বিশেষ মন্তব্য

অন্যতম কারণ বিচারহীনতা

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

এলিনা খান

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দেশে যুগোপযোগী বেশ কয়েকটি আইন আছে। আছে বহুমুখী তৎপরতাও। তারপরও দেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বর্বর, লোমহর্ষক নির্যাতনের ধরন, মাত্রা ও ভয়াবহতা ক্রমান্বয়ে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সেই সঙ্গে অপরাধীকে রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন দেওয়াও সহিংসতা বৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য কারণ। এ অবস্থায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আইনের প্রয়োগ জরুরি। একই সঙ্গে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে বেশ কয়েকটি মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। সম্প্রতি ফেনীর  সোনাগাজী উপজেলার মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে অধ্যক্ষ শ্নীলতাহানি করায় মামলা করলে সে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। মামলা তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানালে বোরকা পরে ৪-৫ জন দুর্বৃত্ত কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় তার গায়ে। টানা চারদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যু হয় তার। এ মর্মান্তিক ঘটনার সংবাদ যেন আর আমাদের পড়তে না হয়, লিখতে না হয়। নুসরাত মৃত্যুর আগে বারবার বিচার চেয়েছে। একই সঙ্গে সে নারী নির্যাতন বন্ধের কথাও বলেছে। তার বারবার বলা 'বিচার'-এর শব্দার্থ হচ্ছে, তার ওপর নির্যাতনকারীর বিচার ও এর আগে যেসব নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে; সব অপরাধীর বিচারকার্য সম্পাদন। আমরা পিছিয়ে পড়া নারীদের সামনে এগোনোর পথ দেখাতে পারি। কিন্তু আর যেন নুসরাতের মতো কেউ এমন বর্বর ঘটনার শিকার না হয়; আর যেন আমাদের লিখতে না হয়। বাংলাদেশ যেন নারীবেষ্টন পরিবেশ পায়।

সুবর্ণচরের চরজব্বার থানায় গত ৩১ মার্চ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পর বাড়ি ফেরার পথে স্বামীকে আটকে রেখে গণধর্ষণ করা হয় এক নারীকে। খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে ষষ্ঠ শ্রেণির মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ, ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ রেলস্টেশনে কিশোরীকে গণধর্ষণ, নেত্রকোনার দুর্গাপুরে কিশোরীকে ধর্ষণ, গাইবান্ধার ফুলছড়িতে ৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণ, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে ৭ বছরের ছেলেকে যৌন নির্যাতন এবং ঢাকা মহানগরীর শাহবাগ এলাকায় ধর্ষণের শিকার কিশোরীকে পুনরায় পুলিশ কনস্টেবল কর্তৃক যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায় ধর্ষণের ঘটনাসহ সারাদেশে ভয়াবহ হারে নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে, নুসরাতের ঘটনার পরপরই গত বুধবার নরসিংদীতে বাসে তিনটি মেয়ের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এর আগে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা, কুমিল্লার তনু হত্যার বিচার কার্যক্রম এখনও শেষ হয়নি। নির্যাতনকারীদের শাস্তি না হওয়ার কারণে দিন দিন অপরাধ বেড়েই চলেছে।

নারী নির্যাতন-সংক্রান্ত কোনো মামলা হলে তা বছরের পর বছর পড়ে থাকে। যেখানে ১০০ দিনের মধ্যে বিচার হওয়ার কথা, সেখানে দেখা যায় পাঁচ থেকে ১০ বছর লেগে যাচ্ছে। মামলা হলেও বিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে সহিংসতার ঘটনা ঘটার সুযোগ পাচ্ছে অপরাধীরা। বিচার দ্রুত হলে এবং মামলার রায় দ্রুত কার্যকর হলে ঠিকই নারী নির্যাতনের হার শূন্যের কোঠায় নেমে আসত। নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে, কোথাও কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসে না বা পুলিশকে খবর দেয় না। যারা নারী নির্যাতনের ঘটনা জেনেও চুপ করে থাকে, তাদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য প্রচলিত আইনগুলোর পরিবর্তন করতে হবে।

এদিকে, ভিকটিম যেখানে বলে দিচ্ছে- অপরাধী কে; সেখানে সাক্ষ্য গ্রহণের নিয়ম দেখিয়ে বিচারকার্য দীর্ঘ করা হচ্ছে। ফলে আইনের ওপর আস্থা হারাচ্ছে মানুষ। অপরাধীরাও বুঝে গেছে- অপরাধ যত বড়ই হোক, অপরাধ করলেও পার পাওয়া যায়। যতদিন অন্যায় হবে, ততদিন আমরা সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করব। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা। এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা ঠিক করা। যেহেতু রাষ্ট্র দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে, তাই সরকারকে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে পবিত্র ধর্মের নামে যারা অপরাধ ঘটাচ্ছে, তাদের বিষয়েও সরকারকে সজাগ হতে হবে। তাদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে মনিটর করতে হবে। আইন মন্ত্রণালয় দেখবে বিচার কার্যক্রম দ্রুত শেষ হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে মামলার অগ্রগতি, দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার ভূমিকাসহ অন্য ক্ষেত্রগুলো। তবেই নারীর ওপর সহিংসতা শূন্যের কোঠায় নামানো সম্ভব হবে।

* এলিনা খান :নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস

বিষয় : বিশেষ মন্তব্য