এত মনোনয়ন বাতিল কেন

আওয়ামী লীগে স্বস্তি, বিএনপির অভিযোগ নাকচ

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

অমরেশ রায়

দল ও জোটপ্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিলের সংখ্যা অনেক কম থাকায় স্বস্তির ভাব দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগে। বাতিলের তালিকায় স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানো দলের বিদ্রোহী প্রার্থী বেশি থাকায় চাপা আনন্দও রয়েছে তাদের ভেতর। কারণ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময়সীমার আগেই এদের নির্বাচনের মাঠ থেকে সরানোর ঝামেলায় আর যেতে হচ্ছে না।

তাছাড়া নির্বাচনের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের হেভিওয়েটসহ অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় নির্বাচনী মাঠে অনেকটাই এগিয়ে থাকা যাবে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা।

রোববার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে সারাদেশে ৭৮৬ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়। এর মধ্যে বিরোধী দলের প্রার্থীই বেশি। এ নিয়ে সরকারি দলের দিকে অভিযোগের তীরও ছুড়েছে বিএনপি।

'নির্বাচনে জয়ী হতে বেছে বেছে বিএনপির জনপ্রিয় নেতাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে'- বিএনপি নেতাদের এমন অভিযোগ নাকচ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, মনোনয়নপত্র বাতিলের বিষয়টি সম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে। সরকার মনোনয়ন বাতিলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব (গতকাল অব্যাহতিপ্রাপ্ত) রুহুল আমিন হাওলাদারের মনোনয়ন বাতিল হতো না। তাছাড়া আওয়ামী লীগ ও জোটের অনেক প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল হয়েছে। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের কারণেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার তিনটি মনোনয়নপত্রই বাতিল হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ সমকালকে বলেন, নানা কারণে বিভিন্ন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এটি কেবল বিএনপির বেলায় হয়েছে তা নয়, অন্য দলগুলোর বেলায়ও হয়েছে। কাজেই মনোনয়ন বাতিল বিষয়ে বিএনপি যা বলছে, সেটি মিথ্যাচার ও অপপ্রচার।

আওয়ামী লীগে মনোনয়নের জন্য নির্বাচিত তিনজন প্রার্থী ছাড়া বাকি সবার জমা দেওয়া মনোনয়নপত্রই বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছে। কুড়িগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য জাকির হোসেনের মনোনয়নপত্র অসম্পূর্ণ ও তথ্যের ঘাটতি থাকায় বাতিল হয়েছে। এ ছাড়া ১৪ দল ও মহাজোটের শরিক দলগুলোর বেশ কয়েকজনের মনোনয়নপত্রই বাতিল হয়েছে।

মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন, সারাদেশে এমন আওয়ামী লীগ নেতা কমপক্ষে ৯৫ জন। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ জনেরই মনোনয়ন রোববার যাচাই-বাছাইকালে বাতিল হয়েছে। তবে আসন বণ্টনের সমঝোতায় ছাড় পাওয়া ১৪ দলের শরিকদের ১৩টি আসনের সবকটিতেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টিকে দেওয়া আসনগুলোতেও দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। এসব আসনের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রত্যাহার করাতে আওয়ামী লীগকে বেশ বেগ পেতে হবে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বলেছেন, দল ও জোটের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ার শুরু থেকে দলের মধ্যেই সংশয় ছিল, বিভিন্ন মামলায় সাজা পাওয়ায় অথবা ঋণখেলাপি হওয়ায় আইনি জটিলতায় বেশ কয়েকজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যেতে পারে। অসুস্থতার কারণেও শেষ পর্যন্ত কারও কারও পক্ষে নির্বাচন করা সম্ভব না-ও হতে পারে। তাই মনোনয়নপত্রের চিঠি দেওয়ার সময় এসব আসনে দু'জন করে প্রার্থী দেওয়া হয়। ২৬৪ আসনে আওয়ামী লীগসহ নৌকার প্রার্থীদের মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হলেও কমপক্ষে ১৭টি আসনে দ্বৈত বা বিকল্প প্রার্থী ছিল। তবে যাদের নিয়ে সংশয় ছিল, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইকালে তারা সবাই প্রার্থিতার দৌড়ে টিকে গেছেন।

দলের একজন নেতা উদাহরণ হিসেবে বলেছেন, দশম সংসদের দুই এমপি ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রমকে চাঁদপুর-২ এবং স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হাজী মোহাম্মদ সেলিমকে ঢাকা-৭ আসনে মনোনয়ন করার সময়ই আশঙ্কা ছিল, ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের মামলায় সাজা পাওয়ায় তাদের প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে। তাই দুটি আসনেই বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়। তারা দু'জনই প্রার্থিতার দৌড়ে টিকে যাওয়ায় দলে স্বস্তি বিরাজ করছে। আবার দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে প্রার্থী করার সময়ই আশঙ্কা ছিল, গুরুতর অসুস্থ এই নেতা বর্তমানে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন থাকায় তার পক্ষে মনোনয়নপত্র দাখিল সম্ভব হবে কি-না। এ কারণে কিশোরগঞ্জ-১ আসনেও দ্বৈত প্রার্থী রাখা হয়েছিল। তবে তার ভাই ও বোন থাইল্যান্ড গিয়ে মনোনয়নপত্রের ফরমে সৈয়দ আশরাফের স্বাক্ষর নিয়ে জমা দেওয়ায় তার প্রার্থিতাও বৈধ হয়েছে।

