জাহালমের কারাভোগ

নাটক সাজিয়েছেন দুই ব্যাংকার

প্রকাশ: ১২ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

হকিকত জাহান হকি

অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান পাটকল শ্রমিক জাহালম। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। তিন বছর পর প্রমাণিত হয় জাহালম নিরপরাধ। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্তি মেলে তার। জাহালম আবার ফিরে এসেছেন মুক্তজীবনে। কিন্তু তার জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া তিনটি বছর ফিরিয়ে দেবে কে? এক গভীর চক্রান্তের রোমহর্ষক  কাহিনী নিয়েই এই ধারাবাহিক প্রতিবেদন

মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জাল বুনেছিলেন দুই ব্যাংক কর্মকর্তা। পথ তৈরি করেছিলেন জাহালমকে সালেক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার। তারাই ব্র্যাক ব্যাংকের রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এসএমই শাখায় প্রতারক গোলাম মোর্ত্তজা ওরফে আবু সালেকের জালিয়াতিপূর্ণ হিসাব খুলেছিলেন। সালেক ২০১০ সালের মে মাসে ভুয়া কোম্পানি মেহেরুন সামাদ ট্রেডার্সের নামে ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলে শাখা থেকে কোম্পানিটির অস্তিত্ব, কার্যক্রম ও আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা হয়নি। হিসাবটিতে সংযুক্ত জাতীয় পরিচয়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স ও নমিনি সবই অসত্য।

২০১০ সালের ১৬ মে ব্র্যাক ব্যাংকে ১৫৪৩২০১৭২১৭৩৭০০১ নম্বরের এ হিসাব খোলা হয়। এর অ্যাকাউন্ট ওপেনিং অফিসার ছিলেন শাখার সাবেক ব্রাঞ্চ সেলস অ্যান্ড সার্ভিস অফিসার মো. ফয়সাল কায়েস। এটি অনুমোদন করেছিলেন একই শাখার সাবেক ম্যানেজার সাবিনা শারমিন। অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে হিসাব খুলে বিপাকে পড়েন তারা। সেই দায় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তারা নিরীহ জাহালমকে সালেক বানানোর নাটক সাজান। এ নাটকে জাহালমকে আসামি বানিয়ে তিন বছর জেল খাটাতে সফল হলেও শেষ অঙ্কে আটকে গেছেন তারা। সাবিনা শারমিন বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকের শ্যামলী শাখার ম্যানেজারের দায়িত্বে আছেন। ফয়সাল কায়েস আছেন বর্তমানে আসাদ গেট শাখায় অপারেশন ম্যানেজারের দায়িত্বে।

সমকালের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে নিরপরাধ জাহালমকে জেলে দেওয়ার সাজানো এ নাটকের ছয় দৃশ্য। রাজধানীসহ ছয়টি জায়গায় মঞ্চস্থ হয় এ দৃশ্যগুলো। স্থানগুলো হলো- রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়, মোহাম্মদপুরে ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই শাখা, টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ঘুনিপাড়া গ্রাম, নাগরপুরের ধুবুড়িয়া গ্রাম, ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলস, আবারও দুদকের প্রধান কার্যালয়ের মিডিয়া সেন্টার, ঘোড়াশাল ও সর্বশেষ কারাগার।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদকে ফোন করা হলে তিনি সমকালকে বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলে এ বিষয়ে কথা বলা যাবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, দুদকের ভুল তদন্তের কারণে বিনা অপরাধে জাহালমকে তিন বছর কারাভোগ করতে হয়েছে। যারা তদন্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের পেশাগত অদক্ষতা ও গাফিলতি ছিল। এবার তাদের অদক্ষতা ঢাকার জন্য ঘটনা অন্যদিকে প্রবাহিত করা হতে পারে। দুদক কর্মকর্তারা জাহালমকে সালেক বলে জেলে ঢুকিয়েছেন- তা জলের মতো পরিস্কার। এটাও দেখতে হবে, জাহালমকে ট্র্যাপ করায় কাদের লাভ হয়েছে। এখন তারা আরেকটি নাটক সাজানোর জন্য সক্রিয় থাকতে পারে। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিষয়টি তদন্ত করতে হবে।

