দুর্বৃত্তদের শাস্তি চাই

এই নৃশংসতার শেষ কোথায়

তিন মাসে আড়াই হাজার নারী নির্যাতন মামলা

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

নাহিদ তন্ময় ও সাজিদা ইসলাম পারুল

যৌন হয়রানির প্রতিবাদে আইনের আশ্রয় নিয়েছিল ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মাদ্রাসাশিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির পরিবার। অভিযুক্ত আসামি নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। অভিযোগ দায়েরের পর থেকেই নানান হুমকির মুখে পড়তে হয় নুসরাতকে। জীবনের হুমকি নিয়েই বড় ভাইয়ের হাত ধরে নিয়মিত পরীক্ষার হলে পৌঁছতেন তিনি। তাতেও শেষ রক্ষা হলো না তার। ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে পরীক্ষা কেন্দ্র সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে হাত বেঁধে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় তার শরীরে। ওইদিনই তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। টানা চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হার মানেন নুসরাত। নেত্রকোনার দুর্গাপুর। ৬ এপ্রিল দুপুরের দিকে ওই গ্রামের একটি বাড়িতে  অতিথি হিসেবে প্রবেশ করেন আত্মীয় সাইফুল ইসলাম। বাড়িতে তখন আনুমানিক ১৫ বছর বয়সী মেয়ে ছাড়া কেউই ছিল না। সেই সুযোগে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায় সাইফুল।

রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় পূর্বপরিচিত জয় ঘোষের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় এক কিশোরী। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে গুলিস্তান এলাকায় নামিয়ে দেওয়া হয় তাকে। কিশোরী ওই এলাকায় কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য বাদল হোসেনের কাছে ঘটনাটি জানিয়ে সহযোগিতা চায়। সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বাদল হোসেন ওই কিশোরীকে নিয়ে যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিয়ে নিজেই রক্ষক থেকে ধর্ষকের রূপ ধারণ করে।

এভাবেই ঘরে-বাইরে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয় নারী। দিনে দিনে এ নির্যাতন ভয়াবহ থেকে ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। নির্যাতনকারীর ভূমিকায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পুরুষকেই দেখা যায়। তবে অনেক বর্বর ও নৃশংস অপরাধের ঘটনা ঘটাচ্ছে নারীরাও। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিচারহীনতার প্রভাবে এখন নারীর প্রতি সহিংসতা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রেমের প্রস্তাবে বা বিয়েতে রাজি না হলে ধর্ষণ করা হচ্ছে নারীকে। ধর্ষকদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না ছোট শিশুরাও। মোবাইল ফোনে ধর্ষণের ছবি তোলা বা ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে। অনেক সময় ধর্ষণের পর করা হচ্ছে হত্যাও। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্মম নির্যাতনের শিকার নারীরা অধিকাংশ সময়ই মুখ বুঝে সহ্য করেন সব ধরনের যন্ত্রণা। হাতে গোনা কিছু ঘটনা থানা পুলিশ হয়ে সংবাদ মাধ্যমে পৌঁছায়। বর্তমান সমাজে সবচেয়ে হতাশা ও ক্ষোভের বিষয়- নারীর প্রতি যে অব্যাহত সহিংসতা অধিকাংশ সময়েই তা রুখতে না পারা। বর্তমান সামাজিক অবক্ষয় ও নারীর নিরাপত্তাহীনতার কারণে নারী স্বাধীনতা, নারীমুক্তি আজ কথামালার ফুলঝুরিতে পরিণত হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, 'বর্তমান সময়ে উদ্বেগজনকহারে নারী নির্যাতন বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীদের সামনে এমন একটি দৃশ্য দাঁড় করাতে হবে যে, অপরাধ করলে পার পাওয়া যায় না।' তিনি বলেন, 'নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে অনেক আইন রয়েছে। তারপরেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তার কারণ হলো সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে। মানুষের মধ্যে বাড়ছে অস্থিরতাও। এটা আইন দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এর জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন জরুরি।'

বাংলাদেশ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সারাদেশে অন্তত আড়াই হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে। ২০১৮ সালে একই ধরনের অপরাধের ঘটনায় দায়ের মামলার সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ২৫৩টি। এদিকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আন্দোলনকারী সংগঠন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলছে, দেশের প্রধান সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সহস্রাধিক নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সালে প্রকাশ পায় ৩ হাজার ৯১৮টি নির্যাতনের ঘটনা। এ দুটি চিত্র থেকে স্পষ্টই দৃশ্যমান যে, নারীর প্রতি যে সহিংসতা চলে তার অধিকাংশই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। একই সঙ্গে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় নিপীড়করা।

মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, 'শুধু নারী নির্যাতনের সংখ্যা বাড়ছে না, সেই সঙ্গে বাড়ছে পাশবিকতা, নির্যাতনের ভয়াবহতা এবং মনুষত্বহীনতাও। ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার অপরাধ হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারীর বিরুদ্ধে সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ধারাবাহিকভাবে, ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করতে হবে সকলকে। একই সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিকভাবেও।' তিনি বলেন, নারী নির্যাতন বন্ধে অনেক ভালো আইন থাকলেও সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নেই। এমনকি প্রচারের অভাবেও অনেকে এসব আইন সম্পর্কে জানে না। আবার আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইডের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে পারিবারিক সহিংসতার শিকার ৬৬ শতাংশ নারী, অর্থাৎ প্রতি তিন নারীর মধ্যে একজন এ সহিংসতার শিকার। এ নিয়ে যতগুলো মামলা হয়, তার প্রতি পাঁচটির মধ্যে চারটিই আদালতে উঠতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। পাশাপাশি ঘরে-বাইরে সহিংসতার শিকার নারীদের মাত্র ৩ শতাংশ বিচার পায়। চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে প্রকাশিত 'বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার ওপর দৃষ্টিপাত :প্রবণতা এবং সমাধান' শীর্ষক ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়, নির্যাতিতদের মধ্যে ৩ দশমিক ১ শতাংশ নারী নিজেদের পক্ষে বিচার পায়। বাকি ৯৬ দশমিক ৯ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না বা গেলেও তা বাতিল হয়ে যায়। তবে নির্যাতিত নারীর অধিকাংশই তাদের অভিযোগ বিচারকের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না।

দেশের ২০ জেলায় সংঘটিত সহিংসতার তথ্য, পুলিশের কাছে নথিভুক্ত হওয়া অভিযোগ, বিচার বিভাগীয় কার্যক্রম, জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ফোরামের তথ্য বিশ্নেষণ করে এ গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং ঘরে-বাইরে এর ব্যাপকতা নির্মূলে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়।

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, 'নারীরা বিভিন্নভাবে সহিংস বৈষম্যের শিকার। নারীর প্রতি সহিংসতায় ধর্ম এবং রাজনীতিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন একটি সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন।'

সমাজবিজ্ঞানী ও ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভারনারেবল স্টাডিজের পরিচালক ড. মাহবুবা নাসরীন বলেন, 'অনেক কারণ এক হয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে সামাজিক অস্থিরতা এ নির্যাতন আরও বাড়িয়ে তুলছে। নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করে এবং চলমান আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এ অবস্থার পরিবর্তন করা যেতে পারে।'

বিষয় : দুর্বৃত্তদের শাস্তি চাই