জাহালমের কারাভোগ (৪)

মিথ্যাচার করছে কে

প্রকাশ: ১৫ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

হকিকত জাহান হকি

নিরীহ জাহালমকে ফাঁসানোর ক্ষেত্রে তার বাড়ির পাশের দুই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান চরম মিথ্যাচার করেছেন। এ দাবি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে দুই চেয়ারম্যান বলছেন, জাহালমকে ফাঁসানোর জন্য তারা কোনো মিথ্যাচার করেননি। এ সম্পর্কে দুদক যা বলছে, তা সত্য নয়। দুদক এখন ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য অসত্য কথা বলছে।

দুদকের দেওয়া তথ্যমতে, জাহালমের বাড়ির পাশের ওই সময়ের দুই চেয়ারম্যান আবু সালেকের ছবি দেখে জাহালমের ছবি হিসেবে শনাক্ত করেছেন। তবে এ প্রসঙ্গে দুই চেয়ারম্যান সমকালকে বলেন, তারা সালেকের ছবি দেখে বলেছেন- ওই ব্যক্তি তাদের পরিচিত নন। আর ঘোড়াশালের জুট মিল থেকে আনা জাহালমের ছবিকে তারা জাহালমই বলেছেন। দুদক অহেতুক তাদের প্রতি মিথ্যাচার করছে। ফলে এই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে যে, মিথ্যাচার কে করছে।

দুদক সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের শেষ দিকে টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ধুবুড়িয়া ইউনিয়নের সে সময়ের চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান খান শাকিল স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দুদক কার্যালয়ে হাজির হয়ে আবু সালেকের ছবি দেখে 'জাহালম' বলে শনাক্ত করেছিলেন। একই সময়ে সলিমাবাদের ওই সময়ের ইউপি চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম মন্টু দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে সালেকের ছবিকে 'জাহালম' হিসেবে শনাক্ত করেন। তারা দু'জনেই তাদের ইউনিয়ন পরিষদের প্যাডে একাধিকবার শনাক্তকরণ প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে। জাহালম ধুবুড়িয়া ইউনিয়নের ধুবুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা।

জালিয়াতি করে সোনালী ব্যাংকের মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট শাখা থেকে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে আবু সালেকের বিরুদ্ধে। দুদক এ-সংক্রান্ত ৩৩টি মামলার চার্জশিট আদালতে পেশ করেছে। সংশ্নিষ্ট ব্যাংকার, গ্রাহক ও জাহালমের গ্রামের বাড়ির এলাকার দু'জন ইউপি  চেয়ারম্যানের সাক্ষ্য অনুযায়ী ২৬টি মামলায় সালেকের পরিবর্তে জাহালমকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছিল কমিশন। এই ২৬ মামলায় তিন বছর বিনা অপরাধে কারাভোগ করেছেন জাহালম।

হাইকোর্টের আদেশে গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুরের কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে জাহালম মুক্তি পেয়েছেন।

সাবেক চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান খান শাকিলের বক্তব্য এ প্রসঙ্গে জনপ্রতিনিধি শাকিল বলেন, দুদক প্রথমে ছবি দেখিয়েছে সালেকের। তখন বলেছি- এই লোককে তো চিনি না, আমাদের এলাকার না। দ্বিতীয়বার সালেক ও তার বোনের ছবি দেখানো হলে তখনও বলেছি, এই লোককে চিনি না বা জানি না। এভাবে তিনবার জিজ্ঞাসা করার পর চতুর্থবার আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন সালেকের ছবি ও ঘোড়াশাল জুট মিল থেকে আনা জাহালমের ছবি দেখানো হয়। সে সময় আবারও সালেকের ছবি দেখানো হলে একইভাবে বলেছিলাম, এই লোককে চিনি না। এরপর জুট মিলের প্রত্যয়নপত্রসহ জাহালমের ছোট একটি ছবি দেখানো হলে তখন বলি, এই ছেলে আমাদের এলাকার। এর নাম জাহালম। আরও বলেছিলাম, এই ছেলে লেখাপড়া জানে না। জুট মিলে চাকরি করে। অনেক দিন ধরে সে বাড়িতে থাকে না। মিলে থাকে। এলাকায় তার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নাই। বাড়িঘর নাই- এগুলো দুদককে লিখে দিয়েছি।