দুদকের উপপরিচালক (বর্তমানে পরিচালক) আবদুল্লা-আল-জাহিদ বাদী হয়ে সোনালী ব্যাংকের মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট শাখা থেকে ১৮ কোটি ৪৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবু সালেকসহ ১৭ জনকে আসামি করে ৩৩টি মামলা করেছিলেন ২০১২ সালের ১০ এপ্রিল। দুদকের দাবিমতে, ১৮টি ব্যাংকের ৩৩টি শাখায় ৩৩টি ভুয়া হিসাব খুলে ওই পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

মামলাগুলো তদন্ত শেষে দুদকের ৯ জন কর্মকর্তা সংশ্নিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা, গ্রাহক ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আবু সালেকের নাম বাদ দিয়ে জাহালমের নাম অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে ২৬টি মামলার চার্জশিট পেশ করেছিলেন ২০১৫ সালে। অপরদিকে তিনজন তদন্ত কর্মকর্তা সালেকের নাম বহাল রেখে সাতটি মামলার চার্জশিট দিয়েছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতারক আবু সালেক চালাকি করে গোলাম মোর্ত্তজা ও নূরে আলমসহ বিভিন্ন নামে বিভিন্ন ঠিকানা ব্যবহার করে এই ৩৩টি হিসাব খুলেছেন। তদন্তের সময় ছদ্মবেশী আবু সালেকের লাগামহীন জাল-জালিয়াতির প্রমাণ বেরিয়ে আসে।

প্রতারণার ফাঁদ পাততে প্রতারক সালেকসহ চক্রের সদস্যরা প্রথমে সোনালী ব্যাংকের মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট শাখায় তিনটি হিসাব খুলেছিলেন। এ তিনটি হিসাব থেকে ইস্যু করা ১০৬টি চেক ১৮টি ব্যাংকের ৩৩টি হিসাবে জমা করে ১৮ কোটি ৪৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। চেকগুলো জমা করার আগে অভিনব কায়দায় জালিয়াতি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লিয়ারিং হাউস ও সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখার অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল।

এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের মোহাম্মদপুরের এসএমই শাখায় খোলা হিসাবে একাধিক চেক পাঠিয়ে ৬০ লাখ ৩০ হাজার টাকা নগদে তুলে আত্মসাৎ করা হয়। আরও ৩২টি হিসাবে একের পর এক চেক জমা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ওই ৩২টি হিসাবের বিপরীতে করা ৩২টি মামলার কোনোটিতে নয়- জাহালমকে ফাঁসানো হয়েছিল ব্র্যাক ব্যাংকের এই এসএমই শাখা থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে করা ১৩ নম্বর মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায়। গোলাম মোর্ত্তজা ওরফে আবু সালেকসহ আটজনকে আসামি করে ১৩ নম্বর মামলাটি করা হয়েছিল আদাবর থানায়।

এই ১৩ নম্বর মামলা তদন্তের সময় দুদক থেকে আবু সালেককে খুঁজে বের করতে বলা হয়েছিল এসএমই শাখায় হিসাব খোলা কর্মকর্তা ফয়সাল ও হিসাব অনুমোদনকারী কর্মকর্তা সাবিনা শারমিনকে। ব্যাংকিং নিয়মে কেওয়াইসি (কহড়ি ণড়ঁৎ ঈঁংঃড়সবৎ) নিশ্চিত করেই তাদের হিসাবটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কেওয়াইসি মানা হয়নি। ১৩ নম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিচালক সেলিনা আক্তার মনি এসএমই শাখার অভিযুক্ত অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকে খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছিলেন। তদন্ত প্রক্রিয়ায় এই তাগিদ ছিল স্বাভাবিক। সালেককে খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হলে অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ভুয়া হিসাব খোলার অভিযোগে তাদের চার্জশিটভুক্ত আসামি হতে হবে- এটি ফয়সাল ও সাবিনা স্পষ্ট করেই বুঝতে পেরেছিলেন।

