নিজের নামটাও বলতে চান না জজ মিয়া

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

বকুল আহমেদ

জজ মিয়া- আলোচিত চরিত্র। তাকে সামনে রেখে সেই ২০০৫ সালে বানানো হয় আষাঢ়ে গল্প। সেই গল্পের প্রধান চরিত্র তিনি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার আসামি সাজিয়ে তাকে পাঠানো হয়েছিল কারাগারে। বিনাদোষে পাঁচটি বছর জেলে কাটাতে হয় তাকে। সইতে হয় বর্বর নির্যাতন। এ সময় মামলার খরচ জোগাতে বিক্রি করতে হয়েছে বাবার রেখে যাওয়া ভিটেমাটিও। এখন নিঃস্ব তিনি; ঢাকা ও এর আশপাশে রেন্ট-এ কার চালিয়ে কোনো রকমে জীবনযাপন করছেন। তবে আতঙ্ক পিছু ছাড়েনি তার। নাটকের কুশীলবরা তার ক্ষতি করতে পারে- এমন শঙ্কা নিয়ে পথ চলেন তিনি। নির্মম নির্যাতনের ক্ষতও শুকায়নি তার। মাঝেমধ্যে ব্যথা-বেদনা মনে করিয়ে দেয় ভয়াবহ সেই নির্যাতনের কথা।

গতকাল মঙ্গলবার সমকালের কাছে বর্তমান জীবন ও পুলিশের হাতে গ্রেফতারের পর  ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দেন জজ মিয়া। গতকাল দুপুরে তিনি এসেছিলেন সমকাল কার্যালয়ে।

জজ মিয়া জানান, তার আসল নাম মো. জালাল। তবে জজ মিয়া নামেই তাকে চেনে সবাই। এখন বয়স ৩৮ বছর। গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ থানার বীরকোটে। তারা চার ভাই ও এক বোন। ১৫ বছর আগে তার বাবা আব্দুর রশিদের মৃত্যু হয়েছে। ভাইদের মধ্যে জজ মিয়া মেজো। কয়েক মাস আগে তার মা জোবেদা খাতুন মারা গেছেন।

জজ মিয়া বলেন, 'আমার ভয় এখনও কাটেনি। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও ভয় করে- কখন জানি কে আমার ক্ষতি করে দেয়! সেই নির্যাতনের কথা মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর জজ মিয়া নামে নিজেকে পরিচয় দিই না কোথাও। এখন জালাল নামে মানুষের কাছে পরিচয় দিই।'

তিনি জানান, বর্তমানে বোন ও স্ত্রীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ভাড়া থাকেন তিনি। রেন্ট-এ কার চালিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে সরকারের কাছে একটি চাকরি দাবি করেন তিনি।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা করে পুলিশ। ওই মামলায় ২০০৫ সালের জুন মাসে জজ মিয়াকে নোয়াখালীর সেনবাগের গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে থানা পুলিশ। এর পর তাকে ঢাকায় আনা হয়। ঘটনার কথা স্বীকার করে মিথ্যা জবানবন্দি আদায়ের জন্য তার ওপর নেমে আসে নিষ্ঠুর নির্যাতন।

যেভাবে গ্রেফতার : জজ মিয়া জানান, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার এক সপ্তাহ আগে অসুস্থতার কারণে তিনি গ্রামের বাড়ি সেনবাগের বীরকোটে চলে যান। ২১ আগস্ট টেলিভিশনের খবরের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে গ্রেনেড হামলার ঘটনা জানতে পারেন। ঘটনার ২০-২৫ দিন পর তিনি ঢাকায় আসেন। গুলিস্তান এলাকা ছেড়ে মতিঝিলে ফুটপাতে ফল ব্যবসা শুরু করেন। ২০০৫ সালের মে মাসে তিনি বাড়ি যান। জুন মাসে সেনবাগ থানার পুলিশ মাদক ব্যবসার অভিযোগে তাকে গ্রাম থেকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। থানায় নেওয়ার পর তাকে বলা হয়, তিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়েছেন- এ অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে; ঢাকা থেকে পুলিশ আসছে, তাকে নিয়ে যাবে। জজ মিয়া জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় সিআইডির তৎকালীন এএসপি আব্দুর রশিদসহ কয়েকজন থানায় যান। তার হাত ও চোখ বাঁধেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে মারধর শুরু করেন তারা। জজ মিয়া বলেন, মারার কারণ জানতে চাইলে আমাকে বলেছিলেন, 'তুই এত বড় হামলা চালিয়ে গ্রামে এসে লুকিয়ে আছিস! তুই আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিস।' পরদিন সকালে তাকে ঢাকায় সিআইডি কার্যালয়ে আনা হয়।

