নদীকৃত্য দিবস আজ

সরকারি প্রতিষ্ঠানের দূষণে মরছে বংশী

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আলতাব হোসেন, ঢাকা গোবিন্দ আচার্য্য, সাভার

ঢাকার আশপাশে চারটি নদী। তার একটি বংশী। সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ডিইপিজেড) পরিশোধিত তরল শিল্পবর্জ্যে মরছে এই নদীটি। দূষণের জন্য ডিইপিজেড ৮০ শতাংশ এবং অন্য ১৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ২০ শতাংশ দায়ী। আর ৮২ জন দখলদারের নাম চিহ্নিত করা হয়েছে। শিগগির শুরু হচ্ছে দখল-দূষণের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও পরিবেশ অধিদপ্তর সরেজমিন দখল ও দূষণকারী চিহ্নিত করে তৈরি করেছে প্রতিবেদনটি। এখানে ৮২ ব্যক্তি ও ১৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। নদী দখলদারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা সমিতি, সাভার বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি, আওয়ামী লীগ নেতা, শিল্পপতি ও জনপ্রতিনিধির নাম রয়েছে।

নদীর দূষণ বন্ধে কিছু সুপারিশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। প্রতিবেদনটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন তারা। শিগগির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হবে এটি। তার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- জামালপুর জেলার পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে উৎপত্তি হয়ে দক্ষিণে টাঙ্গাইল ও গাজীপুর জেলা হয়ে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বংশী নদী। শিল্পবর্জ্য ও দখল-দূষণে মৃতপ্রায় এটি। শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যের দূষণে  এর পানি কালচে রঙ ধারণ করেছে। ইজারা ছাড়াই ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে ড্রেজার দিয়ে। নদীর দু'পাশের তীর দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। দু'পাড়ে সমানতালে চলছে দখল ও ভরাট। নির্মাণ করা হচ্ছে স্থাপনা। সাভার থানাঘাট থেকে নামাবাজার, বাঁশপট্টি পৌরসভার বর্জ্য ফেলে ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বড় বড় দালান। বংশী নদীর ওপর নির্মিত সাভার-ধামরাই সেতুর দু'পাশে দখল করে রেখেছেন প্রভাবশালীরা। নয়ারহাট এলাকায়ও নদী দখলের ভয়াবহ চিত্র চোখে পড়ে। নদীর পূর্ব-পশ্চিম দু'পাশের তীর ঘেঁষে ব্যবসায়ীরা মাটি দিয়ে নদী ভরাট করে বালুর ব্যবসা করছেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সরেজমিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ডিইপিজেড) বংশী নদী দূষণের জন্য ৮০ শতাংশ আর অন্য ১৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান ২০ শতাংশ দায়ী। প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, বংশী নদীকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে ডিইপিজেডের তরল বর্জ্য পরিশোধনের জন্য স্থাপিত সিইটিপি পরিশোধিত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে নির্গমন করা যাবে না। যথাযথ তরল বর্জ্য রি-সাইক্লিং ও জিরো ডিসচার্জ প্ল্যান প্রণয়ন এবং শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্য ১৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বংশী নদীকে বাঁচাতে শিগগির উচ্ছেদ অভিযান ও দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে দূষণের জন্য জরিমানা আদায় করতে হবে।

দূষণের জন্য অভিযুক্ত ১৪ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে- বাংলাদেশ ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ, ঝুমকা টেক্সটাইল, বেলকুচি নিটিং, ডেনিটেক্স, মুসলিম ওয়াশিং, এইচআর টেক্সটাইল, আনলিমা টেক্সটাইল, জি কিউ ইন্ডাস্ট্রিজ, আবেদীন টেক্সটাইল, এফকেএন মিলস, গ্রাফিক টেক্সটাইল, ইমাকুলেট টেক্সটাইল, বেইজ পেপার মিল, পার্ল পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস। এসব শিল্প-কারখানার পরিবেশ ছাড়পত্র ও ইটিপি আছে। অভিযোগ আছে- ইটিপি থাকলেও সার্বক্ষণিক তা চালু রাখা হয় না। কারখানার দূষিত বর্জ্য বংশী নদীতে ফেলা হয়।

বংশী নদীর সঙ্গে ঢাকার আশপাশের অন্যান্য নদীর পানির প্রবাহ থাকায় দূষণ ঢাকার অন্যান্য নদীতেও ছড়িয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. খালেদ হাসান সমকালকে বলেন, 'পরিবেশ অধিদপ্তর বংশী নদীর দূষণ নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সরেজমিন প্রতিবেদনে দখল ও দূষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে এতে।'

এক সময়ের প্রমত্তা বংশী নদী দূষণ ও দখলের কারণে সরু খালে পরিণত হয়েছে। নদীটির মরণদশার কারণে নদীতীরবর্তী সেচব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। নদীতীরবর্তী যেসব মানুষ নদীকে কেন্দ্র করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করতেন, নদীটির মরণদশায় তারা এখন দীর্ঘদিনের পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন। গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও ধামরাই অংশে নদীটি বেশি দখল ও দূষণের শিকার হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সাভারের নয়ারহাট থেকে শহীদ রফিক সেতু পর্যন্ত বংশী নদীর প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় দখল এবং অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে নির্গমন করা হচ্ছে। কালো পানির উৎকট দুর্গন্ধে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্যসহ জনজীবন। সাভার থানা সংলগ্ন নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে প্রায় পাঁচ একর জায়গার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা আবাসন প্রকল্প। সাভার নামাবাজার এলাকায় দেখা গেছে, নদীর তীর দখল করে কয়েকশ' পাকা ও আধাপাকা বসতবাড়ি ও দোকানপাটের মতো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর তীর দখল করে ইট, খোয়া, বালু ফেলে ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠেছে।

সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এম শামসুল হক বলেন, 'দখলের কারণে সাভারের অন্তত ১২টি খাল বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে মরতে বসেছে বংশী নদী।'

নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি রফিকুল ইসলাম ঠান্ডু মোল্লা বলেন, 'উপজেলার পাথালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পারভেজ দেওয়ান নয়ারহাট এলাকায় বংশী নদী দখল করে দোকান বরাদ্দ দিয়েছেন।'

সম্প্রতি সাভারের স্থানীয় এনজিও ভার্ক মিলনায়তনে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), নিজেরা করি এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) যৌথ উদ্যোগে নদী রক্ষায় স্থানীয়দের নিয়ে একটি যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বলা হয়, বংশী নদী ও তুরাগ নদ অব্যাহত দখল-দূষণের ফলে সাভার এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দখল আর দূষণে বংশী এখন আর নদী নয়, একটি সরু খাল হয়ে গেছে। তুরাগের চেয়েও খারাপ অবস্থা বংশীর। প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, নদী ও জলাশয় ভরাট করা যাবে না। তারপরও ভরাট হচ্ছে।'

এ বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার সমকালকে বলেন, সম্প্রতি বংশী নদী সরেজমিন পরিদর্শন করে একটি রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে আমার নেতৃত্বে। নদীর দখল-দূষণের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান ও দখলদারদের নামের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। বংশী নদী বাঁচাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বংশী, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গাকে একসঙ্গে লিংক করে সরকারের ডেল্টা প্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করলে আগামীর ঢাকার জন্য বড় কাজ হবে তা।

বিষয় : নদীকৃত্য দিবস আজ

সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি
তারিখ সেহরি ইফতার
১৯ মে '১৯ ৩:৪৫ ৬:৩৯
২০ মে '১৯ ৩:৪৪ ৬:৪০
*ঢাকা ও আশেপাশের এলাকার জন্য প্রযোজ্য
সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