দুদকের তাগিদের পরিপ্রেক্ষিতে এই দুই ব্যাংক কর্মকর্তা সালেককে খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। সালেককে খুঁজতে গিয়ে সদৃশ চেহারার জাহালমের সন্ধান পায় তারা। শুরু হয় নিরীহ জাহালমকে বলির পাঁঠা বানানোর আয়োজন। ব্যাংকের মোহাম্মদপুরের এসএমই শাখায় সালেক যেসব কাগজপত্র, ঠিকানা, তথ্যাদি ব্যবহার করেছিলেন, সেসব তথ্য অনুযায়ী তদন্ত করা হলে জাহালমকে সালেক বলে চালিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

প্রতারক আবু সালেক

সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ১৩ নম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তার চাপে ওই দুই ব্যাংক কর্মকর্তা নিজেদের দায় এড়াতে জাহালমকে সালেক নামে হাজির করেছিলেন। জাহালমের সামনে দাঁড়িয়ে সালেকের ছবির সঙ্গে জাহালমের চেহারা মিলিয়ে দেখেছেন দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা। ওই সময় জাহালমের কথাবার্তায় অসামঞ্জস্যতাও পেয়েছিলেন তারা। এর পর ওই ছবি ও হিসাব খোলার সময় ব্যাংকে জমা দেওয়া সালেকের কাগজপত্র অনুযায়ী তদন্ত করা হয়নি। এই পর্যায়ে সুষ্ঠু তদন্ত হলে জাহালমকে বিনা অপরাধে জেল খাটতে হতো না।

অবশেষে দীর্ঘ এক নাটক সাজিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা বলির পাঁঠা বানিয়েছিলেন জাহালমকে। জোর-জবরদস্তি করে হলেও কাউকে সালেক হিসেবে দুদকে হাজির করতে পারলে সংকট থেকে রেহাই পাবেন বলে বিশ্বাস ছিল তাদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদ্ঘাটিত হয়েছে, দুই ব্যাংক কর্মকর্তার খুঁজে বের করা সালেক প্রকৃত সালেক নন। তিনি হতভাগা জাহালম।

প্রতারক গোলাম মোর্ত্তজা ওরফে আবু সালেক ব্র্যাক ব্যাংকের মোহাম্মদপুরের এসএমই শাখায় ভুয়া হিসাবটি খোলার সময় গ্রাম :গুনিপাড়া, ইউনিয়ন : সলিমাবাদ, ডাকঘর :সলিমাবাদ, থানা :নাগরপুর - এই ঠিকানা ব্যবহার করেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সলিমাবাদ ইউনিয়নের গুনিপাড়া গ্রামের বানান হবে ঘুনিপাড়া। গুনিপাড়া বানানে সেখানে কোনো গ্রাম নেই। হিসাবটি খুলতে সালেক ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন। সালেকের প্রকৃত ঠিকানা- গ্রাম :শিংদিয়া, ইউনিয়ন :বালিয়া, ডাক :ভূল্লি, উপজেলা : ঠাকুরগাঁও সদর।

দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে আসামি সালেককে খুঁজে বের করার তাগিদ দেওয়ার পর ওই দুই ব্যাংক কর্মকর্তার নজর পড়ে টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ঘুনিপাড়া গ্রামের দিকে। এরপর থেকে শুরু হয় নাটক।

