কাকে সমর্থন দেবে বিএনপি

প্রার্থী শূন্য ৬ আসন

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮     আপডেট: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

বিশেষ প্রতিনিধি

মনোনয়নপত্র বাছাইকালে বাদপড়া বিএনপি নেতারা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশনে আপিল ও প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে তারা প্রার্থিতা ফিরে পাবেন। ঢাকা-১, শরীয়তপুর-১, মানিকগঞ্জ-২, বগুড়া-৭, জামালপুর-৪ ও রংপুর-৫ এই ছয়টি আসনে বিএনপির সব প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়ে গেছে। রোববার সংশ্নিষ্ট জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষে তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। প্রার্থিতা ফিরে না পেলে শূন্য হয়ে যাওয়া আসনগুলোতে বিএনপির অনানুষ্ঠানিক সমর্থন কারা পাবেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা। তবে গতকাল এক রিট আবেদনের শুনানিতে রংপুর-৫ আসনে জামায়াত নেতা গোলাম রব্বানীর মনোনয়নপত্র দ্রুত গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। একইসঙ্গে রংপুরের রিটার্নিং কর্মকর্তাকে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে দুই হাজার ২৭৯ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ও ৭৮৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। তবে যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, তারা গতকাল সোমবার থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে আপিল করতে শুরু করেছেন। আগামীকাল বুধবার পর্যন্ত মনোনয়ন ফিরে পেতে ইসিতে আপিল করা যাবে। ৬-৮ ডিসেম্বর আপিল আবেদনের শুনানি শেষে সিদ্ধান্ত জানাবে ইসি।

ঢাকা-১ :এ আসনে বিএনপি নেতা খন্দকার আবু আশফাক এবং ফাহিমা নাসরিন জুবিলির মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। নবাবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ সময়মতো না ছাড়ার কারণে আশফাকের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। অন্যদিকে দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে জুবিলির মনোনয়ন বাতিল করা হয়। দু'জনই ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন। নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, বিএনপির দুই প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলকে রাজনৈতিক কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম ও ফেসবুকে তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের চরম ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। ব্যাপারটি ভালোভাবে দেখছেন না সাধারণ ভোটাররাও। নির্বাচন ঘিরে যে আমেজ তৈরি হয়েছিল, তাতে ভাটা পড়বে- যদি আসনটিতে বিএনপির কোনো প্রার্থী না থাকে।

দোহার-নবাবগঞ্জের বিএনপি কর্মী-সমর্থকরা বলছেন, খন্দকার আবু আশফাক গত ২৮ নভেম্বর সব নিয়ম মেনে তার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানের পদেও ইস্তফা দিয়েছেন। এখন বলা হচ্ছে, তার ইস্তফার কাগজ নাকি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছায়নি। ঢাকা-১ আসন হচ্ছে বিএনপির ঘাঁটি। তাই তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য ইসির মাধ্যমে সরকারি দলের ষড়যন্ত্র চলছে। নবাবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবেদ হোসেন বলেন, বিএনপির প্রার্থী নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তাই বিএনপির মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। বিগত চারবার এ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য ছিল। সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন উর রশিদ উসমানি বলেন, তারা প্রার্থিতা ফিরে পাবেন বলে আশা করছেন। বিএনপি প্রার্থী খন্দকার আবু আশফাক সমকালকে জানান, নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলাম, সুতরাং আমার মনোনয়নপত্র বাতিলের কোনো সুযোগ নেই। আমি এর বিরুদ্ধে রিট করেছি। বিএনপির অপর প্রার্থী ফাহিমা হোসাইন জুবলী বলেন, ৫ ডিসেম্বর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আপিল করবেন তিনি।

মানিকগঞ্জ-২ :এ আসনে বিএনপি প্রার্থী মাইনুল ইসলামের মনোনয়নপত্রে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বাক্ষরের সঙ্গে হুবহু মিল না থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এ ছাড়া একই আসনের আরেক বিএনপি প্রার্থী আবিদুর রহমান সময়মতো সিঙ্গাইর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ না করায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মানিকগঞ্জ-২ (সিঙ্গাইর-হরিরামপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থীদের পাশাপশি এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাবেক এমপি এস এম আবদুল মান্নানের মনোননয়নপত্রও বাতিল হয়েছে। বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির কোনো প্রার্থী না থাকলে যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা যদি আপিল করে তাদের মনোনয়নপত্রের বৈধতা ফিরে না পান, তবে বিকল্পধারার প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে কিছুটা সুবিধা পাবেন।

এ আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক এমপি মমতাজ বেগম, বিকল্পধারার গোলাম সারোয়ার মিলন, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের মোহাম্মদ ফেরদৌস আহমেদ আসিফ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ আলীর।

এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে। কিন্তু বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ায় কার্যত আওয়ামী লীগের কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী রইল না। জেলা বিএনপির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট জামিলুর রশিদ খান জানান, মানিকগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির মূল প্রার্থী হচ্ছেন মঈনুল ইসলাম খান শান্ত। যে কারণে তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে তা নির্বাচন কমিশনে আপিল করলেই বৈধ হয়ে যাবে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থীশূন্য থাকার কোনো আশঙ্কা নেই। কাজেই বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীর কথা আমরা ভাবছি না। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া বিএনপির আরেক প্রার্থী আবিদুর রহমান রোমানও আশা করেন, তার প্রার্থিতা বৈধ হবে এবং দল তাকেই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে।

