সুপারিশ বন্দি লালফিতায়

মানব পাচার বন্ধের উদ্যোগে ভাটা

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

গত বছরের জুলাইয়ে মানব পাচার বন্ধে করণীয় নির্ধারণে গঠন করা হয় পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি। কক্সবাজার জেলার বঙ্গোপসাগর দিয়ে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মানব পাচার রোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালাসহ একটি প্রতিবেদনও প্রণয়ন করে এ কমিটি। কিন্তু ছয় মাসেও এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কোনো কোনো সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করলেও অজানা কারণে পরে ভাটা পড়েছে তাতে। লালফিতায় বন্দি হয়ে পড়েছে সুপারিশগুলো।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানব পাচার-সংক্রান্ত মামলাগুলো গতানুগতিকভাবেই তদন্ত করা হয়ে থাকে। যথাযথ সাক্ষী না পাওয়ায় এসব মামলায় গতি আসে না। অনেক ক্ষেত্রে বাদীও আদালতে আসেন না। শেষ পর্যন্ত এসব মামলার আসামিরা খালাস পেয়ে যান। তদন্ত করে অভিযোগপত্র দিলেও আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে বেরিয়ে যায় তারা। এ কারণে সঠিক ও নিবিড়ভাবে সামগ্রিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ সেল থাকা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের সেলে স্বরাষ্ট্র, আইন ও অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রতিনিধি থাকতে হবে। বাদী ও সাক্ষীরা দুর্বল হওয়ায় তাদের হাজিরার বিষয়েও একটি সেল করা যেতে পারে। মামলাগুলোর নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত ট্রাইব্যুনাল করা যেতে পারে। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতারের পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে দালাল ও গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির জন্য প্রয়োজনে আইন সংশোধন করতে হবে। মানব পাচার রোধে প্রতিবেশী দেশসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে।

কিন্তু এসব সুপারিশ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। কেন হয়নি, তাও জানাতে পারছেন না সংশ্নিষ্টরা। তবে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে রয়েছে সমন্বয়হীনতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা।

দেশে মানব পাচার আইনে গত পাঁচ বছরে সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। আসামির সংখ্যা সাত হাজারের বেশি। এর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হয়েছে কয়েকটি মামলা। তবে মামলার আসামিদের কঠোর কোনো শাস্তি হয়নি।

মানব পাচার আইন অনুযায়ী, তিন মাসের মধ্যে অভিযোগ গঠন এবং ছয় মাসের মধ্যে বিচার কার্যক্রম শেষ করতে হবে। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতায় তা কার্যকর হচ্ছে না। এ আইনে অপরাধ অজামিনযোগ্য হলেও আসামিরা জামিন পেয়ে ফের মানব পাচারে যুক্ত হচ্ছে।

পাচারকারীরা গ্রেফতারের পর যাতে ছাড়া পেতে না পারে, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা-২০১৭ এসআরও জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সম্প্রতি সমকালকে বলেন, মানব পাচারকারীরা যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মানব পাচারকারী হিসেবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারোর বিরুদ্ধে যেন অভিযোগ করা না হয়, তা সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। অতিরঞ্জিত কিছু না করে সুনির্দিষ্টভাবে পাচারকারীদের চিহ্নিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে সংশ্নিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন নজির নেই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানব পাচারের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার 'জিরো টলারেন্স নীতি'তে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। আকাশ, স্থল ও নৌপথে মানব পাচার রোধে কোস্ট গার্ড অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করছে। অবৈধভাবে বিদেশে না যাওয়ার জন্য জনসচেতনতা বাড়ানো হয়েছে। মাধ্যমিক স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে মানব পাচার ও অভিবাসন-সংক্রান্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত বছর মানব পাচারকারীদের তালিকা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে কয়েকবার হালনাগাদ করা হয়। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হলেও মানব পাচার থেমে নেই। শক্তিশালী কয়েকটি চক্র দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে টাকার বিনিময়ে মানব পাচার করছে। লোক সংগ্রহের জন্য এসব চক্র বিভিন্ন জেলায় দালাল নিয়োগ করেছে। আকাশ ও স্থলপথে কড়াকড়ি হওয়ায় মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের পাচারকারীরা একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সাগরপথেও মানব পাচার করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে পাচারকারীরা গ্রেফতার হলেও যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর সাজা হচ্ছে না। অনেকেই উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে ও একই কাজ করছে।

বিভিন্ন সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে মানব পাচার বন্ধে নানা সুপারিশ করা হয়। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং গডফাদার ও আটককৃতদের জামিন অযোগ্য ধারায় বিচারের ব্যবস্থা করা। কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবে এসব সুপারিশ কার্যকর হয়নি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজার, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, কুমিলল্গা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা, পঞ্চগড়, যশোর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, জয়পুরহাট, সাতক্ষীরা, ময়মনসিংহ, ভোলা, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে সারা বছরই এখন মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের অপচেষ্টা চলছে। পাচারকারী চক্র সংশ্নিষ্ট জেলার স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে বিশেষ কমিশনের ভিত্তিতে বিভিন্ন বয়সের লোক সংগ্রহ করে কক্সবাজারে পাঠাচ্ছে। এখানে আসার পর স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার পথে রওনা দিচ্ছে তারা। বিভিন্ন জেলায় সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারীরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে শুধু মানব পাচারই করছে না, মাদক ব্যবসাও করছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেছেন, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে। তালিকাভুক্ত পাচারকারীদের গ্রেফতার করে শাস্তি দিতে হবে। উচ্চ আদালত থেকে এসব আসামি যাতে জামিন না নিতে পারে, সে জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।

আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মানব পাচার আইনের ২১ (২) ধারা অনুযায়ী, অপরাধসমূহ বিচারের জন্য দায়রা জজ কিংবা অতিরিক্ত দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারকের সমন্বয়ে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো জেলায় ট্রাইব্যুনাল গঠন হয়নি। যদিও মানব পাচার আইনে বলা হয়েছে, পাচার-সংক্রান্ত অপরাধগুলোর বিচার শুধু ট্রাইব্যুনালই করবে। ২ এর ১ ধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল না হওয়া পর্যন্ত সরকার প্রতিটি জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালকে মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে। তাই এখনও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেই এই মামলার বিচার কাজ চলছে। ফলে মানব পাচার-সংক্রান্ত বিচার কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।