ট্রেনের টিকিট গেল কই

কাগজপত্রে হাজার হাজার টিকিট বিক্রির তথ্য, যাত্রীরা বলছেন অন্য কথা

প্রকাশ: ২৬ মে ২০১৯     আপডেট: ২৬ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাজীব আহাম্মদ

ট্রেনে ঈদযাত্রার পাঁচ দিনে ঢাকা থেকে প্রতিদিনের টিকিট ২৮ হাজারের বেশি। অর্ধেক বিক্রি হচ্ছে অনলাইন ও অ্যাপে। বাকিটা কাউন্টার থেকে। ইন্টারনেট থেকে টিকিট কাটতে গেলে দেখা যাচ্ছে 'সার্ভার নট ফাউন্ড'। আর সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে কাউন্টার পর্যন্ত পৌঁছার পর শুনতে হচ্ছে বার্থ (কেবিন), শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) কামরার টিকিট শেষ। যাত্রীদের প্রশ্ন, তাহলে এত টিকিট যাচ্ছে কোথায়?

এর জবাবে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন গতকাল শনিবার সমকালকে বলেছেন, টিকিট যাত্রীরাই পাচ্ছেন। আসন রয়েছে ২৮ হাজারের কিছু বেশি। কিন্তু টিকিটপ্রত্যাশী লাখের ওপর। এ কারণে সবাই টিকিট পাচ্ছেন না। যারা পাচ্ছেন না, তারাই অভিযোগ করছেন টিকিটে কারসাজি হচ্ছে। মন্ত্রী বলেছেন, তিনি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারেন এবার ট্রেনের টিকিট বিক্রি নিয়ে কোনো কারসাজি হয়নি, হবেও না। এমপি-মন্ত্রীদের সুপারিশেও টিকিট দেওয়া হয়নি।

তবে অনলাইন ও অ্যাপে টিকিট কাটা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই যাত্রীদের। বছর ছয়েক আগে অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরু করে রেলওয়ে। গত ২৮ এপ্রিল চালু করে 'রেলসেবা' নামে অ্যাপ। অ্যাপে ও অনলাইনে ৫০ শতাংশ টিকিট বিক্রি চলছে।

বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে চলাচলকারী ১৬টি ট্রেনের ঈদযাত্রার টিকিট দেওয়া হচ্ছে কমলাপুর স্টেশন থেকে। এতে আসন সংখ্যা ১৪ হাজার ৯৫টি। প্রতিদিন কাউন্টার থেকে পাঁচ হাজার  ৯৪৪টি এবং অনলাইন ও অ্যাপে বিক্রি হচ্ছে আট হাজার ১৫১টি টিকিট। কাউন্টারের প্রায় ছয় হাজার টিকিটের জন্য প্রতিদিন ভিড় করছেন তার কয়েকগুণ যাত্রী। অধিকাংশেরই অভিযোগ, অনলাইন ও অ্যাপে টিকিট না পেয়ে তারা স্টেশনে এসেছেন।

অ্যাপে কত টিকিট বিক্রি হচ্ছে, কত টিকিট বাকি রয়েছে তা কমলাপুর স্টেশনে বিজ্ঞপ্তি আকারে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনলাইনে টিকিট বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস) বিডির নির্বাহী পরিচালক মেজর (অব.) জিয়াউল আহসান সারোয়ার গতকাল রাত ৮টার দিকে সমকালকে জানান, ইন্টারনেটে দৈনিক বরাদ্দের ১১ হাজার টিকিটের মধ্যে ওই সময় পর্যন্ত ৯ হাজার ৩৭৫টি বিক্রি হয়েছে।

কমলাপুর স্টেশনে বিকেল ৪টার দিকে প্রায় আট হাজার টিকিট বিক্রির তথ্য দেওয়া হয়। যাত্রীদের প্রশ্ন, এত টিকিট বিক্রি হচ্ছে, অথচ তারা কেন পাচ্ছেন না। গতকাল সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত এ প্রতিবেদকও অনলাইনে টিকিট কাটার চেষ্টা করেন। কিন্তু 'সার্ভার নট ফাউন্ড' দেখানো হয়। বিকেল ৩টার দিকে দেখানো হয়, ৩ জুনের ঢাকা-রংপুর রুটের 'রংপুর এক্সপ্রেস'-এর সব শ্রেণির টিকিট শেষ। তবে তখনও ঢাকা-সিলেটের সব শ্রেণির টিকিট ছিল অনলাইনে।

