চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার এগোচ্ছে না

দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

বিচার এগোচ্ছে না চার শতাধিক চাঞ্চল্যকর মামলার। শুনানির দিন আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হলেও সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় থমকে আছে বিচার কার্যক্রম। শুনানির তারিখ বারবার পরিবর্তন করা হচ্ছে, পেরিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর। হত্যা, মাদক, বিস্ম্ফোরক, জঙ্গিবাদ, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন আইনের এসব মামলায় কারাগারে রয়েছে প্রায় ৫০০ দুর্ধর্ষ আসামি। তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা তদন্তাধীন, কোনো মামলা আদালতে বিচারাধীন ও বিচার শেষের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলার বিচার কবে শেষ হবে সে ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরাও বলতে পারছেন না। আবার কোনো কোনো মামলায় নিম্ন আদালত রায় দিলেও উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধান বিচারপতির কার্যালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার কাছে এসব মামলার তথ্য-উপাত্ত সংবলিত চিঠি পাঠিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মৌলভীবাজারের খুনের মামলার আসামি ফারুক হোসেনকে গত ১১ বছরে ১২৫ বার আদালতে হাজির করা হয়েছে। কিন্তু সাক্ষী আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় প্রতিবারই মামলার তারিখ পরিবর্তন হয়েছে। তার বিরুদ্ধে করা মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে মৌলভীবাজারের দায়রা জজ আদালতে। ২০০৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে মৌলভীবাজার কারাগারে বন্দি রয়েছেন তিনি।

শুধু মৌলভীবাজারের খুনের মামলার আসামি ফারুকের ক্ষেত্রে নয়, এমন চার শতাধিক আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর মামলার প্রায় ৫০০ আসামির বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না। কারাগারে থাকা এসব আসামির বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা, জঙ্গিবাদ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাদক, বিস্ম্ফোরকসহ বিভিন্ন আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন এবং বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্তরাও রয়েছে। বর্তমানে তাদের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় শুনানির দিন তাদেরকে আদালতে হাজির করছে কারা কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেই তাদের আদালতে আনা-নেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে পুলিশকে। তবে সাক্ষীরা উপস্থিত না হওয়ায় এগোচ্ছে না মামলার কার্যক্রম। এ অবস্থায় এসব দুর্ধর্ষ আসামি বছরের পর বছর কারাগারে থাকায় নিরাপত্তা শঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি বন্দির সংখ্যা কারাগারের ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত হওয়ায় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। আবার এসব অপরাধী কারাগারে থেকেই অন্যান্য অপরাধ করার পরিকল্পনা করতে পারে বলেও ধারণা সংশ্নিষ্টদের।

এ পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে চাঞ্চল্যকর ও আলোচিত মামলার শুনানির কার্যক্রম দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয় সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব স্মৃতি রাণী ঘরামির নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর সব মামলার বিবরণ, কোন আদালতে বিচারাধীন, মামলার ধারা, মামলার তারিখ, আসামি ও সাক্ষীর নামসহ বিস্তারিত তথ্য জানাতে বলা হয়। যৌক্তিক কারণ উল্লেখসহ ৫৭ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি) কার্যালয়কে প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য বলা হয়।

