গোলটেবিল আলোচনা

নির্বাচনী ট্রেন যেন দুর্ঘটনা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছে

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও সমকালের উদ্যোগ

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

'শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে করণীয়' শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায়ের নিশ্চয়তা দিতে পারে। এটা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্নিষ্ট সবারই ভূমিকা রয়েছে। নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। কেন্দ্রে নারী ভোটারের সরব উপস্থিতি শান্তিপূর্ণ ভোটের অন্যতম মানদণ্ড বলেও তারা মন্তব্য করেন। প্রায় সব বক্তাই বলেন, দেশ এখন নির্বাচনমুখী। নির্বাচনী ট্রেন চলতে শুরু করেছে। দুর্ঘটনা ছাড়াই এটা যেন গন্তব্যে পৌঁছে।

সমকাল ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে গতকাল সোমবার রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে এ গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান আলোচক হিসেবে অংশ নেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব). ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফির সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের (ডিআই) চিফ অব পার্টি কেটি ক্রোক। সমাপনী বক্তব্য দেন ঢাকায় ডিআইর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) গ্লেন কোয়েন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, শুধু প্রার্থী ও দল নিয়ে কথা বললে হবে না, ভোটারদের নিয়ে কথা বলতে হবে। শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোট করতে হলে ভোটারদের কাছে যেতে হবে এবং তাদের অংশগ্রহণ জোরদারের জন্য সচেতনতা বাড়াতে হবে।

ভোটকেন্দ্রে যত বেশি নারী আসবেন, তত বেশি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ৫০ ভাগ জনগোষ্ঠীকে বাইরে রেখে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হতে পারে না। নারীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। আবার দেশে অনেক শিক্ষিত নারী থাকলেও তার কতজন নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারছেন- এটাও দেখার বিষয়। নারীর পাশাপাশি সব ধরনের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটারদের জন্য কথা বলা দরকার। নির্বাচন কমিশনকে এটা দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের রক্ষায় সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।

শান্তিপূর্ণ ভোট উপহার দিতে ইসির সক্ষমতার প্রসঙ্গ টেনে সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় 'ঝুঁকি যাচাই' খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে অতীতে যেসব কেন্দ্রে সংঘাত হয়েছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান থাকা চাই। কোন জায়গায় নিরাপত্তা দেব, এটার জন্য এ ধরনের উপাত্ত দরকার। গবেষণার কাজেও লাগে। কিন্তু পুলিশ ও ইসিতে এ বিষয়ক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তাই নিরাপত্তা পরিকল্পনা বলেও কিছু নেই। একটা সিকিউরিটি ম্যানুয়াল তৈরির দাবি জানিয়ে এলেও এখনও তা হয়নি। তিনি বলেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য নির্বাচন কমিশনারদের নৈতিকভাবে সঠিক হতে হবে। যে শপথ নিয়েছেন, তার ওপর স্থির থাকতে হবে। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা মনোনয়ন পেয়েছেন শুধু নয়, এমন লোক এর মধ্যে আছেন, যারা ব্যাংক খেয়ে ফেলেছেন।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই। এরই মধ্যে দেশে একাদশ সংসদ নির্বাচনের ট্রেন চালু হয়েছে। কোনো প্রকার দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে ট্রেনটি যাতে তার গন্তব্যে পৌঁছতে পারে, এ ব্যাপারে সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি ন্যায়ভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণে সমকাল কাজ করছে। সামাজিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে এমন গোলটেবিল বৈঠকের সারথি হয়েছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক এমন আয়োজন সামনেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।

গ্লেন কোয়েন বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দেশের নেতৃত্ব নির্বাচন কোনো ছোট ব্যাপার নয়। অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই- এটি একটি ভালো স্লোগান হতে পারে। এটাকে বাস্তবায়ন করতে মানুষকে সম্পৃক্ত করা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, ঝুঁকি হ্রাস, শক্তিশালী প্রক্রিয়া এবং অংশগ্রহণমূলক না হলে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয় না। যানজটের কারণে ভোটাররা ঠিক সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবে কি-না, এ রকম ছোট ছোট বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

কেটি ক্রোক বলেন, বাংলাদেশে আমি ছয় বছর আছি। এবারের নির্বাচনে সব দল অংশ নিচ্ছে। তাই আমার দেখার আলোকে মনে হচ্ছে, এবারের নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য সবাই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে অপেক্ষা করছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করার জন্য সামনের সপ্তাহ ও মাসগুলোতে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারি, সেটি নিয়েই আমরা এখন আলোচনা করছি।

ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক আশিস সৈকত বলেন, নির্বাচনী আইন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও আচরণবিধি যদি প্রার্থী, দল ও তাদের সমর্থকরা মেনে চলেন তাহলে নির্বাচন এমনিতেই শান্তিপূর্ণ হবে। এবার এখন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় আছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন এখন চালকের আসনে রয়েছে। তারা কতটা শক্ত অবস্থান থেকে ও দক্ষভাবে পরিচালনা করতে পারে তার ওপর শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের অনেক কিছু নির্ভর করছে। নারায়ণগঞ্জের এসপি বদল করে সেখানে গাজীপুরের এসপিকে নিয়োগ দেওয়ার মতো বার্তাগুলো নির্বাচনী মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিএনপির সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট নেওয়াজ হালিমা আরলী বলেন, আমরা অশান্তিতে আছি বলেই শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করছি। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি, গ্রেফতার ও পোলিং এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণ করার মধ্য দিয়ে ভোটকেন্দ্রে যে তথাকথিত 'শান্তিপূর্ণ পরিবেশ' তৈরি হয়, সেরকম নির্বাচন চাই না। এজন্য সবার জন্য অবাধ ও আইনানুগ সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

আওয়ামী লীগের প্রচার উপ-কমিটির সদস্য আরিফা রহমান রুমা বলেন, রাজনীতি যখন অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাত গ্রাস হয় তখন অশান্তির বিষয় হয়ে ওঠে। এখন নির্বাচনী রাজনীতি কলুষিত হওয়ার প্রধান কারণ ব্যবসায়ীদের প্রার্থী হওয়া। তাই অসৎ প্রার্থী ও মানুষদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শোয়াইব জিবরান বলেন, নির্বাচনে দু'পক্ষ মারামারি করবে আর রেফারি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবে, তাহলে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে না। ডিজিটাল যুগে সারা বিশ্বের ক্যামেরাগুলো আগামী নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে- এটা মাথায় রাখতে হবে।

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র ডিরেক্টর ড. আব্দুল আলিম বলেন, নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করার জন্য নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী এ তিনটি পরিস্থিতি মাথায় রাখতে হয়। কারণ অতীতের নির্বাচনগুলোতে বিভিন্ন ধাপে বিশৃঙ্খলা তৈরির নজির রয়েছে। তাই আগে থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্নেষক মুজতবা আহমেদ মোরশেদ বলেন, এখন জটিল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে হলে ইসিকে শক্ত হাতে পরিচালনা করতে হবে।

ডিআইর সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার লিপিকা বিশ্বাস বলেন, নির্বাচনে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি অবশ্যই আলাদাভাবে মাথায় রাখতে হবে।

আলোচনায় আরও অংশ নেন মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ঝর্ণা বাড়ৈ, প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সহকারী সম্পাদক মেহের নিগার হোসেন তন্ময়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য নূরজাহান আক্তার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সদস্য জুনায়েদ মুফরাদ মওসুম, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক বি এম নাজিম মাহমুদ, স্কুল কার্যক্রম সম্পাদক আরাফাত বিল্লাহ খান, খুলনা নগর ছাত্রদলের সাবেক প্রচার বিষয়ক সম্পাদক বোরহানউদ্দিন সেতু। এ ছাড়াও তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের (বিওয়াইএলসি) সদস্য মোস্তফা ইমন, আজিজুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সারতাজ আলিম বক্তব্য রাখেন। ইউএসএআইডি ও ইউকেএইডের যৌথ অর্থায়নে এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের বাস্তবায়নে 'স্ট্রেংদেনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্পের' 'নারীর জয়ে সবার জয়' ক্যাম্পেইনের আওতায় এ গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

ফ্রান্সে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত ৩

ফ্রান্সে বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত ৩

ফ্রান্সে একজন বন্দুকধারীর গুলিতে কমপক্ষে তিনজন মারা গেছেন। এ ছাড়া ...

অর্থ আদায়ের 'অদ্ভুত' খাত ভিকারুননিসায়

অর্থ আদায়ের 'অদ্ভুত' খাত ভিকারুননিসায়

"অদ্ভুত অদ্ভুত খাত চালু করে প্রতিনিয়ত অভিভাবকদের পকেট কাটছে ভিকারুননিসা ...

'অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ' গড়বে আওয়ামী লীগ

'অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ' গড়বে আওয়ামী লীগ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই প্রধান জোটেই চলছে ...

ক্ষমতার ভারসাম্য চায় ঐক্যফ্রন্ট

ক্ষমতার ভারসাম্য চায় ঐক্যফ্রন্ট

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই প্রধান জোটেই চলছে ...

যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও ভোটের লড়াইয়ে

যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও ভোটের লড়াইয়ে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি, যুদ্ধাপরাধে ...

সর্বাত্মক সঙ্গী সোভিয়েত ইউনিয়ন

সর্বাত্মক সঙ্গী সোভিয়েত ইউনিয়ন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারত প্রত্যক্ষভাবে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করলেও ...

৩৬৫ দিনই পাশে

৩৬৫ দিনই পাশে

চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া যৌনপল্লী থেকে জাতীয় ...

নির্বাচনের খরচে চোখ রাখছে দুদক

নির্বাচনের খরচে চোখ রাখছে দুদক

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চোখ এখন নির্বাচনী মাঠে। প্রচারণায় অস্বাভাবিক ...