তিনটি মৃত্যু

প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮       প্রিন্ট সংস্করণ     

সুমন্ত আসলাম

ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় তার হাতে প্রথম জিনিসটা দেখেছিলাম। তিনি ক্লাস নেন ওই ফাইভ থেকেই। আমরা তাই ফোর পেরিয়ে ওই ক্লাসে পা দিতেই তিনি হাতের ওই জিনিসটা নাড়িয়ে বলেছিলেন, 'এটা একটা উদ্ভিদের অংশ- নিমগাছের ডাল; চিকন এবং ছোট। একটা উদ্ভিদের অংশ কখনও মানুষকে আঘাত করার অধিকার বা ক্ষমতা রাখে না। তোমরা যা ভেবেছ, তা না; আমি এটা অন্য কাজে ব্যবহারের জন্য এনেছি।' পণ্ডিত খগেন মুন্সী স্যার সবগুলো হারিয়ে তার সবেধন নীল মণি সামনের লম্বা দুই দাঁত বিকশিত হাসিতে আরও বলেছিলেন, 'মানুষকে আঘাত করে কখনও মানুষ করা যায় না, করতে হয় ভালোবেসে।'

ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগ পর্যন্ত স্যারের ক্লাস করেছি আমরা। হাতের ওই নিমের ডাল তত দিনে বেশ ছোট হয়ে গেছে। ঘোলাটে পাঞ্জাবির ঘাড়ের পেছনের অংশটা এক হাতে তুলে, আরেক হাত দিয়ে কায়দা করে ওই ডালটা ঢুকিয়ে দিতেন পিঠে। মনের সব সুখ নিয়ে জায়গাটা চুলকাতেন তিনি আবেশে।

পিঠের চামড়ায় একটা অসুখ ছিল স্যারের। অভাবের সংসারে তেমন চিকিৎসা করতে পারেননি তিনি। ক্লাসে এসে পরম যত্নে আমাদের পড়ানোর ফাঁকে পরম সুখে মাঝেমধ্যেই তাই চুলকিয়ে নিতেন পিঠটা।

মানুষ তথা ছাত্রের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হয় একজন শিক্ষকের, পণ্ডিত খগেন মুন্সী স্যার প্রতিদিন একটু একটু করে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন আমাদের।

সম্ভবত ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, শাখাপ্রধান জিন্নাত আরা এবং অরিত্রির শ্রেণিশিক্ষক হাসনা হেনার পণ্ডিত মশাইয়ের মতো ও রকম কোনো শিক্ষক ছিলেন না। আমি নিশ্চিত- থাকলে তারা একজন ছাত্রী ও তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ও রকম অশোভন আচরণ করতেন না এবং প্রদর্শন করতেন না ভয়ভীতিও। একজন শিক্ষকের শিক্ষা দেওয়ার পারদর্শিতার চেয়ে প্রথম প্রয়োজন তার শোভন আচরণ, তার কাছে শিখতে আসা কোমলমতিদের প্রতি ব্যবহার এবং একটি স্নেহশীল মন।

এ পি জে আবুল কালাম শুধু ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, কেবল বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিক্ষক এবং একজন উজ্জ্বল মনীষীও। তিনি বলেছিলেন, 'শিক্ষকতা একটি মহান পেশা, যা কোনো শিক্ষার্থীর চরিত্র, যোগ্যতা ও ভবিষ্যৎকে একটি বিশেষ রূপ দেয়। যদি মানুষ আমাকে একজন ভালো শিক্ষক হিসেবে স্মরণ করে, তাহলে ওটা হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মানের।'

বাবা-মায়ের সঙ্গে নির্দয় আচরণ করছেন অধ্যক্ষ, পাশে দাঁড়িয়ে অরিত্রি তা দেখেছে। পুড়ে গেছে তার বুকের ভেতর। একটু একটু করে ক্ষয়ে গেছে তার মানস।। বিষ-নীল হয়ে গেছে তার অস্তিত্ব। তারপর বাবা-মাকে স্কুলে রেখেই তার প্রস্থান। বাসায় ফ্যানের সঙ্গে তার শেষ নিঃশ্বাস।