নাটকের প্রথম দৃশ্য: ঘটনাস্থল- মোহাম্মদপুরে ব্র্যাক ব্যাংকের এসএমই শাখা। সাবিনা শারমিন তখন ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন। ফয়সাল কায়েস ছিলেন মতিঝিল শাখায়। আসামি ধরতে না পারলে তারা আইনের আওতায় আসবেন- এটি অনুভব করে ২০১৪ সালে ঘুনিপাড়ায় ফয়সালকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন সাবিনা শারমিন। তখন শান্তিনগর শাখায় ব্রাঞ্চ সেলস অ্যান্ড সার্ভিস অফিসার পদে চাকরি করতেন টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ধুবুড়িয়া গ্রামের নাজিউর রহমান শুভ্র। ঘুনিপাড়া-ধুবুড়িয়ার দূরত্ব ৩-৪ কিলোমিটার। সাবিনা শারমিন ফয়সাল কায়েসকে ডেকে এনে শুভ্রর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে শুভ্রকে ফয়সালের গাইড হিসেবে পাঠানো হয় ঘুনিপাড়ায়।

দ্বিতীয় দৃশ্য: ঘটনাস্থল- টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ঘুনিপাড়া গ্রাম। শুভ্রকে সঙ্গে নিয়ে ফয়সাল যান সেখানে। ঘুনিপাড়া সংলগ্ন কাসপাই মোড়ে গিয়ে কয়েকজন দোকানিকে সালেকের ছবি দেখানো হলে তারা ছবির মানুষটিকে চেনেন না বলে জানিয়ে দেন। দোকানি সানোয়ার হোসেন ছানাকে ছবিটি দেখানো হলে তিনি সালেকের ছবি দেখে বলেছিলেন, 'এইটা তো জাহালম।' তখন ফয়সাল এই জাহালমের ঠিকানা জানতে চান। ছানা বলেছিলেন, জাহালমের বাড়ি ধুবুড়িয়া গ্রামে। সেখানে তার ভাই শাহানুরের দোকান আছে। পরে ছানার কাছ থেকে শাহানুরের ঠিকানা নেন ব্যাংকার ফয়সাল।

তৃতীয় দৃশ্য:  ঘটনাস্থল- নাগরপুরের ধুবুড়িয়া গ্রাম। ফয়সাল ছদ্মবেশে ব্যবসায়ী পরিচয়ে চলে যান ধুবুড়িয়া গ্রামে শাহানুরের দোকানে। শুভ্র পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ফয়সালকে দেখিয়ে শাহানুরকে বলেন, উনি আমার বন্ধু। ব্যবসা করেন, বাড়ি নরসিংদী। তারপর শুভ্র জানতে চান জাহালম কোথায় থাকেন। শাহানুর জানান, জাহালম ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে চাকরি করেন। এরপর তারা ঢাকায় ফিরে আসেন।

চতুর্থ দৃশ্য:  ঘটনাস্থল- ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলস। সাবিনা শারমিন, ফয়সাল ও দুদকের কতিপয় কর্মকর্তা একসঙ্গে বাংলাদেশ জুট মিলে গিয়ে জাহালমকে খুঁজে বের করেন। ফয়সাল জাহালমকে দেখেই সবার সামনে বলেন, 'এই তো আবু সালেক।' তারপর তারা মিল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জাহালমের ছবি, বায়োডাটাসহ অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর ফিরে আসেন ঢাকায়।

বিরতি: দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জাহালমের গ্রাম :ধুবুড়িয়া, ডাকঘর :ধুবুড়িয়া, থানা :নাগরপুর- এই ঠিকানায় ছয়টি চিঠি পাঠান। এ সময় জাহালম জুট মিলে ছিলেন। তার ভাই শাহানুর মিয়া চিঠিগুলো পেয়ে দেখেন পাঁচটি চিঠির তারিখ চলে গেছে। একটি চিঠির তারিখ আছে। তড়িঘড়ি করে জাহালমকে ফোন করে তিনি পরের দিন ভোরে ঢাকায় যেতে বলেন। শাহানুরও বাড়িতে থাকা তার আরেক ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় আসেন। তিন ভাই দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হন। তাদের নেওয়া হয় দুদক মিডিয়া সেন্টারে।

