একটি অনুরোধ ও মানবঢাল

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

শাহেদ চৌধুরী

ফাইল ছবি

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট নারকীয় গ্রেনেড হামলা থেকে কীভাবে প্রাণে বাঁচলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা? ওই সময়কার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা নিজেই এর জবাব দিয়েছেন। এই প্রতিবেদকসহ গণমাধ্যমকর্মীদের বলেছেন, মহান আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে একজন ফটোসাংবাদিকের অনুরোধ রক্ষা এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের মানবঢাল তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছে।

ভয়ঙ্কর সেই ঘটনার প্রসঙ্গে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা বলেছেন, ভাষণ শেষ হওয়ার পর তিনি  খোলা ট্রাকের মঞ্চ থেকে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় ফটোসাংবাদিক এস এম গোর্কির অনুরোধে তিনি একটু থেমে গিয়ে ছবি তোলার সুযোগ দেন। ঠিক তখনই বিকট শব্দে গ্রেনেড বিস্ম্ফোরণ ঘটে। তিনি ট্রাকের ওপরই বসে পড়েন। আর নেতারা তাকে ঘিরে মানবঢাল তৈরি করেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ছিলেন ওই গ্রেনেড হামলার টার্গেট। আর জীবন বাজি রেখে তাকে বাঁচিয়েছেন তার প্রিয় সহকর্মী-সহমর্মীরা। অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রমসহ দলের নেতাদের পাশাপাশি শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দুই নিরাপত্তাকর্মী তাকে ঘিরে মানববর্ম তৈরি করেছিলেন। পরে শেখ হাসিনাকে আড়াল করে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ।

ওই দিন কেমন ছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউর পরিবেশ? সূর্যের তেজ তখন কমতে শুরু করেছে। কাঠফাটা রোদ আর তীব্র গরমের আঁচও কমেছে কিছুটা। লাল টকটকে সূর্য পশ্চিম আকাশে বেশ কিছুটা হেলে পড়েছে। ওই সময়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা গরমে সবার মতো অস্থির থাকলেও আওয়ামী লীগ অফিসের দক্ষিণ পাশে সিটি ভবনের সিঁড়ির গোড়ায় বসে সাংবাদিকরা শেখ হাসিনার সেই ভাষণের নোট নিচ্ছিলেন গভীর অভিনিবেশে।

বিকেল ৫টা ২১ মিনিট, শনিবার। ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর চারপাশে তখন শান্তিপ্রিয় অসংখ্য মানুষের উপচেপড়া ভিড়। সেই জনারণ্যে ঠিক এক মিনিট পরই বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে শক্তিশালী গ্রেনেডের বিস্ম্ফোরণ। ১৩টি গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতায় আকস্মিক অসংখ্য মৃত্যুর হানা। রক্তস্রোতে ভেসে গেল পিচঢালা রাজপথ। চারদিকে মানবদেহের ছিন্নভিন্ন টুকরো। এর মধ্যে গুলির শব্দও ভেসে আসছে।

মৃত্যুর ওই আঙিনায় দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল সমবেত সবার মতো গণমাধ্যমকর্মীদেরও একটিই জিজ্ঞাসা ছিল, 'বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা কোথায়? তিনি বেঁচে আছেন তো!' হন্যে হয়ে সবাই আওয়ামী লীগ সভাপতির গাড়ির খোঁজ করতে থাকেন। সবাই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার খোঁজ করতে থাকেন। খানিক পরই চোখে পড়ে, 'আওয়ামী লীগ সভাপতির গাড়ি তার বাসভবন ধানমণ্ডির সুধা সদনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তিনি অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেছেন। মহান আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছেন।'

কিন্তু ততক্ষণে স্মরণকালের নৃশংসতম গ্রেনেড হামলায় স্প্নিন্টারের আঘাতে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়েছেন শত শত মানুষ। অনেকের প্রাণহীন নিথর শরীর তখন রাজপথে লুটিয়ে আছে। এরই মধ্যে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা সম্পাদিকা আইভি রহমানকে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকতে দেখে সেখানে ছুটে গেলেন অনেকে। ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের তৎকালীন সহসভাপতি আবুল কাশেম হাসপাতালে নিয়ে গেলেন আইভি রহমানকে।