সারাদেশে কেন্দ্রীয় ও জেলা মিলিয়ে মোট ৬৮টি কারাগারে বন্দি ধারণ ক্ষমতা ৪০ হাজার ৬৬৪ জন। বর্তমানে সর্বমোট বন্দি রয়েছে ৮৯ হাজার ১৪০ জন। এর মধ্যে ৮৫ হাজার ৭০৪ জন পুরুষ এবং ৩ হাজার ৪৩৬ জন নারী। তাদের মধ্যে কয়েদি রয়েছে ১৪ হাজার ৫৬২ জন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০০৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিস্ম্ফোরক দ্রব্যসহ ইয়ামিন মিয়াকে টাঙ্গাইল থেকে আটক করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার মাদারগঞ্জের মোসলেম উদ্দীনের ছেলে ইয়ামিন জামা'আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) অন্যতম সদস্য ও দুর্ধর্ষ জঙ্গি। একই ঘটনায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার চাংড়াছড়ির মোজাহার আলীর ছেলে শহিদুল ইসলাম আটক হয়। দু'জনের বিরুদ্ধে বিস্ম্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়েছে। টাঙ্গাইল বিশেষ ট্রাইব্যুনাল জজ-২ আদালতে তাদের বিচার কার্যক্রম চলছে। দীর্ঘ ৯ বছরে বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালে তাদের ৯০ বার হাজির করা হয়েছে। তবে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় এগোচ্ছে না বিচার কার্যক্রম।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত মামলায় কারান্তরীণ আসামিদের বিচার চলছে বিভিন্ন জেলায় দায়রা জজ আদালতে। নির্ধারিত দিনে সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের বিচার শেষ হচ্ছে না। এর মধ্যে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের বাসিন্দা রাজু আহমেদ খুনের অভিযোগে কারান্তরীণ রয়েছে। ২০০৩ সালের ৩ মার্চ থেকে হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে রয়েছে সে। বিচারের জন্য আসামিকে ১০৮ বার কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। বাগেরহাটের কাকা মোল্লা ২০০৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারে। তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা রয়েছে। তাকে এ পর্যন্ত ৯০ বার আদালতে হাজির করা হলেও সাক্ষী হাজির হয়নি। এরই মধ্যে ১০ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। নাটোরে খুনের মামলায় আব্দুল খালেক ২০০৫ সাল থেকে কারাগারে রয়েছে। ১১ বছরে তাকে ৭০ বার আদালতে হাজির করা হয়। একই কারাগারে মাদক মামলায় বন্দি নওশাদ মণ্ডল। তাকে ৮০ বার আদালতে হাজির হতে হয়েছে।

বরগুনায় খুনের মামলায় ২০০৯ সালের ৬ মে থেকে আব্দুল জলিল এবং একই বছর থেকে ওই জেলার জাহাঙ্গীর আলম নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় জেলা কারাগারে বন্দি। তাদের বিচার কার্যক্রম চলছে বরগুনার দায়রা জজ আদালতে। এরই মধ্যে তাদের আদালতে ৯৪ বার হাজির করা হলেও সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে বিচার কার্যক্রম থমকে আছে।

২০০৯ সালের ১০ অক্টোবর থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় চাঁদপুরের কারাগারে বন্দি হাজতি জহিরুল ইসলাম। তার মামলা চলছে জেলা দায়রা জজ আদালতে। এ মামলায় চাঁদপুরের বাসিন্দা জহিরুলকে ৭০ বার আদালতে হাজির করা হলেও সাক্ষীর অনুপস্থিতির কারণে মামলার শুনানি হয়নি। একই জেলার আব্দুল মান্নান ২০১০ সাল থেকে খুনের মামলায় কারাগারে রয়েছে। গত ছয় বছরে ৭০ বার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। বান্দরবান পার্বত্য জেলার বাসিন্দা রেজাউল করিম ও উবাসিং মারমা ২০১০ সাল থেকে চাঁদাবাজি ও খুনের মামলায় চাঁদপুর জেলা কারাগারে রয়েছে। তাদের ১০৮ বার দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সমকালকে বলেন, নির্ধারিত তারিখে সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় দেশের বিভিন্ন আদালতে থাকা স্পর্শকাতর মামলাগুলো নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এর কারণ খুঁজে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একজন অতিরিক্ত সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিচারপ্রার্থীরা যাতে দ্রুত বিচার পান সে জন্য সরকার সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। মামলা সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত সংবলিত সব কাগজপত্র আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক সমকালকে জানান, গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইন মন্ত্রণালয় কাজ করছে। বিভিন্ন কারণে মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হতে পারে। তবে সুনির্দিষ্ট কোন কোন মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে সেগুলো তাদের অবহিত করা হলে মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, কোনো ফৌজদারি মামলার সাক্ষী আদালতে হাজির না হলে মামলা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকতে পারে না। আদালতে সাক্ষীকে হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) যদি আসামিকে আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আদালত সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। সে ক্ষেত্রে মামলা ঝুলে থাকতে পারে না বা আদালত মামলা মুলতবি করতে পারেন না। এটা করা খুবই দুঃখজনক।

এ বিষয়ে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ মোশাররফ হোসেন কাজল সমকালকে বলেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মাধ্যমে ফৌজদারি মামলায় আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে, যা সিভিল মামলার ক্ষেত্রে রয়েছে। তিনি বলেন, যে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়েরের সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে, সামাজিকভাবে স্থানীয়দের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। তাহলে মামলাজট কমে যাবে। তিনি বলেন, ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইনের ব্যবস্থা থাকলে এসব চাঞ্চল্যকর মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা যেত। সরকারকে এ আইন প্রণয়ন করতে হবে।