে গবেষণা করছেন; আর পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশে তাদের পরিচালিত একাত্তরের গণহত্যাকে অস্বীকার করতে চাচ্ছে বারবার। তারা গণহত্যার শিকারদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের একজন আনাম জাকারিয়া গতবছর গণহত্যা দিবসে এ বিষয়ে পাকিস্তানের কাগজে একটা প্রবন্ধ লিখেছেন, যে ঘটনা বাংলাদেশ কখনও ভুলতে চায় না আর পাকিস্তান যা ভুলে যেতে চায়। এই বোধোদয় পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের ভেতরেও আমরা দেখতে পাচ্ছি। নওয়াজ শরিফ তারই প্রতিধ্বনি করেছেন। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে একাত্তরের গণহত্যাকে স্বীকৃতি না দিচ্ছে এবং গণহত্যার জন্য সরকারিভাবে ক্ষমা প্রার্থনা না করছে, যতক্ষণ পর্যন্ত গণহত্যাকারীদের বিচার না করছে ততক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তানকে বিশ্বাস করবার কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।

আমাদের গণহত্যার যারা ভিকটিম সেই ত্রিশ লাখ শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা গণহত্যার ক্ষতিপূরণও দাবি করেছি পাকিস্তানের কাছে। আমরা পরিস্কারভাবে বলেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি এবং জাপান যদি গণহত্যার ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দিতে পারে, তবে পাকিস্তানকে কেন আমরা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করব না! এই দাবি আমাদের দীর্ঘদিনের। ক্ষমা প্রার্থনার ব্যাপারে পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরাও সোচ্চার। আমার সাম্প্রতিক প্রামাণ্যচিত্র 'জার্নি টু জাস্টিস'-এ তারা অনেকেই বলেছেন, একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে, তবে ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে তাদের দ্বিমত রয়েছে। তারা বলতে চাইছেন, তোমরা ক্ষমা চাইলে তো আর ক্ষতিপূরণের বিষয়টি থাকে না। তোমরা ক্ষমা চাও ক্ষতিপূরণ না চেয়ে। তারা অবশ্য ইসলামী আইনের অধীনে এমন কথা বলছেন।

আমাদের পরিস্কার বক্তব্য হচ্ছে, পাকিস্তান তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে এখন বুঝতে পারছে একাত্তর থেকে এখন পর্যন্ত তারা একের পর এক ভুল করে যাচ্ছে। একাত্তরে পাকিস্তানের ভাঙন সেটা একটা বড় প্রমাণ। পরবর্তী সময়ে সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব ও মোল্লাতন্ত্রের প্রভাব থেকে পাকিস্তান নিজেদের মুক্ত করতে পারেনি। পাকিস্তানের সমরতন্ত্র ও মোল্লাতন্ত্র পাকিস্তানকে কীভাবে ধ্বংস করছে- তার ওপর পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী হোসাইন হাক্কানির একটি অসাধারণ বই আছে। বইটির নাম 'পাকিস্তান :বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি'। দু'বছর আগে পাকিস্তানের প্রবীণ সাংবাদিক বাবর আয়াজ লিখেছেন 'হোয়াটস রং উইথ পাকিস্তান?' শিরোনামের আরেকটি বই। এসব বইয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের সচেতন বুদ্ধিজীবীরাই এখন প্রশ্ন তুলছেন এবং বলতে চাচ্ছেন পাকিস্তানকে জঙ্গি, মৌলবাদী উৎপাদন, বিপণন ও রফতানি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সহসভাপতি সৈয়দ ইকবাল হায়দার একবার বলেছেন, গত চল্লিশ বছরে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান থেকেও অনেক এগিয়ে গেছে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা করে। পাকিস্তানকে বাংলাদেশের কাছে এসব শেখার বিষয়েও তিনি বলেন। ধর্মান্ধতা কীভাবে একটি দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়, তা পাকিস্তানকে দেখলেই বোঝা যায়।

নওয়াজ শরিফের সাম্প্রতিক এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে বলছি, একাত্তরে পাকিস্তানিদের চালানো গণহত্যার জন্য তাদের অবশ্যই বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

শাহরিয়ার কবির :লেখক, সাংবাদিক, সভাপতি- একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ

বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ

অভিবাসন ইস্যুতে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী চার্লস মিশেল। অভিবাসন নিয়ে ...

এভাবে চলে যেতে নেই

এভাবে চলে যেতে নেই

গতকাল মঙ্গলবার বাংলা চলচ্চিত্রের বরেণ্য নির্মাতা সাইদুল আনাম টুটুল চলে ...

বন্ধ হচ্ছে ট্রাম্প ফাউন্ডেশন

বন্ধ হচ্ছে ট্রাম্প ফাউন্ডেশন

ফাউন্ডেশনের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগে বন্ধ হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের ...

শেষ বিকেলে দেখা দিতে পারে রোদ

শেষ বিকেলে দেখা দিতে পারে রোদ

কয়েকদিন ধরে ঢাকাসহ সারাদেশে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ও দিনভর বাতাসে ...

হাসপাতালে ভর্তি হলেন লতিফ সিদ্দিকী

হাসপাতালে ভর্তি হলেন লতিফ সিদ্দিকী

আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ ...

আড়াইহাজারে ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডাকাতি, ৩৮ লাখ টাকার মালামাল লুট

আড়াইহাজারে ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডাকাতি, ৩৮ লাখ টাকার মালামাল লুট

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে দুধুর্ষ ডাকাতি হয়েছে। মঙ্গলবার রাত ...

ফতুল্লায় আগুনে একই পরিবারের ৯ জন দগ্ধ

ফতুল্লায় আগুনে একই পরিবারের ৯ জন দগ্ধ

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গ্যাসের পাইপ লাইনের ছিদ্র থেকে আগুন লেগে একই ...

নজরদারি বেড়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে

নজরদারি বেড়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পগুলোতে টহল ...