অশুভ শক্তির বিভীষিকাময় ওই গ্রেনেড হামলার আগমুহূর্তে ভাষণ দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষে খোলা ট্রাকমঞ্চ থেকে নেমে এসে সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি মিছিলে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তুতির সময় বিকট শব্দে একের পর এক বিস্ম্ফোরিত হয় ১৩টি তাজা গ্রেনেড। আওয়ামী লীগ সভাপতির বুলেটপ্রুফ গাড়ি লক্ষ্য করে ছুটে আসে ১২টি গুলি। আর এতেই রক্তগঙ্গা বয়ে যায়। খানিক আগের জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এভিনিউ মুহূর্তেই পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। বীভৎস ওই গণহত্যার পরমুহূর্তে ঘটনাস্থলে হাত-পাসহ মানবদেহের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ফিনকি দিয়ে মানবদেহ থেকে বেরিয়ে আসছিল রক্তস্রোত। খোলা ট্রাকের চারপাশে এবং চেয়ারের ওপরও ছোপ ছোপ রক্ত। কমবেশি সবাই আহত হয়ে স্তূপাকারে মাটিতে পড়ে আছেন। শত শত মানুষ মরণ-যন্ত্রণায় চিৎকার করছেন। চারদিকে ধ্বংসযজ্ঞ, আহাজারি।

রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য জুতা-স্যান্ডেল, ব্যানার-ফেস্টুন। অবিস্ম্ফোরিত গ্রেনেড। বেঁচে থাকার জন্য মুমূর্ষুদের আকুতি, কাতর গোঙানি, আর্তনাদসহ অবর্ণনীয় মর্মান্তিক দৃশ্য। নির্মম ওই ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা ও নির্মমতা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার মতো অবস্থাও ছিল না। তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নিতে না পারায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অনেকে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল মানুষ দিজ্ঞ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন।

আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফসহ আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সও খুঁজে পাওয়া যায়নি। রিকশা-ভ্যানে, এমনকি ঠেলাগাড়িতে করে আহতদের নেওয়া হয় বিভিন্ন হাসপাতালে। আহতদের উদ্ধারে পুলিশের কোনো তৎপরতা ছিল না। উল্টো কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনী বেধড়ক লাঠিচার্জ ও অবিরাম টিয়ার গ্যাসের শেল ছুড়েছে। সেটা ছিল এক বীভৎস, বিপন্ন সময়।

আরও পড়ুন

উত্তাপের সঙ্গে মিশে আছে উত্তেজনাও

উত্তাপের সঙ্গে মিশে আছে উত্তেজনাও

সারাদেশের ৩০০ নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ঢাকা-১ আসন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ঢাকা ...

সরব এশিয়া-ইউরোপ

সরব এশিয়া-ইউরোপ

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নৃশংসতায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার ...

তারাই আমাদের বাতিঘর

তারাই আমাদের বাতিঘর

আবার এসেছে ফিরে ডিসেম্বর। শোক, শক্তি ও সাহসের মাস, আমাদের ...

মর্মন্তুদ সেই দিন আজ

মর্মন্তুদ সেই দিন আজ

'আজ এই ঘোর রক্ত গোধূলিতে দাঁড়িয়ে/ আমি অভিশাপ দিচ্ছি তাদের/ ...

রাজনীতিবিদরা কি হারিয়ে যাবেন

রাজনীতিবিদরা কি হারিয়ে যাবেন

পরিসংখ্যান অনেক সময় নির্মম, যেমন পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুদের, ...

ব্যবসায়ীদের হাতেই এখন নাটাই

ব্যবসায়ীদের হাতেই এখন নাটাই

গত ৬ অক্টোবর ২০১৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মহামান্য ...

নির্বাচন উদ্দীপনার নাকি আশঙ্কার

নির্বাচন উদ্দীপনার নাকি আশঙ্কার

২০১৪ সালে যেমন কোনো বিকল্প ছিল না, এই ২০১৮-তেও তেমনি ...

তোমার আমার মার্কা...

তোমার আমার মার্কা...

বিষণ্ণ মনে সোফায় বসে পেপার পড়ছিলেন বাবা। ক্লাস নাইনে পড়া ...