পঞ্চম দৃশ্য: ঘটনাস্থল- দুদকের প্রধান কার্যালয়ের মিডিয়া সেন্টার। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাদের মুখোমুখি জাহালম। এ সময় ব্র্যাক ব্যাংকের সাবিনা শারমিন ও ফয়সাল কায়েস, সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা মো. নূরউদ্দিন শেখ এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক কর্মকর্তা তাজবিন সুলতানাও উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই জাহালমের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে সালেক বলে শনাক্ত করেন। যে ফয়সাল কায়েস ধুবুড়িয়া গ্রামে গিয়ে জাহালমের ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন, সেই ফয়সাল ব্যাংকার পরিচয়ে মিডিয়া সেন্টারে জাহালমকে সালেক হিসেবে চিহ্নিত করেন। তখন শাহানুর জাহালমের কানে কানে বলেছিলেন 'ঘটনা খারাপ।' ২০১৪ সালের শেষ দিকে মিডিয়া সেন্টারে জাহালমকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়।

বিরতি: জাহালম তার দুই ভাইসহ গ্রামের বাড়িতে চলে যান। দু'দিন বাড়িতে থাকার পর জাহালম যান ঘোড়াশালের জুট মিলে। কয়েকদিন পর দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবার ডাকেন তাকে। দুদক প্রধান কার্যালয়ে আবারও আসেন জাহালমসহ তিন ভাই। জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের। এবার জাহালম দুদক কার্যালয় থেকে সরাসরি চলে যান জুট মিলে। শাহানুর তার ভাইসহ চলে যান গ্রামের বাড়িতে। ২০১৫ সালে জাহালমের নাম অন্তর্ভুক্ত করে দুদক ২৬ মামলার চার্জশিট পেশ করে।

ষষ্ঠ ও সপ্তম দৃশ্য:  ঘটনাস্থল- ঘোড়াশাল ও কারাগার। আদালত থেকে জাহালমের নামে জারি করা হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা। পরে পুলিশ ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তাকে ঘোড়াশাল থেকে গ্রেফতার করে নাগরপুর থানায় নেয়। থানা থেকে পাঠানো হয় টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে। সেখানে সাত দিন রাখার পর হাতে-পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি লাগিয়ে তাকে নেওয়া হয় পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে। এখানে তিন মাস রাখার পর স্থানান্তর করা হয় কাশিমপুর কারাগারে। সব মিলিয়ে তাকে তিন বছর কারাগারে রাখা হয়। জাহালম সালেক নন- এই সত্য প্রকাশ হলে এগিয়ে আসে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাশগুপ্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট শুনানি নিয়ে সেইদিনই জাহালমকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশের পর জাহালম কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান। এভাবেই নাটকটির সমাপ্তি ঘটে।

সংশ্নিষ্টদের বক্তব্য
জাহালম
: ' জীবনে কোনোদিন ব্যাংকে যাইনি। আজ পর্যন্ত কোনো অ্যাকাউন্ট নেই। অথচ বিনা অপরাধে তিন বছর জেল খাটতে হলো।' তিনি এর বিচার চেয়ে বলেন, 'তিন বছর জেলে থেকে কোনো উপার্জন করতে পারি নাই। আমরা গরিব মানুষ। ধারদেনা করে কোনো রকমে সংসার চলে। তাই সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চাই।' গণমাধ্যমকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, 'গণমাধ্যমের কারণেই আমি নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি। তাদের কথা আমি জীবনে ভুলতে পারব না। আমার এ জীবন তাদের অবদান।'

