ভূমিতে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

হকিকত জাহান হকি

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ভূমি খাত দুর্নীতির বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বিগত দিনে মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ ও কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার লোভ-লালসার কারণে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে শুরু করে ইউনিয়ন ভূমি অফিস পর্যন্ত দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ, সম্পদ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমির মালিক হয়েছেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

লাগামহীন দুর্নীতি চলছে গোটা ভূমি খাতে। জানা গেছে, এ খাতে খাজনা আদায়, জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণে চেক জালিয়াতি, নীতিমালা ভঙ্গ করে জমি বরাদ্দ দেওয়া, জলমহাল ইজারাসহ নানা ক্ষেত্রে অবাধ দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সদ্য বিদায়ী কর্তৃপক্ষের অবহেলা, উদাসীনতা ও দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতার কারণে জনসম্পৃক্ত অতিগুরুত্বপূর্ণ এই খাতের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

নতুন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতিপ্রবণ তারা যেন চলে যান। মন্ত্রণালয়ে থাকতে হলে জনগণের স্বার্থে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে।

ভূমিমন্ত্রী সমকালকে বলেন, ভূমির সব কাজে শতভাগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। নীতি ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সব কাজ করা হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের মাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজড করা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিগগির দুই বছরের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে। প্রতিটি ভূমি অফিসের কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনা হবে। প্রতিটি অফিসে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। ভূমির দুর্নীতি ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হবে। এই খাতে মানুষের হয়রানি, ভোগান্তি বন্ধ করা হবে। সাধারণ মানুষ যাতে সহজে উন্নত সেবা পায় সে ব্যবস্থাই করা হবে। ভূমি খাতের দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ খাতগুলোর মধ্যে ভূমি অন্যতম। দেশে এমন কোনো পরিবার নেই যারা কোনো না কোনোভাবে ভূমির দুর্নীতির শিকার হয়নি। শুধু ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি নয়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভূমি নিয়েও বড় ধরনের দুর্নীতি হয়। মন্ত্রীর দুটি দিকেই দৃষ্টি দিতে হবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব ও বক্তব্য দেওয়ায় ভূমিমন্ত্রীকে তিনি সাধুবাদ জানান। তবে বলেন, মন্ত্রীর ঘোষণা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে সেটি দেখার অপেক্ষায় থাকবে দেশবাসী।

সদ্য বিদায়ী সরকারের সময় সাইফুজ্জামান চৌধুরী ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন শামসুর রহমান শরীফ। ওই সময় প্রতিমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের অনেক নিয়মবহির্ভূত কাজের প্রতিবাদ করেছেন। তার প্রতিবাদ, সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়নি। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মৎস্যজীবীদের জলমহাল ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে খেটে খাওয়া মৎস্যজীবীদের জলমহাল বিত্তবানদের ইজারা দেওয়া হয়েছে।

নতুন ভূমিমন্ত্রী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মন্ত্রণালয়, সংশ্নিষ্ট দপ্তর, অধিদপ্তর, সারাদেশের অ্যাসিল্যান্ড, ভূমি অফিসের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শিগগির মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার বিষয়ে ভূমিমন্ত্রীর ঘোষণার বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটি একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এটি একটি নতুন মাত্রা। এর যথার্থতা প্রমাণিত হবে বাস্তবায়নে। তার মেয়াদের পরেই বোঝা যাবে সেটি কতটুকু কার্যকর হলো। তাদের সম্পদে যদি অসামঞ্জস্য থাকে সে ক্ষেত্রে তিনি সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন সেটি দেখার জন্য দেশবাসী অপেক্ষা করবে। প্রতি বছরই ওই হিসাব নেওয়া হলে মন্ত্রীর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত দিনে ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর না হওয়ায় সারদেশের ভূমি অফিসগুলো দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ভূমি উন্নয়ন করসহ অন্যান্য খাতের আদায় হওয়া অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে অবাধে। সাব রেজিস্ট্রার ও এসি ল্যান্ড অফিসে জালিয়াতি করে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে জমির মালিকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। উচ্চমানের আবাসিক, বাণিজ্যিক শ্রেণির জমিকে 'নাল' 'ডোবা' দেখানো হচ্ছে। এতে সরকার প্রতিবছর মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী ভূমি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে সমকালকে বলেছিলেন, শ্রেণি পরিবর্তন করে জমির রেজিস্ট্রেশন ও নামজারির ক্ষেত্রে রাজস্ব ফাঁকি, অনিয়ম, দুর্নীতি হচ্ছে- এটা অস্বীকার করা যায় না। তিনি বলেছিলেন, জমির দলিল, নামজারি ও খাজনা পরিশোধে অনলাইন সিস্টেম চালু করা হবে। এ পদ্ধতিতে একদিকে দুর্নীতির সুযোগ কমে আসবে, অন্যদিকে দেশের মানুষ হয়রানি থেকে রেহাই পাবে। ওই অনলাইন পদ্ধতি এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। এবার তিনি খোদ মন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে কাজটি কতটুকু করতে পারেন- এটাই এখন দেখার বিষয়।