'দুদক থেকে বলা হচ্ছে, আপনি প্রতারক সালেকের ছবি দেখেই বলেছিলেন এইটা জাহালম'- এর জবাবে তিনি বলেন, না, না, না। এটা ঠিক কথা না। ২০১৪ সালের অক্টোবরে দুদক থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল ওইসব তথ্য। ধুবুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দুইবার ও দুদকের ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয়ে দুইবার গিয়ে এ ব্যাপারে লিখিত দিয়েছি। একবার ব্যাংকের লোকও সালেকের ছবি নিয়ে এসেছিলেন। আমি বলেছি, চিনি না।

'দুদক শক্তভাবেই বলছে, দুই চেয়ারম্যান সালেকের ছবি দেখে জাহালম বলেছিলেন' - এ কথা জানালে সাবেক চেয়ারম্যান শাকিল বলেন, 'না না না, ওরা মিথ্যা বলছে।'

'আপনি জনপ্রতিনিধি হয়ে ছবি দেখে বলেছেন এইটা সালেক, এইটা জাহালম- তারপরও জাহালমকে জেলে পাঠানো হলো কেন?' - এ প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'কেন জেলে নিয়েছে, এটা দুদক বলতে পারবে। পরে গণমাধ্যম এবং টেলিভিশনেও সাক্ষাৎকার দিয়েছি জাহালমের পক্ষে।'

'জাহালমকে যখন কারাগারে নেওয়া হলো, তখন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আপনি জাহালমের পক্ষে পদক্ষেপ নেননি কেন?' - এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, 'এটা করা উচিত ছিল। কিন্তু তখন এটা করা হয়নি।' তিনি জানান, জাহালমকে গ্রেফতার করা হয়েছে জুট মিল থেকে, তাদের এলাকা থেকে নয়।

'জাহালম সম্পর্কে আপনি দুদকের কাছে নেতিবাচক কথা বলেছেন। বলেছেন, এই ছেলে ভালো না। এই ছেলে খারাপ' - এ কথা জানালে এই জনপ্রতিনিধি বলেন, 'এ রকম কিছু বলা হয়নি, এগুলো বাড়তি কথা। দুদক মিথ্যা বলছে। দুদক এখন বাঁচার জন্য এগুলো বলবেই।'

সাবেক চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম মন্টুর বক্তব্য

সলিমাবাদের সে সময়ের ইউপি চেয়ারম্যান মন্টু জানান, দুদক তাকে চিঠি দিয়েছে, ছবি দিয়েছে- তিনি সেগুলো ভেরিফিকেশন করে দুদকের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছেন। তারা যা চেয়েছে তাই দেওয়া হয়েছে। জাহালম আর্থিকভাবে দুর্বল, এইটা-সেইটা- এগুলোও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মন্টু বলেন, 'আমার কাছে সেই প্রতিবেদনের কপিও আছে। দুদক আমাদের দুইটা ছবি দিয়েছে। ছবিগুলোও আমাদের কাছে আছে। এর মধ্যে একটা ছবির সঙ্গে জাহালমের চেহারার মিল আছে, আরেকটা ছবির সঙ্গে মিল নেই।'

'আপনি কি সালেকের ছবিকে জাহালম বলেছিলেন?'- এ প্রশ্নের জবাবে জনপ্রতিনিধি মন্টু বলেন, 'না, তা বলিনি। দুদক আমাদের যতবার ডেকেছে, প্রতিবেদনের বাইরে কখনও কোনো কথা বলিনি।'

তিনি বলেন, 'দুদক থেকে চিঠি ও ছবি পাওয়ার পর ওই ছবি জাহালমের আত্মীয়স্বজনের কাছে নিয়ে নিশ্চিত হয়েছি। জাহালমের আত্মীয়রা সালেকের ছবি চেনে নাই। দুদক ঘোড়াশালের জুট মিল থেকে জাহালমের যে ছবিটা এনেছিল, সেই ছবি দেখে চিনেছিলেন জাহালমের আত্মীয়রা।'

'আপনি নাকি সালেকের ছবি দেখে জাহালম বলেছিলেন?' -এই প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, 'না, না। আমি এই কথা বলি নাই।'


বিষয় : জাহালমের কারাভোগ (৪)

সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি
তারিখ সেহরি ইফতার
২৫ মে '১৯ ৩:৪২ ৬:৪২
২৬ মে '১৯ ৩:৪১ ৬:৪৩
*ঢাকা ও আশেপাশের এলাকার জন্য প্রযোজ্য
সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