নদীর বালু নদীতেই

২৩২ কোটি টাকা গচ্চা,একই নৌপথ পুনঃখননে ব্যয় করা হবে ৬৪২ কোটি টাকা

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন হাসনাইন ইমতিয়াজ

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি আনতে গত বছর মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া থেকে পাবনার পাকশী পর্যন্ত নদীপথ খনন (ক্যাপিটাল ড্রেজিং) করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই আবার নদীপথ ভরাট হয়ে গেছে। খনন করে তোলা বালু বেষ্টনী (ডাইক) ছাড়াই নদীর তীরে রাখা হয়েছিল। ফলে বর্ষার পানিতে তা আবার নদীতে নেমে গিয়ে নদীপথটি ভরাট করে ফেলেছে। কোথাও বাঁশের বেষ্টনী থাকলেও তা দুর্বল হওয়ায় বালু মাটি আটকে রাখতে পারেনি। অনেক জায়গায় নদী থেকে বালু তুলে আবার নদীতেই ফেলা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ-আইএমইডির পর্যবেক্ষণে এসব ত্রুটি ধরা পড়েছে। খননকাজটি বাস্তবায়ন করছে নৌ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, নাব্য না থাকায় বিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রপাতিবাহী বড় নৌযান এ পথে চলাচল করতে পারেনি। নাব্য ফেরাতে প্রায় আড়াই গুণ অর্থ ব্যয়ে আবার সমপরিমাণ সংরক্ষণ খনন (মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং) প্রকল্প শুরু হয়েছে। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে ব্যয় হয়েছে ২৩২ কোটি টাকা। মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৪২ কোটি টাকা। জানা গেছে, বর্তমানে ৫টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ২৫টি ড্রেজার দিয়ে নৌপথটি পুনঃখনন করা হচ্ছে। কিন্তু এবারও আগের মতোই খননে উত্তোলিত বালু যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাই ফের খননের সুফল কতটুকু মিলবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

পাবনার রূপপুরে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ চলছে। এ প্রকল্পের ভারী মালপত্র দেশে আনার পর তা মোংলা থেকে নৌপথে পাবনায় আনা হবে। এ জন্য মোংলা বন্দর থেকে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত ৪শ' ৬০ কিলোমিটার নদী খননের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ খনন প্রকল্পের উদ্দেশ্য মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে চাঁদপুর, মাওয়া ও গোয়ালন্দ হয়ে পাকশী পর্যন্ত নৌপথের নাব্য বৃদ্ধি করা। এ জন্য ব্যয় ধরা হয় ৯৫৬ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদকাল ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় নদী খননকাজের উদ্বোধন করা হয়। এর মধ্যে পাটুরিয়া থেকে পাকশী ব্রিজ পর্যন্ত ৩৭ কিলোমিটার নৌপথের খননকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি। শেষ হয় একই বছরের ৩০ মে। খনন এলাকাকে ১৪ অংশে ভাগ করে (সেগমেন্ট) ৬৪ লাখ ঘনমিটার নদীপথ খননকাজ শুরু হয়।

খনন কার্যক্রম মাঠ পর্যায়ে যাচাইয়ে ডেভেলপমেন্ট টেকনিক্যাল কনসালট্যান্টস নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেয় আইএমইডি। প্রকল্প এলাকায় ১৪টি খনন অংশের বিভিন্ন পেশার এক হাজার ২০০ জনের সাক্ষাৎকার, প্রকল্প-সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা ও সরেজমিন পরিদর্শনের পর একটি প্রতিবেদন গত মার্চে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কাজ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প। এর মালপত্র আনতে নৌপথ খননকাজও অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাটুরিয়া-পাকশী ব্রিজ পর্যন্ত ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে অনেক ব্যত্যয় ঘটেছে। পুনঃখননেও নিয়ম সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। এজন্য সংশ্নিষ্টদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ সচিব আবদুস সামাদ সমকালকে বলেন, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের সময় ডাইক নির্মাণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছিল না। তাই কিছু জায়গায় বালু আবার নদীতে চলে গেছে। এখন খননকাজ নিয়ম মেনে করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

রূপপুর প্রকল্প তত্ত্বাবধানকারী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, তার জানামতে খননকাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গঠিত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানির পরামর্শক রবীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী বলেন, গত বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই ইউনিটের কোর কেচার দুটো নদীপথে এসেছে। এর বেশি মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি।

খননের পরও জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত :ক্যাপিটাল ড্রেজিং শেষ হওয়ার পর ২০১৮ সালের জুনে প্রথমবার রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের ভারী মালপত্র জাহাজে মোংলা থেকে রূপপুরে পৌঁছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনটি জাহাজ মোংলায় পৌঁছলেও পাটুয়ারিয়া থেকে পাকশী পর্যন্ত নদীর তলদেশ আবার ভরাট হওয়ায় পাটুরিয়া থেকে মালপত্র সড়কপথে প্রকল্প স্থানে নেওয়া হয়।

বালু ফেলা হয়েছে নদীতেই :প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিদর্শনকালে দেখা যায়, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের সময় ১৪ সেগমেন্টের অধিকাংশেই ডাইক নির্মাণ করা হয়নি। খননে উত্তোলিত বালু নদীর তীর ঘেঁষে ও নদীতেই ফেলা হয়েছে। খননের পরে বর্ষায় তীব্র স্রোতে সেই বালু ফিরে এসে আবার নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলেছে। ফলে মাত্র এক বছরের মধ্যে সমরিমাণ মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন হচ্ছে। খননের আওতায় পড়েছে রাজবাড়ী সদর, পাংশা, পাবনা সদর, সুজানগর, কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী, হাতাশ, হরিপুর, মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিদর্শনকালে পাটুরিয়া থেকে পাকশী পর্যন্ত ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের ১৪টি সেগমেন্টের ১৩টিতেই বালু ফেলার জন্য ডাইকের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে খননকারীরা দাবি করেছে, চারটি সেগমেন্টে বালু ডাইক করে ফেলা হয়েছে। পাঁচটি সেগমেন্টে খননের বালু ফেলা হয়েছে নদীর তীর ঘেঁষে। দুটি সেগমেন্টে বালু ফেলা হয়েছে পদ্মার খোলা চরে। রাজবাড়ী জেলার পাংশার হাবাশপুর, রতনদিয়া ইউনিয়ন; পাবনা সদরের ভাড়ারা ইউনিয়ন, সাদিবাজপুর, কালিকাপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং কুষ্টিয়া সদরের হরিপুর, কয়া ইউনিয়ন; মিরপুর উপজেলার বহলবাড়িয়া, ভেড়ামারার বাহিরচর ইউনিয়নে ডাইকের অস্তিত্ব দেখা যায়নি। পাংশার মিজানপুর ইউনিয়নে পর্যবেক্ষকদের জানানো হয়, নদীর খনন করা বালু চরে ফেলা হয়েছে। তা বর্ষাকালে আবার নদীতে ফিরে তলদেশ ভরাট করে ফেলেছে। নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় পাওয়া গেছে, খননের বালুর প্রায় ৪৫ শতাংশ নদীতে, ১৭ শতাংশ নদীর পাড়ে এবং ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ কৃষিজমিতে ফেলা হয়েছে। উত্তোলিত বালুর ৩০ শতাংশ নির্ধারিত ডাইকে, ৬ শতাংশ ব্যক্তিগত বাড়ি, স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদের স্থান ভরাট কাজে ফেলা হয়েছে। তবে ৫৫ শতাংশ এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, মাটির ডাইক তৈরির সময় বাঁশের পাইলিং ও তরজা বেড়া (বাঁশের বেড়া) নির্মাণ করা হয়নি। ৩২ শতাংশ বলেন, বালু সংরক্ষণে বাঁশের বেষ্টনী দেওয়া হয়েছে। ১৩ শতাংশ উপকারভোগী বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না।