ভূমি অধিগ্রহণের চেক জালিয়াতি করেও দুর্নীতি করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকের এলএ (ভূমি অধিগ্রহণ) চেকে অযৌক্তিভাবে 'বাতিল' লিখে ভয় দেখিয়ে ক্ষতিগ্রস্তের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে পরে 'বাতিল নয়' লেখা হচ্ছে।

খাজনার দাখিলায় কারসাজি করে সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জমির মালিককে দেওয়া খাজনা রশিদে (দাখিলা) আদায় করা পুরো টাকা উল্লেখ করে এবং দাখিলার সংরক্ষিত অফিস কপিতে তুলনামূলক কম টাকা উল্লেখ করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। এমন ঘটনাও আছে যে, খাজনা আদায়কালে রসিদ বইয়ে থাকা কার্বন কপি কৌশলে ভাঁজ করে জমির মালিককে দেওয়া দাখিলায় ১০০ টাকা লেখা হয়। পরে জমির মালিক চলে যাওয়ার পর রসিদ বইয়ে থাকা কার্বন পেপার মেলে ১০ টাকা লেখা হয়। বাকি ৯০ টাকা আত্মসাৎ করেন ভূমি অফিসের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, দেশের ২৬ হাজার জলমহালের মধ্যে ৯০ শতাংশই প্রভাবশালীদের দখলে। জলমহালগুলো নিজেদের হাতে রাখতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এক বা একাধিক মৎস্যজীবী সমিতি গঠন করা হয়ে থাকে। তাতে নিয়ম অনুযায়ী ইজারায় অংশ নেওয়া ও তদবির করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পছন্দের জলমহালগুলো তাদের কর্তৃত্বে রাখতে সুবিধা হয়।

বিগত দিনে মন্ত্রণালয় নীতিমালা লঙ্ঘন করে সর্বোচ্চ দরদাতাকে পাশ কাটিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে জলমহাল ইজারা দিয়েছে। এর মধ্যে পাবনার সুজানগর উপজেলার বিলগম গাড়া, বিল কালিদহ, বিল মহিষাখালী ও বিল শাকনাই জলমহালটির সর্বোচ্চ দরদাতা বোনকোলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে বাদ দিয়ে সৈয়দপুর দক্ষিণপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। সিলেট সদর উপজেলার তিনমুড়ি ধূমখাল জলমহালটির সর্বোচ্চ দরদাতা জিলকার হাওর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে বাদ দিয়ে রহমানিয়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে ইজারা দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ইসলাম আলী সমকালকে বলেন, 'জাল যার জলা তার'- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই ঘোষণা এখন শুধুই একটি স্লোগান। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালীরাও জলমহাল দখল ও ভোগের সঙ্গে জড়িত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওয়ান-ইলেভেনের পর দুর্নীতির দায়ে জেলে যাওয়া মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) কুতুব উদ্দিন আহমদ লাগামহীন দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজধানীর গুলশানে বাড়িসহ সরকারি জমি দখলের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় সম্প্রতি তিনি জেলে যান।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী হয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা দুদকের আরেক মামলায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী আনোয়ার হোসেন বখতিয়ারও জেলে যান। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে কারাগারে থাকা ১৭ দিনও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছেন। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা তাকে সহায়তা করেছে।

বিষয় : ভূমি দুর্নীতি কর্মকর্তা-কর্মচারী ভূমি মন্ত্রণালয়