অরিত্রির প্রিয় গিটারটি কালো কভারে বন্দি। বিড়ালটি সারাবাড়ি ঘুরঘুর করছে- খুঁজছে কাউকে। পড়ার টেবিলে ঠাস বুনোনে বই আর প্রশ্নপত্রের অপেক্ষা। স্কুল ড্রেস, বেল্ট আর রুমালটি থমকে আছে বিছানায়। সদ্য কৈশোর পেরোনো মেয়েটা যেন ঘরে ঢুকেই বিড়ালটা কোলে নেবে আদরে, গিটারে আঙুল ছুঁইয়ে গেয়ে উঠবে- আমাকে আমার মতো থাকতে দাও...।

নিরন্তর জীবনে আমাদের মৃত্যু আসে একেক চেহারায়, একেক গন্ধে। মানবিক লেখক এরিক মারিয়া রেমার্ক তার 'এ টাইম টু লাভ অ্যান্ড এ টাইস টু ডাই' বইয়ে লিখেছেন- মৃত্যু; ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ কী অবিশ্বাস্য ক্ষমতা। এক নিমেষে থমকে দাঁড়ায় জীবন, হোক সে তুচ্ছ কিংবা অমিত সম্ভাবনাময়। একমুহূর্ত আগেও যে ছিল উচ্ছল প্রাণবন্ত, পরমুহূর্তেই সে নেই। কী অবিশ্বাস্য এই না থাকা!

বিশ্বাস করেননি কাজী মো. মহসিন ফারুকও। চট্টগ্রাম থেকে এই দাঁতের চিকিৎসক রাত পেরিয়ে বাসে আসছিলেন ঢাকায়। কয় মাস আগে আকদ হওয়া চক্ষুচিকিৎসক স্ত্রী রুম্পাও ঢাকায় পৌঁছবেন সিলেট থেকে। একটি হাসপাতালে পরীক্ষা দেবেন তিনি। জানুয়ারিতে ধুমধাম করে বিয়ে হবে তাদের। পরীক্ষা শেষে একটু ফুরসত, রাজধানীতে একটু ঘোরাফেরা, কিছু কেনাকাটা, তারপর ভালো কোনো হোটেলে প্রিয় কোনো খাবার খেয়ে রাতে রুম্পা আবার সিলেটে, ফারুক চট্টগ্রামে।

কিন্তু রুম্পার সকালটাই পেরোল না। সিএনজিতে চড়া তাকে ধাক্কা দেয় একটা বাস। মারা যান তিনি। ছয় বছরের সম্পর্ক শেষে পরিণত জীবন আর যাপন করা হলো না তার। নিথর দেহ ময়নাতদন্তের জন্য পড়ে আছে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে। বাবা আখতারুজ্জামান চোখে প্রবল জল নিয়ে চিৎকার করে ওঠেন, 'তোমরা আমার মেয়েটাকে কাটতে দিয়ো না।'

'মৃত্যু জীবনের বিপরীত কিছু নয়, বরং ওটা জীবনেরই একটা অংশ।' জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামি খুব আনন্দ নিয়ে বলেছেন কথাটা। আর পার্সিয়ার কবি রুমি বলেছেন, 'বিদায় হচ্ছে তাদের জন্য, যারা তাদের চোখ দিয়ে ভালোবাসে। যারা হৃদয় এবং আত্মা দিয়ে বাসে, তাদের জন্য আলাদা হওয়ার মতো কোনো শব্দ নেই।' আর মৃত্যুকে অমোঘ মেনে ডেনিস লেখক গ্রেন রিংটভেট স্বদর্পে উচ্চারণ করেছেন, 'জীবনের কী মূল্য থাকত, যদি মৃত্যু না থাকত? যদি বৃষ্টি না থাকত, তবে কে সূর্যটাকে উপভোগ করত? যদি রাত না থাকত, তবে কার এমন অধীর আগ্রহ হতো দিনের প্রতি?'