জিয়াউল আহসান বলেন, ঘণ্টায় ২০ হাজার টিকিট বিক্রির সক্ষমতা রয়েছে তাদের। কিন্তু ঈদের সময় হওয়ায় ঘণ্টায় দুই লাখ ব্যবহারকারী একসঙ্গে হিট করেন সার্ভারে। এ কারণে সার্ভার দেখায় না। তারা যে সার্ভার ব্যবহার করেন, একই সার্ভার ব্যবহার করে রেলওয়ে। রেলওয়েতে একই সময়ে সর্বোচ্চ ২০ থেকে ২৫টি হিট হয়। কিন্তু তাদের এখানে সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি হিট হওয়ায় 'সার্ভার নট ফাউন্ড' দেখায়। 'সার্ভার নট ফাউন্ড' দেখালেও সিএনএসের হার্ডওয়্যার দুর্বলতা নেই বলে দাবি করেছেন জিয়াউল আহসান। তিনি বলেন, ঘণ্টায় ১৫ হাজার টিকিট বিক্রিতে সক্ষম হার্ডওয়্যার তাদের রয়েছে।

সার্ভার না পেলে প্রতিদিন এত টিকিট বিক্রি হচ্ছে কী করে- এ প্রশ্নে জিয়াউল আহসান বলেছেন, টিকিটপ্রত্যাশী কয়েক লাখ। যখনই চাপ কমে, তখনই সার্ভারের সক্ষমতা অনুযায়ী বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন ১০ হাজারের মতো টিকিট বিক্রি হচ্ছে, যা অবিক্রীত থাকছে তা কাউন্টার থেকে বিক্রি হবে। তিনি জানান, স্বল্প দূরত্বের কিছু টিকিট অবিক্রীত রয়েছে।

তবে যাত্রীদের অভিযোগ, তারা সারাদিন চেষ্টা করেও অনলাইনে টিকিট পাননি। এ কারণেই ভিড় করছেন কমলাপুরে। রাত জেগে লাইন ধরছেন। শনিবার দুপুরে কমলাপুরে স্টেশনে কথা হয় আনোয়ার হোসেন নামের এক যাত্রীর সঙ্গে। তিনি 'নীলসাগর এক্সপ্রেস'-এর টিকিটের জন্য এসেছেন। তিনি জানালেন, অনলাইনে ও অ্যাপে ১ ও ২ জুনের টিকিট কাটতে গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার চেষ্টা করেও পাননি। সকালের দিকে সিএনএস-এর ওয়েবসাইট কিংবা 'রেলসেবা' অ্যাপ কোনোটিতেই ঢুকতে পারেননি। দুপুরের দিকে ঢুকতে পারেন। কিন্তু ততক্ষণে টিকিট শেষ। অনলাইনে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত স্টেশনে এসেছেন। শুক্রবার সেহরি খেয়ে টিকিটের লাইন ধরেছেন। কিন্তু দুপুর ১২টা পর্যন্ত টিকিট পাননি। তার প্রশ্ন অনলাইনের এই হাজার হাজার টিকিট কারা পায়।

প্রতি বছর ঈদে ট্রেনের টিকিটে থাবা বসান 'ভিআইপিরা'। মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা, আমলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও সাংবাদিকরাও টিকিটের জন্য তদবির করতেন। এসি, কেবিনের মতো উচ্চশ্রেণির টিকিট তাদের দখলে যেত। সাধারণ মানুষের ভাগ্য জুটত শোভন শ্রেণির টিকিট। রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন সমকালকে বলেছেন, এবার কারও তদবিরে টিকিট দেওয়া হয়নি। এমপি ও মন্ত্রীরা তাদের ব্যক্তিগত ভ্রমণের জন্য টিকিট পাচ্ছেন। মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত সচিবদেরও টিকিট দেওয়া হয়নি।

বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনের ৯০টি টিকিট চেয়ে ডিও লেটার দিয়েছিলেন ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম। জামালপুরের একজন এমপি চেয়েছিলেন ৬৭টি টিকিট। রাজশাহীর একজন এমপি চেয়েছিলেন এসি কেবিনের আটটি টিকিট। রেলমন্ত্রী বলেছেন, তাদের কাউকে টিকিট দেননি। চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, টিকিট দেওয়া সম্ভব নয়। এবার কারও জন্য একটি টিকিটও সার্ভারে ব্লক করা হয়নি। যা টিকিট রয়েছে সব কাউন্টারে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।

তবে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, এখনও কিছু টিকিট কালোবাজারি হচ্ছে। সমকালের অনুসন্ধানে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। সংখ্যা কম হলেও কালোবাজারে টিকিট রয়েছে। তা বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ফয়সাল নামে এক কালোবাজারির সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, ৩ জুনের 'রংপুর এক্সপ্রেস'-এর শোভন শ্রেণির টিকিট পাওয়া যাবে ২৭ মের পর। তবে দাম পড়বে হাজার টাকা। এ টিকিটের দাম ২৪০ টাকা। এই কালোবাজারি জানান, যেসব টিকিট অ্যাপে বিক্রি হচ্ছে না, সেগুলো ২৭ মের পর কাউন্টারে চলে আসবে, সেখান থেকে টিকিট ম্যানেজ করে দিতে পারবেন।

এমপি, মন্ত্রী, বিচারপতি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ট্রেনের প্রাধিকারে টিকিট পান। পাঁচ শতাংশ টিকিট সংরক্ষিত থাকে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। ঈদযাত্রায় ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ৩৭টি আন্তঃনগর ট্রেনে পাঁচ দিনে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সাত হাজার ৬২টি টিকিট সংরক্ষিত রয়েছে। কমলাপুর স্টেশন সূত্র জানিয়েছে, ঢাকায় রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারী এর চেয়ে অনেক কম। তাদের পরিবার-পরিজন মিলিয়ে এত টিকিট প্রয়োজন হয় না। বাড়তি টিকিট কালোবাজারে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সাধারণ মানুষ দিনেরাতে লাইন ধরে টিকিট কাটলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রেল পুলিশের বিরুদ্ধে লাইন ভেঙে টিকিট কাটার অভিযোগ রয়েছে। গতকাল বনানী স্টেশনেই দেখা যায়, পুলিশের পোশাক পরা চার ব্যক্তি লাইন ভেঙে টিকিট কেটেছেন। এতে সাধারণ যাত্রীরা বিক্ষোভও করেন।

গতকাল শনিবার ৩ জুনের টিকিট বিক্রি করা হয়। আজ রোববার দেওয়া হবে ৪ জুনের টিকিট। এর মধ্য দিয়ে শেষ হবে ট্রেনে ঈদযাত্রার আগাম টিকিট বিক্রি। চাঁদ দেখাসাপেক্ষে আগামী ৫ জুন ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। আগের তিন দিনের মতো, গতকালও টিকিটের জন্য কমলাপুরে ছিল উপচেপড়া ভিড়। সেই তুলনায় ভিড় ছিল না ফুলবাড়িয়া ও তেজগাঁওয়ে। এই দুই স্টেশনে সিলেট ও জামালপুরের ট্রেনের টিকিট দেওয়া হচ্ছে। বিমানবন্দর থেকে দেওয়া হচ্ছে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর টিকিট। সেখানেও রয়েছে কমলাপুরের মতো ভিড়।

কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার আমিনুল হক বলেছেন, টিকিটের তুলনায় যাত্রী সংখ্যা কয়েকগুণ। এ কারণেই সংকট। কিন্তু একটি টিকিটও নিয়মের বাইরে বিক্রি করা হচ্ছে না। যারা আগে আসছেন, তারা টিকিট পাচ্ছেন।

বিষয় : ট্রেন ঈদযাত্রা ট্রেনের টিকিট টিকিট