বগুড়া-৭ :দ প্রাপ্ত হওয়ায় বগুড়া-৭ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ না করার দায়ে বিএনপির অন্য দুই প্রার্থী মোর্শেদ মিল্টন এবং সরকার বাদলের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। বগুড়া ব্যুরো জানায়, প্রার্থীশূন্য হয়ে পড়া বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে দলের প্রার্থিতা আবারও ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী স্থানীয় বিএনপি নেতারা। তারা ওই আসনে আপাতত বিকল্প আর কাউকে সমর্থনের কথা ভাবছেন না। বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলছেন, 'দেশে যদি নূ্যনতম আইনের শাসন থাকে, তাহলে ওই আসনে আমরা আমাদের প্রার্থিতা ফিরে পাব।'

যদি শেষ পর্যন্ত দুই প্রার্থীর একজনও প্রার্থিতা ফিরে না পান সে ক্ষেত্রে ওই আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ হওয়া অন্য কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেবেন কি-না- এমন প্রশ্নে বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, 'আমরা প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। তবে শেষ পর্যন্ত তা না হলে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করবেন তারা।

জামালপুর-৪ :জামালপুর-৪ (সরিষাবাড়ী) আসনে বিএনপির প্রার্থী সরিষাবাড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফরিদুল কবির তালুকদারের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে পদত্যাগপত্র গৃহীত না হওয়ায়। এ আসনে বিএনপির বিকল্প কোনো প্রার্থী ছিল না। সরিষাবাড়ী (জামালপুর) প্রতিনিধি জানান, জামালপুর-৪ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও জামালপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফরিদুল কবীর তালুকদার শামীমের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় দলের নেতাকর্মী ও ভোটারদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। তারা বিকল্প কাউকে এ আসনে সমর্থন দিতে রাজি নন। ২৬ নভেম্বর উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন ফরিদুল কবীর। ২৮ নভেম্বর তিনি সরিষাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের কাছে তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। শেষ পর্যন্ত ফরিদুল কবীর নির্বাচন করতে না পারলে দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী মাঠে কীভাবে অংশগ্রহণ করবে তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি বলে জানান স্থানীয় বিএনপি নেতারা।

রংপুর-৫ :রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি সোলায়মান আলম ফকির এবং জেলা বিএনপির সদস্য মমতাজ হোসেনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে নথিতে ত্রুটি থাকায়।

রংপুর অফিস ও মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিনিধি জানান, হলফনামায় সই না করা এবং তথ্য গোপনসহ নানা অসঙ্গতির কারণে এ আসনে বিএনপির দুই প্রার্থীরই মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। এ আসনে বিএনপির সোলায়মান আলম ফকির ও বিকল্প প্রার্থী ডা. মমতাজ হোসেনসহ ৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। দলীয় দুই প্রার্থীরই মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাওয়ায় বিএনপির ভোটাররা কিছুটা হতচকিত হয়ে পড়েন। তবে বিএনপি মনোনীত জামায়াতের গোলাম রব্বানীর মনোনয়নপত্র গ্রহণে হাইকোর্টের নির্দেশের পর এক ধরনের স্বস্তি লক্ষ্য করা যায়। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি একেএম রুহুল্লাহ জুয়েল ও রংপুর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক খাজানুর রহমান জানান, বিএনপির দুই প্রার্থী আপিল করেছেন। আশা করছেন, তারা প্রার্থিতা ফিরে পাবেন। যদি কোনো কারণে দলীয় প্রার্থীরা নির্বাচন করতে না পারেন, সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রব্বানীর জন্য কাজ করবেন। বৈধ প্রার্থী ঐক্যফ্রন্টের মোফাখখারুল ইসলাম নবাবের পক্ষেও নির্বাচন করার কথাও বলেছেন কেউ কেউ।

শরীয়তপুর-১ :বিলখেলাপির অভিযোগে শরীয়তপুর-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী সর্দার একেএম নাসিরুদ্দিন কালুর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। তবে আশা ছা?ড়েন?নি তি?নি। আ?পি?লের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। আ?পিলে মনোনয়ন বহাল থাক?বে ব?লে তার বিশ্বাস। শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানান, টিঅ্যান্ডটির টেলিফোন বিল বাবদ ৩ হাজার ৮১৫ টাকা বকেয়া থাকায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন শরীয়তপুরের রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী আবু তাহের। জা?জিরা উপ?জেলা বিএনপির সা?বেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা বিএনপি নেতা বজলুর র?শিদ সিকদার ব?লেন, তি?নি সা?বেক এম?পি এবং ১৯৯১ সাল থে?কে গত বছর পর্যন্ত বেশ ক?য়েক?টি নির্বাচ?নে অংশ নিয়েছেন। এত আগের কোনো বিল ব?কেয়া থাক?তে পা?রে না। এটি একটি সাজা?নো বিষয়। জেলা যুবদ?লের সভাপ?তি আরিফুজ্জামান আরিফ মোল্লা ব?লেন, আমা?দের প্রার্থী জেলা বিএন?পির সাধারণ সম্পাদক তিনবার নির্বা?চিত এম?পি, একবার পৌরসভার মেয়র নির্বা?চিত। এ আস?নের যোগ্য প্রার্থী হি?সে?বে তা?কে ম?নোনয়ন দেওয়া হ?য়ে?ছে। তার ম?নোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে আ?পিল হচ্ছে। আশা ক?রি আমা?দের মনোনয়ন ফিরে পাব।