ফ্যানে ঝুলিয়ে নির্যাতন : জজ মিয়া জানান, গ্রেনেড হামলার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য তাকে চাপ দেন তৎকালীন সিআইডির কর্মকর্তা। কিন্তু তিনি রাজি না হওয়ায় তার ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। স্বীকার না করলে তাকেসহ তার পরিবারকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। একাধিক মামলার আসামি করারও হুমকি দেন তারা। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয় তাকে। জজ মিয়া বলেন, 'সিআইডির এসপি রুহুল আমিন আমাকে বলেছিলেন- তুই নিজে বাঁচ, পরিবারকে বাঁচা, আমাদেরও বাঁচা।' ঘটনা স্বীকার করলে তাকে কারাগার থেকে বের করে আনার মিথ্যা আশ্বাসও দিয়েছিল পুলিশ। এক পর্যায়ে পরিবারের কথা চিন্তা করে তিনি দায় স্বীকারের সিদ্ধান্ত নেন।

রিমান্ডে জবানবন্দি মুখস্থ করানো হতো :জজ মিয়া বলেন, সিআইডির এক কর্মকর্তা তাকে একটি কাগজে জবানবন্দি লিখে মুখস্থ করতে বলেন। ১৭ দিন রিমান্ডে তিনি ওই জবানবন্দি মুখস্থ করেন। রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করে স্বীকারোক্তি আদায় করে সিআইডি। জজ মিয়া জানান, স্বীকারোক্তি দেওয়ার কারণে তার মা জোবেদা খাতুনকে সংসার চালানোর জন্য মাসে ৩-৪ হাজার টাকা দিতেন এসপি রুহুল। বছরখানেক দেওয়ার পর বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে এলে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

কারাগারে দেখা করতে যেতেন তিন কর্মকর্তা :জজ মিয়া জানান, তাকে দুই দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখার পর কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। ১৫-২০ দিন পর এসপি রুহুল আমিন ও এএসপি রশিদ কাশিমপুর কারাগারে যান। এসপি রুহুল তাকে বলেন, যেন কোনোভাবেই সিদ্ধান্ত না পাল্টান তিনি। জবানবন্দিতে যা বলেছেন তাই যেন ঠিক থাকে পরবর্তী সময়ে। মোবাইল ফোনে মা জোবেদা খাতুনের সঙ্গে ছেলে জজের কথাও বলিয়ে দেন এসপি রুহুল। প্রতি মাসে অন্তত একবার জজ মিয়ার কাছে এসপি রুহুল, এসপি রশিদ ও আতিক দেখা করে তাকে শাসিয়ে আসতেন।

কনডেম সেলে বন্দি : জজ মিয়া বলেন, 'আমি ফাঁসির আসামি না হওয়া সত্ত্বেও আমাকে কনডেম সেলে রেখেছিল। অন্ধকার রুমে আমি একা। সব সময় ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখত। রুম থেকে বের হতে দিত না। কোনো আসামির সঙ্গে দেখা করতে পারতাম না। শুধু তিনবার খাবার দিয়ে আসত।'

অবশেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন আদালতে সিআইডির দাখিল করা চার্জশিটে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় জজ মিয়াকে। ২০০৯ সালে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। আতঙ্কে গ্রামের বাড়ি থেকে মা ও বোনকে নিয়ে তিনি আবার ঢাকায় চলে আসেন। তার অপর তিন ভাইও আতঙ্কে গ্রাম ছেড়েছেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামিদের ফাঁসি দাবি করেন জজ মিয়া।

আরও পড়ুন

উত্তাপের সঙ্গে মিশে আছে উত্তেজনাও

উত্তাপের সঙ্গে মিশে আছে উত্তেজনাও

সারাদেশের ৩০০ নির্বাচনী এলাকার মধ্যে ঢাকা-১ আসন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ঢাকা ...

সরব এশিয়া-ইউরোপ

সরব এশিয়া-ইউরোপ

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নৃশংসতায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার ...

তারাই আমাদের বাতিঘর

তারাই আমাদের বাতিঘর

আবার এসেছে ফিরে ডিসেম্বর। শোক, শক্তি ও সাহসের মাস, আমাদের ...

মর্মন্তুদ সেই দিন আজ

মর্মন্তুদ সেই দিন আজ

'আজ এই ঘোর রক্ত গোধূলিতে দাঁড়িয়ে/ আমি অভিশাপ দিচ্ছি তাদের/ ...

রাজনীতিবিদরা কি হারিয়ে যাবেন

রাজনীতিবিদরা কি হারিয়ে যাবেন

পরিসংখ্যান অনেক সময় নির্মম, যেমন পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুদের, ...

ব্যবসায়ীদের হাতেই এখন নাটাই

ব্যবসায়ীদের হাতেই এখন নাটাই

গত ৬ অক্টোবর ২০১৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মহামান্য ...

নির্বাচন উদ্দীপনার নাকি আশঙ্কার

নির্বাচন উদ্দীপনার নাকি আশঙ্কার

২০১৪ সালে যেমন কোনো বিকল্প ছিল না, এই ২০১৮-তেও তেমনি ...

তোমার আমার মার্কা...

তোমার আমার মার্কা...

বিষণ্ণ মনে সোফায় বসে পেপার পড়ছিলেন বাবা। ক্লাস নাইনে পড়া ...