অন্যদিকে, কুড়িগ্রাম-৪ আসনে দলীয় প্রার্থী রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত এমপি জাকির হোসেনের প্রার্থিতা বাতিল হলেও উদ্বিগ্ন নন দলের নীতিনির্ধারকরা। কেননা ওই আসনে ১৪ দলের শরিক জাতীয় পার্টির (জেপি) বর্তমান এমপি রুহুল আমিনের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। ফলে আপিলে জাকির হোসেনের প্রার্থিতা বহাল না থাকলে এ আসনে রুহুল আমিনকেই ১৪ দলের প্রার্থী করা হবে। এ আসনে জাকিরের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা হলফনামার কয়েকটি ঘর পূরণ না করায়। একই আসনে 'স্বতন্ত্র' হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করা আওয়ামী লীগের অন্য সব বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রার্থিতাই বাতিল হয়েছে।

হবিগঞ্জ-১ আসনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন দলের সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী। হলফনামায় স্বাক্ষর না থাকায় তার মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। অবশ্য কেয়া চৌধুরী গতকাল সোমবার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেছেন, এ আসনে মহাজোট থেকে কাউকে মনোনয়ন না দেওয়ায় তিনি বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করেছেন। তাই তিনি 'বিদ্রোহী' নন- বিকল্প প্রার্থী।

এদিকে কয়েকটি আসনে মহাজোট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। যেমন, পটুয়াখালী-১ আসনে মহাজোটের বড় শরিক জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শাহজাহান মিয়া টিকে আছেন। বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে। মহাজোট শরিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তাকে ছাড় দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ঢাকা-১৭ আসনে মনোনয়ন বাতিল হয়েছে বিএনএ ও তৃণমূল বিএনপির চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার। এ আসনে আওয়ামী লীগের চিঠি পাওয়া দুই প্রার্থীর মধ্যে চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান ফারুকের মনোনয়ন স্থগিত ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের খানের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। এমন আসনগুলোর ক্ষেত্রে বিকল্প প্রার্থী থাকায় দুশ্চিন্তায় নেই আওয়ামী লীগ। মনোনয়ন বাতিল হলেও মহাজোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সংকট দেখা দেবে না বলে মনে করছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নির্বাচনী আইনে দলীয় প্রার্থী টিকবেন কি-না, তা নিয়ে যেসব জায়গায় সংশয় ছিল, সেগুলোতে আওয়ামী লীগ দু'জন করে প্রার্থী দিয়েছিল। আশঙ্কা ছিল, ঢাকা-৭ আসনের দলীয় প্রার্থী হাজী মোহাম্মদ সেলিম বাদ যেতে পারেন। তাই সেখানে দুইজন প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল। দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হাজী আবুল হাসনাতের নাম দুই নম্বরে ছিল। কিন্তু হাজী সেলিম টিকে গেছেন।

আরও পড়ুন

'অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ' গড়বে আওয়ামী লীগ

'অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ' গড়বে আওয়ামী লীগ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই প্রধান জোটেই চলছে ...

ক্ষমতার ভারসাম্য চায় ঐক্যফ্রন্ট

ক্ষমতার ভারসাম্য চায় ঐক্যফ্রন্ট

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই প্রধান জোটেই চলছে ...

যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও ভোটের লড়াইয়ে

যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও ভোটের লড়াইয়ে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি, যুদ্ধাপরাধে ...

সর্বাত্মক সঙ্গী সোভিয়েত ইউনিয়ন

সর্বাত্মক সঙ্গী সোভিয়েত ইউনিয়ন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারত প্রত্যক্ষভাবে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করলেও ...

৩৬৫ দিনই পাশে

৩৬৫ দিনই পাশে

চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া যৌনপল্লী থেকে জাতীয় ...

নির্বাচনের খরচে চোখ রাখছে দুদক

নির্বাচনের খরচে চোখ রাখছে দুদক

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চোখ এখন নির্বাচনী মাঠে। প্রচারণায় অস্বাভাবিক ...

বিএনপি কর্মীদের পিটুনিতে আ.লীগ নেতার মৃত্যু

বিএনপি কর্মীদের পিটুনিতে আ.লীগ নেতার মৃত্যু

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের প্রচারের দ্বিতীয় দিনে ফরিদপুর-৩ (সদর) ...

জনগণ স্বাধীনতার চেতনার পক্ষে ভোট দেবে: তোফায়েল

জনগণ স্বাধীনতার চেতনার পক্ষে ভোট দেবে: তোফায়েল

জনগণ স্বাধীনতার চেতনার পক্ষে ভোট দেবে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী ...