ইউরোপকে প্রাধান্য দিয়ে কূটনৈতিক পরিকল্পনা

 বাংলাদেশে লাভজনক বিনিয়োগে যৌথ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই অর্থনৈতিক কূটনীতির মূল লক্ষ্য -পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাশেদ মেহেদী

ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন কূটনৈতিক কর্মপরিকল্পনা করেছে সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের কূটনীতিতে প্রাধান্য পেয়েছে 'লুক ইস্ট পলিসি'। এর মাধ্যমে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধিই ছিল মূল লক্ষ্য। তবে এ বছর প্রাধান্য পাচ্ছে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক। বিশেষ করে অর্থনৈতিক কূটনীতির বিষয়টি মাথায় রেখেই ইউরোপের বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির বিষয়টিতে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে নতুন কূটনৈতিক কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কূটনীতিতে অগ্রাধিকারকে আরও সময়োপযোগী করার কাজে হাত দেন। এর ফলেই অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং ইউরোপকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি গ্রহণ করা হয়।

যে কারণে ইউরোপকে প্রাধান্য :কয়েক বছর ধরে 'লুক ইস্ট পলিসি' থেকে বাংলাদেশের কূটনীতিতে উল্লেখযোগ্য অর্জন আসেনি। রোহিঙ্গা সংকটের পর তা নতুন করে মূল্যায়নের পরিস্থিতিও তৈরি হয়। কারণ এত বড় সংকটে বাংলাদেশের পাশে যেভাবে ইউরোপ থেকেছে, সেভাবে পূর্বের দেশগুলো থাকেনি। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প পণ্যের বড় বাজার ইউরোপই। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে জি প্লাস সুবিধা অর্জনের বিষয়টিও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে বিশেষভাবে বিবেচিত হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাউন্সিলের সদস্য। এ অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগ রয়েছে। এর বাইরে ইউরোপের অর্থনৈতিক প্রভাবশালী দেশগুলোর বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগের বিষয়টিও কর্মপরিকল্পনায় প্রাধান্য পেয়েছে। এর আগে কূটনৈতিক রূপরেখা-সংক্রান্ত বৈঠকগুলোর পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগের ভালো ক্ষেত্র আছে এবং ইউরোপের বিনিয়োগে কঠিন শর্তের বেড়াজালও কম। তবে ইউরোপকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি 'লুক ইস্ট পলিসি'ও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ককেও কর্মপরিকল্পনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক কূটনীতিই কেন্দ্রবিন্দু :কর্মপরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে অর্থনৈতিক কূটনীতি। পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত কয়েক বছরে জিডিপিতে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসার পরিমাণ কমে গেছে। এ প্রেক্ষাপটেই অর্থনৈতিক কূটনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

এর আগে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় অর্থনৈতিক কূটনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি সমকালকে বলেন, গত দশ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী অনেকগুলো অর্থনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেছেন। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া, ২০৩০ সালে মধ্যে জাতিসংঘের স্থিতিশীল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা। তিনি আরও বলেন, হিসাব করে দেখা গেছে, শুধু স্থিতিশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্যই আগামী ১৩ বছরে প্রয়োজন হবে প্রায় ছয় হাজার ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় চার কোটি ৯৮ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এত টাকা আমরা কোথায় পাব? আমাদের সরকারের কাছে তো এত টাকা নেই। এ কারণে দরকার প্রচুর বিনিয়োগের। এ বিনিয়োগের জন্যই দরকার ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক কূটনীতি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, অর্থনৈতিক চাহিদা বিবেচনায় রেখে সরকার নানাভাবে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের এ চেষ্টায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিশেষভাবে সম্পৃক্ত থাকবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে বেশি বিনিয়োগ এবং সঠিক প্রযুক্তি নিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা হবে। যারা বিনিয়োগ করবে তাদের সঙ্গে বিষয়টা হবে 'উইন উইন' ভিত্তিতে। এ বিনিয়োগে শুধু বাংলাদেশেরই লাভ হবে না, যারা বিনিয়োগ করবে তাদেরও লাভের বিষয় থাকবে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতি অত্যন্ত গতিশীল। এখানে বিনিয়োগ করলে যা কিছু উৎপাদিত হবে তার একটা স্থিতিশীল বাজারও নিশ্চিত হয়েই আছে। অতএব বাংলাদেশে লাভজনক বিনিয়োগে যৌথ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই হচ্ছে অর্থনৈতিক কূটনীতির মূল লক্ষ্য।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশে লাভজনক বিনিয়োগ পরিস্থিতি বিদেশে সঠিকভাবে তুলে ধরতে না পারা, অর্থনৈতিক নীতির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা দিতে না পারার কারণেই বাংলাদেশে সমমানের দেশগুলোর চেয়ে গত কয়েক বছরে বিদেশি বিনিয়োগ কম এসেছে। এ কারণে এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অর্থনৈতিক কূটনীতিতে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক। অন্য দেশ আরও আগে থেকেই পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এখন বাংলাদেশকেও সে পথে যেতে হবে আরও দক্ষ নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে, এর বিকল্প নেই।

বিষয় : ইউরোপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনীতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক পরিকল্পনা