পহেলা বৈশাখে অন্যরকম প্রতিবাদ

নুসরাত হত্যার বিচার দাবি

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

শিক্ষকের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। ভয় পাননি। লজ্জায় লুকিয়ে পড়েননি। নিজেই থানায় গেছেন। অভিযোগ দিয়েছেন। প্রতিবাদ করেছেন। তার এ সাহসী ভূমিকায় ভয় পেয়ে তার শরীরে আগুন দিয়েছে শিক্ষকের সহযোগীরা। তবুও সাহস হারাননি। মৃত্যুশয্যা থেকেও অপরাধীদের বিচার চেয়েছেন ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। তিনি বাঁচতে পারেননি। তার অকাল মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন পুরো দেশ। নুসরাতের মৃত্যুতে দুঃখ পেলেও তার সাহসিকতা প্রতিবাদী হতে উদ্বুদ্ধ করেছে অনেককে। নুসরাত হত্যা ও নারী ধর্ষণের প্রতিবাদে এবারের পহেলা বৈশাখে অন্যরকম প্রতিবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বৈশাখের প্রথম দিন তারা কালো পোশাক ধারণ করে এ অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাবেন। তারা বলছেন, তাদের এই নীরব প্রতিবাদ বিচারহীনতার বিরুদ্ধে।

প্রতিবাদের এই ভাবনার শুরু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে। নুসরাতের মৃত্যুর পর তার হত্যার বিচার চেয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত ব্যক্ত করেন। কেউ কেউ লিখেন এবারে পহেলা বৈশাখে রঙিন পোশাকের বদলে কালো পোশাক পরে প্রতিবাদ জানানো যেতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইমতিয়াজ মাহমুদ বৃহস্পতিবার তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লেখেন-'দুই দিন পর যখন আপনারা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে যাবেন, তখনও নুসরাতের শরীর পোড়া গন্ধ ভেসে

বেড়াবে রমনার বাতাসে। আপনি পারবেন রঙিন পাঞ্জাবি, রঙিন শাড়ি, রঙিন জামা পরে খিলখিল করে হাসতে? এই বৈশাখে আমি প্রথাগত রঙিন পোশাক বর্জন করছি। কালো পোশাক পরতে পারি অথবা পুরো সফেদ। ...একটা সমন্বিত জাগরণ দরকার। মানুষের তীব্র ঘৃণাই পারে একটা কার্যকর পরিস্থিতি তৈরি করতে। ... কুমিল্লার ফুটফুটে তরুণী তনু, পাহাড়ের ছোট শিশু কৃত্তিকা ... নুসরাত জাহান রাফি। আর খবরের শিরোনাম হয়নি এরকম আছে কতজন! আর কত! চলেন প্রতিবাদটা সর্বাত্মক করি। এবারের পহেলা বৈশাখ হোক বিবর্ণ। পোশাক হোক কালো।'

ইমতিয়াজ মাহমুদের এমন ভাবনার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেন অনেকেই। অনেক সাংস্কৃতিক কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সমাজসেবক, মিডিয়া ব্যক্তিত্বও এ ধারণায় সহমত জানান। এভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে একটি প্রতিবাদী পদযাত্রা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে সাংস্কৃতিক কর্মী সেলিনা শেলী বলেন, ছোট্ট মেয়েটি অসম সাহসী। বিচারহীনতার কারণে ভয়ে অনেকেই প্রতিবাদ করেন না। নুসরাতের অদম্য সাহস সবার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। ক্রোধে জ্বলে ওঠা বলতে যা বোঝায় তেমনটি হচ্ছে। যে যার জায়গা থেকে প্রতিবাদ করেছে। সমমনারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রোববার পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার সামনে থেকে শহীদ মিনার পর্যন্ত একটি নীরব পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। লোকজনকে কালো পোশাক পরে এই প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তারা চাচ্ছেন আগামী প্রজন্মের জন্য ধর্ষণমুক্ত একটি সুস্থ পরিবেশ রেখে যেতে। এজন্য শিশুরা রঙিন পোশাকেই কর্মসূচিতে অংশ নেবে। তিনি বলেন, পদযাত্রায় প্রতিবাদী পোস্টার হিসেবে তাদের এক বন্ধু একটি টি-শার্ট নকশা করেছেন। কালো টি-শার্টের সামনের অংশে থাকবে নুসরাতের মুখচ্ছবি। পাশে লাল রঙে নুসরাত জাহান রাফির নাম এবং ওপরে বড় অক্ষরে 'কন্যা সাহসিকা' লেখা থাকবে। কারণ, নুসরাত অদম্য সাহসের প্রতীক। তিনি বলেন, কেউ কেউ কালো রুমাল হাতে বেঁধে পদযাত্রায় অংশ নিতে চেয়েছেন। যে যেভাবে অংশ নিতে চান তারা স্বাগত জানাবেন।

গত ২৭ মার্চ ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজ-উদ-দৌলা নুসরাতকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন হয়রানি করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের মা বাদী হয়ে মামলা করেন। পরে ৬ এপ্রিল ওই মাদ্রাসার পরীক্ষা কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গেলে অধ্যক্ষের অনুসারী কয়েক দুর্বৃত্ত হত্যার উদ্দেশ্যে নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান নুসরাত।

বিষয় : নুসরাত হত্যার বিচার দাবি