তাই বলে এভাবে, এমন নির্মম মৃত্যু!

ঘরের ভেতর কাফনে মোড়ানো আড়াই বছরের ছেলের লাশ আর জীবিত আরেক ছেলেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে আছেন বাবা নুরুজ্জামান কাজল। দরজায় কেউ উঁকি দিলেই নিরবচ্ছিন্ন হুমকি তার- সবাই চলে না গেলে হত্যা করব এ ছেলেকেও।

মাদকাসক্ত, না বাবা? তার আসল পরিচয় কী?

উইলিয়াম ওয়ালেস লিংকন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের সন্তান। ১২ বছর বয়সে মারা যায় সে। সন্তানের এই অকালমৃত্যুতে লিংকন তার নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, 'এই পৃথিবীর পক্ষে বড় বেশি ভালো ছিল সে। সৃষ্টিকর্তা তাকে তাই ঘরে ডেকে নিয়েছে। যদিও এটা খুব কষ্টের।'

ইংল্যান্ডের স্ট্রিট আর্টিস্ট ব্যাংকসি বলেছেন, 'মানুষের মৃত্যু ঘটে দুবার। প্রথমবার- যখন মানুষ শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দেয়। পরেরবার- যখন তার নাম পৃথিবীতে শেষবারের মতো উচ্চারিত হয়।'

তাই তো মৃত্যুর ক'দিন পরই সম্ভবত নুরুজ্জামান কাজলের নাম কেউ আর উচ্চারণ করবে না। কিন্তু মৃত্যুর একশ' বায়ান্ন বছর পরও আব্রাহাম লিংকনের নাম উচ্চারণ করি আমরা।

গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন, 'না আগুন, না বাতাস, না জন্ম, না মৃত্যু- কোনো কিছুই আমাদের ভালো কাজকে মুছে ফেলতে পারে না।'

সম্ভবত ভালোবাসাকেও না- সে ভালোবাসা কোনো বাবার, কোনো স্বামীর, কোনো স্ত্রীর, ভাই-বোন-বন্ধুর কিংবা জীবন থেকে চলে যাওয়া উজাড় করে ভালোবাসতে পারা কোনো সঙ্গীর!

অর্থ আদায়ের 'অদ্ভুত' খাত ভিকারুননিসায়

অর্থ আদায়ের 'অদ্ভুত' খাত ভিকারুননিসায়

"অদ্ভুত অদ্ভুত খাত চালু করে প্রতিনিয়ত অভিভাবকদের পকেট কাটছে ভিকারুননিসা ...

'অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ' গড়বে আওয়ামী লীগ

'অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ' গড়বে আওয়ামী লীগ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই প্রধান জোটেই চলছে ...

ক্ষমতার ভারসাম্য চায় ঐক্যফ্রন্ট

ক্ষমতার ভারসাম্য চায় ঐক্যফ্রন্ট

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই প্রধান জোটেই চলছে ...

যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও ভোটের লড়াইয়ে

যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও ভোটের লড়াইয়ে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি, যুদ্ধাপরাধে ...

সর্বাত্মক সঙ্গী সোভিয়েত ইউনিয়ন

সর্বাত্মক সঙ্গী সোভিয়েত ইউনিয়ন

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারত প্রত্যক্ষভাবে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করলেও ...

৩৬৫ দিনই পাশে

৩৬৫ দিনই পাশে

চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া যৌনপল্লী থেকে জাতীয় ...

নির্বাচনের খরচে চোখ রাখছে দুদক

নির্বাচনের খরচে চোখ রাখছে দুদক

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চোখ এখন নির্বাচনী মাঠে। প্রচারণায় অস্বাভাবিক ...

বিএনপি কর্মীদের পিটুনিতে আ.লীগ নেতার মৃত্যু

বিএনপি কর্মীদের পিটুনিতে আ.লীগ নেতার মৃত্যু

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের প্রচারের দ্বিতীয় দিনে ফরিদপুর-৩ (সদর) ...