সাবিনা শারমিন: 'ফয়সাল কায়েস ও নাজিউর রহমান শুভ্রকে আপনি টাঙ্গাইলের ঘুনিপাড়া গ্রামে পাঠিয়েছিলেন?'- এ প্রশ্নের জবাবে সাবিনা শারমিন সমকালকে বলেন, 'আমি ফয়সাল বা অন্য কাউকে টাঙ্গাইলের ঘুনিপাড়া পাঠাইনি। ওরা গেছে। কেন গেছে সেটা দুদককে জানানো হয়েছে।' ফয়সাল টাঙ্গাইলে জাহালমের ধুবুড়িয়া গ্রাম পর্যন্ত গিয়েছেন কি-না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওখানে ফয়সাল গেছে- এ বিষয়ে ওকে জিজ্ঞেস করুন। দুদক অ্যাড্রেসটি নিয়ে ফয়সালকে যেতে বলেছিল। তখন ফয়সাল যেহেতু আমার স্টাফ সেহেতু সে আমার মাধ্যমে গেছে। নাজিউরও এই ব্রাঞ্চে কাজ করত। সেও গেছে। অ্যাড্রেসগুলো সবই দিয়েছে দুদক থেকে।' তিনি একবার বলেছেন দুদক অ্যাড্রেসটি নিয়ে ফয়সালকে যেতে বলেছে, আবার বলেছেন অ্যাড্রেসটি দুদক থেকে দেওয়া হয়েছে।

ফয়সাল আর শুভ্রকে পাঠানোর কারণেই জাহালম বিনা অপরাধে তিন বছর কারাভোগ করেছেন কি-না, জানতে চাইলে সাবিনা শারমিন বলেন, 'এই যে আপনি এখন একটা ভুল কথা বলে আমাকে ইনভলভ করছেন। তাই না? এখানে তো আসলে টোটালি আমি কিছুই করি নাই। আমি এখন ফোনে কথাও বলতে চাচ্ছি না। আপনি যদি চান ব্যাংকের কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টে কথা বলেন।'

নাজিউর রহমান শুভ্র: ব্র্যাক ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা (বর্তমানে ব্যাংক এশিয়ায় কর্মরত) নাজিউর রহমান শুভ্র সমকালকে বলেন, সাবিনা ম্যাডাম তাকে ফয়সালের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে ফয়সালের সঙ্গে ঘুনিপাড়া পাঠিয়েছিলেন। সাবিনা শারমিন তখন ব্র্যাক ব্যাংকের শান্তিনগর ব্রাঞ্চের নতুন ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। শুভ্র আগে থেকেই এই ব্রাঞ্চে কর্মরত ছিলেন। শুভ্র বলেন, ব্যাংকের মোহাম্মদপুরের এসএমই শাখায় খোলা সালেকের অ্যাকাউন্ট নিয়ে এত বড় ঝামেলা ছিল সাবিনা তাকে সেসবের কিছুই জানাননি। জানলে এই ঝামেলা নিয়ে তিনি ফয়সালের সঙ্গে যেতেন না। তিনি বলেন, পরে ম্যাডামকে মুখোমুখি বলেছিলাম, 'ম্যাডাম, এত ঝামেলা আছে, এটা আগে বলেননি কেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, এটা সিক্রেট রাখতে বলা হয়েছে।'

ফয়সাল কায়েস: ঘুনিপাড়ায় আপনাকে কি কেউ পাঠিয়েছিল?- এই প্রশ্নের জবাবে ব্র্যাক ব্যাংক কর্মকর্তা ফয়সাল কায়েস সমকালকে বলেন, 'কে পাঠিয়েছিলেন, কে ঠিকানা দিয়েছিলেন- দুদককে দেওয়া আমার লিখিত স্টেটমেন্টে সব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। দুদক অনেকবারই লিখিত স্টেটমেন্ট নিয়েছে। আমাকে কে পাঠিয়েছে স্টেটমেন্টে নির্দিষ্ট করে তা বলা হয়েছে।' আপনি ঘোড়াশালে বাংলাদেশ জুট মিলে গিয়েছিলেন কি-না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'গিয়েছি। এসবও আমার স্টেটমেন্টে লেখা আছে। মিলে গিয়ে আমিই শুধু জাহালমকে সালেক বলে চিহ্নিত করিনি, চিহ্নিত করার আরও কেউ কেউ ছিলেন।'

বিষয় : জাহালম কারাভোগ দুই ব্যাংকার নাটক