লঘুদণ্ডে বেপরোয়া অসাধু ব্যবসায়ীরা

খাদ্যে ভেজাল

প্রকাশ: ১৬ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

নাহিদ তন্ময়

খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে বাণিজ্য, খাদ্য, শিল্প, মৎস্য, স্বরাষ্ট্রসহ ১১টি মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তৎপরতা চালাচ্ছে সিটি করপোরেশনসহ একাধিক সংস্থা। কিন্তু নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভাবে এসব সংস্থার নানামুখী উদ্যোগের পরও খাদ্যে ভেজাল রোধ করা যাচ্ছে না। এছাড়া আইন প্রয়োগে শৈথিল্যের কারণেও অসাধু ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দেশব্যাপী ৪ হাজার ৫০৯টি ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এ সময় মামলা হয়েছে ৭ হাজার ৬৫০টি। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে ৭ হাজার ৫৬২ জনকে এবং জরিমানা করা হয়েছে ৫ কোটি ৪৩ লাখ ১৩ হাজার ৩৪০ টাকা। কমিটির সভাপতি সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, খাদ্যে ভেজাল নির্মূল করতে সংসদীয় কমিটির যে কার্যক্রম, যে ক্ষমতা- সেই অনুযায়ী মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি জানান, চলতি বছরে ৩২১টি অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে বিভিন্ন মেয়াদে ১৮৭ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এ সময় জরিমানা আদায় করা হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি ৯২ লাখ ৭১ হাজার টাকা। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনার সময় সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড কিংবা আর্থিক জরিমানার শাস্তি দিতে পারে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় ফৌজদারি মামলাও করা হয়। চলতি বছর এমন ১১টি মামলা হয়েছে।

এরপরও পরিস্থিতির সন্তোষজনক কোনো উন্নতি হয়নি। কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে না বলেই খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সংশ্নিষ্টরা জানান, ২০১০ সালে ভেজাল খাদ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী খাদ্যে ভেজাল মেশানোর সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। পরে এ সাজা কমিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড অথবা ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ২০১৪ সালে খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশেষ ক্ষমতা আইনে শাস্তির নতুন ধারা সংযোজনের সুপারিশ করে আইন কমিশন। সেই সুপারিশ এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকী ভেজাল মেশানোর অপরাধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যবসায়ীকে আজ পর্যন্ত সর্বোচ্চ শাস্তিও দেওয়া হয়নি।

তবে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের দাবি, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণরোধে জিরো টলারেন্স প্রদর্শন করা হচ্ছে। সারাদেশে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধি করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করে খাদ্যমন্ত্রী জানান, প্রয়োজনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন সংশোধনের কথা ভাবছে সরকার।

আইন কমিশনের সুপারিশও উপেক্ষিত :২০১৪ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্য, পানীয়, পশু বা প্রাণীর খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের শাস্তির নতুন ধারা সংযোজনের সুপারিশ করে আইন কমিশন। এসব ক্ষেত্রে অনধিক যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের সুপারিশ করা হয়। কমিশন ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে এটি ধারা হিসেবে সংযোজন এবং অপর একটি ধারার উপধারায় একটি দফা সংযুক্ত করারও সুপারিশ করে।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সমকালকে জানান, ওই সময় সুপারিশটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তী পদক্ষেপ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরই নেওয়ার কথা। কিন্তু গত পাঁচ বছরে এ-সংক্রান্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি।

খায়রুল হক আরও বলেন, আইন কমিশনের সুপারিশের আগে ২০১০ সালে ভেজাল খাদ্য বিক্রির জন্য দায়ী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ব্যবহারের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এরপর গত ৯ বছরে এ আইনে মামলা দায়েরের নজির নেই। প্রশাসন হাতেনাতে ভেজাল খাদ্যে বিক্রির দায়ের আটক করলেও অভিযুক্তদের নামমাত্র সাজা দিয়ে দায়মুক্তি দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন, কার্বাইডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে আগে এ বিষয়ে কোনো কিছু উল্লেখ ছিল না। খাদ্যদ্রব্যে রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার রোধে নিরাপদ খাদ্য আইন থাকলে তা এখনও কার্যকর হয়নি।

দুর্বল আইন ও সিএজির সতর্কতা :২০০৯ সালে ভোক্তা ও ক্রেতার অধিকার রক্ষার্থে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন পাস করা হয়। এছাড়া খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে ফুড সেফটি অ্যাক্ট, ন্যাশনাল ফুড পলিসি, ন্যাশনাল হেলথ পলিসিসহ মোট ২৩টি আইন ও বিধি রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই অকার্যকর বলে কম্পট্রোলার অডিটর জেনারেলের (সিএজি) এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ২০১৫ সালের ওই প্রতিবেদনে সরকারকে সতর্ক করে বলা হয়, খাদ্যপণ্যে বিষাক্ত ফরমালিন ও কারবাইড ব্যবহারের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনগুলো খুবই দুর্বল। ভেজালপণ্য তৈরির অপরাধে শাস্তির বিধানও পর্যাপ্ত নয়। অধিকাংশ আইন বর্তমানে অকার্যকর এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রয়োগ নেই। এমন কি যেসব সরকারি সংস্থা ভেজাল প্রতিরোধে কাজ করছে তাদের মধ্যে সমন্বয় নেই।

সিএজির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভেজাল মেশানোর অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন কোনো ঘটনার নজির এখন পর্যন্ত নেই। লঘুদণ্ড ও তদারকির অভাব খাদ্যে ভেজাল বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে ফুড সেফটি অ্যাক্ট-২০১৩ নামে নতুন আইনেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

২০১৫ সালে রাজধানীসহ অন্যান্য শহরের ২৮টি বাজার পরিদর্শন ও সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি তৈরি করে পারফরম্যান্স অডিট অধিদপ্তর। পরিদর্শনকালে বিভিন্ন বাজার থেকে খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়।

ভেজাল নিয়ন্ত্রণে গৃহীত পদক্ষেপ প্রসঙ্গে জানতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুযুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমকালকে বলেন, প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে তারা পুরোমাত্রায় কাজ করতে পারছেন না। বিদ্যমান আইন ব্যবহার করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বলেও জানান তিনি।

একা কোনো সংস্থার পক্ষে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করে মাহফুযুল হক আরও বলেন, সবাই সমন্বয় করে কাজ করলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা অনেকটাই সহজ হবে। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদনে মানসনদ দেয় বিএসটিআই। এ সংস্থাকেই এগুলোর মান নিশ্চিত করতে হবে। এর বাইরে ডিম, মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের মান নিশ্চিত করবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। মাছ-সংক্রান্ত পণ্যের মান নিশ্চিত করবে মৎস্য অধিদপ্তর। এছাড়া পানি ও বেভারেজের মান নিশ্চিত করবে বিএসটিআই। বোতলজাত পানির বাইরে সরবরাহ করা পানির মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব ওয়াসার।