বিশেষ অনুসন্ধান-৩

ধর্ষণের অপ্রকাশিত ঘটনাই বেশি

প্রকাশ: ২০ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

নাহিদ তন্ময় ও সাজিদা ইসলাম পারুল

স্কুলপড়ূয়া দুই মেয়ে শিশুকে নিয়ে রাজধানীর দক্ষিণখানে থাকেন মুক্তা আক্তার। তার স্বামী ব্যবসায়ী। মেয়েদের নিয়ে বেশিরভাগ সময় বাসায় থাকলেও তার মধ্যে বিরাজ করে এক অজানা আতঙ্ক। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের বাড়বাড়ন্তে তিনি শঙ্কিত। তাই বাড়ির সদর দরজা সবসময়ই বন্ধ রাখেন। দুই মেয়ের স্কুলে যাওয়া-আসা ছাড়া তাদের ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ। ফলে মেয়ে দুটির যখন অন্য শিশুদের সঙ্গে মুক্তবিহঙ্গের মতো হেসেখেলে বেড়ানোর কথা, তখন তারা কার্যত অবরুদ্ধ জীবন কাটাচ্ছে। মুক্তা বলেন, 'বিচারহীনতার কারণে দিন দিন ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। এসব ঘটনার শিকার হচ্ছে শিশু থেকে বয়স্ক নারী পর্যন্ত সবাই। কারণ অপরাধ করে অপরাধী পার পেয়ে যায়।'

ধর্ষণের ঘটনা বাড়ায় মুক্তার মতোই উৎকণ্ঠায় থাকেন অনেক নারী। শঙ্কায় সময় কাটে বহু অভিভাবকের। নারী অধিকারকর্মী ও বিশিষ্টজন বলছেন, ধর্ষণের বিস্তার বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। শুধু ধর্ষণ নয়, এই পাশবিকতার পর ভিকটিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। ধর্ষণের মহামারিতে অনেক পুরুষও তাদের মেয়েসন্তান কিংবা বোনকে নিয়ে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বিশিষ্টজন বলছেন, ধর্ষণ রোধে সরকারের কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে।

গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পর নোয়াখালীর সুবর্ণচরে মধ্যবয়সী এক নারীর গণধর্ষণ ছিল ব্যাপক আলোচিত। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর তরুণী রুপাকে হত্যা, বরগুনার বেতাগী উপজেলায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে শিক্ষিকাকে গণধর্ষণ, বগুড়ায় তরুণীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের পর তাকে ও তার মাকে ন্যাড়া করে দেওয়া, বনানীর হোটেল রেইনট্রিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণ ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যায়।

সর্বশেষ কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর হত্যা এবং ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির ওপর নির্যাতন ও হত্যা নারী নির্যাতনের ভয়াবহতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

অবাক হলেও সত্যি, পবিত্র ঈদুল আজহার দিনেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালের ঈদুল আজহার দিন হাসপাতালে মাকে রেখে বাড়ি ফেরার পথে এক তরুণী গণধর্ষণের শিকার হয় পটুয়াখালীর বাউফলে।

তবে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বেশিরভাগ ধর্ষণের ঘটনা কখনই প্রকাশিত হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, অপ্রকাশিত ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত ঘটনার বহু গুণ বেশি। একবার ধর্ষণের পর তার ভিডিও রেকর্ড করে বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বারবার ধর্ষণ করা, এমনকি দলবদ্ধ হয়ে পৈশাচিক উৎসবে মত্ত হওয়ার ঘটনাও বারবার খবরের শিরোনাম হচ্ছে।

বাংলাদেশে ঘরে-বাইরে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বয়সী নারী, শিশু ও তরুণী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৩১৬ জন। তার মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬৬ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে। এ ছাড়াও ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় ৬১ নারীকে। শুধু এপ্রিল মাসেই ধর্ষণের ঘটনা ছিল ১৩৪টি।

২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬৯৭ জন। তাদের মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮২ জন। ওই বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ২৪৮ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬৩ জনকে। গত বছর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় ১২৮ জনকে।

সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্যে দেখা যায়, চলতি মাসের প্রথম আট দিনেই সারাদেশে ৪১টি শিশু ধর্ষণ ও তিনটি শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। ভিকটিমদের মধ্যে চারটি ছেলেশিশুও ছিল। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় তিনটি মেয়েশিশুকে।

সব জায়গাতেই ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন নারীরা। নিজের ঘরে, রাস্তাঘাটে, স্কুল-কলেজে, মাদ্রাসায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে, গণপরিবহনে, রাইড শেয়ারে, কর্মস্থলে, হাসপাতালসহ সর্বত্রই ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্য ধর্ষণকে এক মামুলি অপরাধ মনে করছে অপরাধীরা। আর তাই এখনও প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমক্ষেই নারীরা নিগৃহীত হন। রাতের আঁধারে একা চললে ধর্ষণের শিকার হবেন, এটাই যেন স্বাভাবিক। বিচারহীনতাই যে দেশের সংস্কৃতি, সেখানে বিচার চাওয়াও যেন একধরনের অপরাধ। মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত সেই অপরাধেরই মাশুল দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হিসাব বিভাগে কর্মরত শাহজাহান মুন্সি তিন মেয়ের বাবা। অফিসের কাজের ফাঁকে নিয়মিত পত্রিকা পড়েন ও টিভিতে সংবাদ দেখেন। একের পর এক ধর্ষণের খবরে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনিও শঙ্কিত। শাহজাহান বলেন, ধর্ষণসহ যে কোনো অপরাধ করে যেন কেউ পার পেয়ে না যায়। ধর্ষকদের এমন সাজা দিতে হবে, যে কোনো পুরুষ এই পাপ কাজটি করার আগে যেন শতবার চিন্তা করে। একই সঙ্গে ধর্ষণ প্রতিরোধে অশ্নীল পত্রপত্রিকা ও বইয়ের ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। ধর্ষণ শুধু একটি ব্যাধি নয়, এটি দেশ ও জাতির জন্য অনেক বড় একটি অভিশাপ। এই অভিশাপের কালো অধ্যায় থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ৯৪ শতাংশ নারী গণপরিবহনে আর ৪০ শতাংশ নারী পোশাকশ্রমিক কারখানার ভেতরে-বাইরে যৌন হয়রানির শিকার হন। এখানে সহিংসতার শিকার প্রায় ৯৭ শতাংশ ভুক্তভোগীর অভিযোগ আদালতে শুনানির পর্যায়ে যায় না, গেলেও বাতিল হয়ে যায়।

নারী অধিকার সংক্রান্ত বহু মামলার আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, 'ধর্ষণ রোধে প্রচলিত আইনগুলো আরও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। পরপর কয়েকটি ঘটনার কঠোর বিচার হলে ধীরে ধীরে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড কমে যাবে।'

ধর্ষণ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ইউটিউবসহ ইন্টারনেটে অশ্নীল ভিডিওর ছড়াছড়িকেও দায়ী করা হয়। এর বিরুদ্ধে সরকার তেমন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। নারী নির্যাতন রোধে কাজ করা এসইএল চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশনের সমন্বয়ক ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, 'ধর্ষণের মূল কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। তবে মোবাইল ডিভাইসে ইউটিউবের অশ্নীল ভিডিও, রাস্তার পাশে দেয়ালে পোস্টার ও ফুটপাতে অশ্নীল ছবি সংবলিত উত্তেজক বইয়ের বিস্তার, অশ্নীল ছায়াছবি প্রদর্শন, চলচ্চিত্রে নারীকে ধর্ষণের দৃশ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে ধর্ষণে কার্যত উৎসাহ দেওয়া হয়। ইন্টারনেটে পর্নো সাইটের প্রভাবে যুব সমাজের মধ্যে দিন দিন ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া, ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের কোনো সাজা হয় না। ফলে এ অপরাধ বেড়েই চলেছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশি কবীর বলেন, গ্রামে-গঞ্জে, এমনকি ইউটিউবসহ সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কিছু বক্তা ওয়াজ মাহফিলে নারী অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিদ্বেষ বা হিংসা ছড়াচ্ছেন। এসব বিষয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলেই ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা। এতে অন্যরাও উৎসাহিত হচ্ছে।

বিশিষ্টজনরা বলছেন, ধর্ষণ প্রতিকারে রাজনৈতিক অঙ্গীকার জরুরি। অপরাধীদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকেও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।

বিষয় : বিশেষ অনুসন্ধান ধর্ষণ অজানা আতঙ্ক রাজধানী