সংরক্ষণ খননকাজেও অনিয়ম :পরিদর্শক দল সরেজমিন দ্বিতীয় পর্যায়ের খননকাজেও অনিয়ম পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই নদী ভরাট হয়ে যায়। তাই পাটুরিয়া থেকে পাকশী ব্রিজ পর্যন্ত নৌপথের নাব্য ফেরাতে ১৫টি সেগমেন্টে ভাগ করে গত জানুয়ারি থেকে আবার খননকাজ শুরু হয়। পর্যবেক্ষক দলের পরিদর্শনে দেখা গেছে ১, ৮ ও ১০ নং সেগমেন্টে ডাইক নির্মাণ করে মাটি ফেলা হয়েছে। সেগমেন্ট ২ এর খননকাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড সম্পন্ন করেছে। সেগমেন্ট ৩-এ বাঁশের বেষ্টনী দুর্বল থাকায় উত্তোলিত বালু নদীর চর ও নদীর মৃত চ্যানেলে ফেলা হয়েছে। সেগমেন্ট ৪-এ নাব্য ঠিক থাকায় খনন করা হয়নি। সেগমেন্ট ৫ ও ৬-এ খননের জায়গা থেকে নদীর কিনারা ৪ কিলোমিটার দূরে থাকায় মাটি নদীতেই ফেলা হয়। সেগমেন্ট ৭-এ ডাইক নির্মাণ করে বালু রাখা হয়েছে। ৯ নং সেগমেন্টে গ্রাম দূরে হওয়ায় নদীর কিনারে বালু ফেলা হয়েছে, যা বর্ষার পানিতে আবার নদীতে চলে আসবে বলে আশঙ্কা করেছে পর্যবেক্ষক দল। ১১ নং সেগমেন্টের বাঁশের বেষ্টনী দুর্বল হওয়ায় তা ভেঙে গেছে। ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫ নং অংশে পরিদর্শনের সময় ডাইক পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প পরিচালক পর্যবেক্ষক দলকে জানিয়েছেন, বর্তমানে সব সেগমেন্টে ডাইক নির্মাণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে নানান ত্রুটি :পর্যবেক্ষক দলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প গ্রহণের সময় পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোক নেওয়া হয়নি। ৪৬০ কি.মি. নৌপথ খননকাজ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও তদারকির জন্য বিআইডব্লিউটিএর ১০/১২ জন মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলী দরকার হলেও রয়েছেন পাঁচজন। পর্যবেক্ষণকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে খননকাজের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতা পরিলক্ষিত হয়। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের সেগমেন্ট ২-এর অন্তর্গত রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের উরাকান্দা মৌজায় নদীর তীরবর্তী এলাকা খননের ফলে তীরে ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙনের আরেকটি কারণ বাল্ক্কহেড ড্রেজার দিয়ে নদী থেকে গভীর করে বালু তোলা। ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে তোলা বালু নথিভুক্ত করা হয়নি। তবে বর্তমানে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিংয়ে তা করা হচ্ছে বলে বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে। প্রকল্প এলাকার নদী খননের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। ফলে ডাইক নির্মাণ এবং বালু ফেলা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। খননকাজের দেখভালের জন্য ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএসকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে খননকাজ পরিদর্শনের সময় সমীক্ষাকারীরা সিইজিআইএসের কমকর্তাদের মাঠে পাননি।

সুপারিশ :খননকাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে সমীক্ষক দল কয়েকটি সুপারিশ প্রদান করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্ষা মৌসুমের পর সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে যখন নদীতে স্রোত কম থাকে এবং উজান থেকে পলি আসা হ্রাস পায় তখন খননকাজ চালালে সফলতা মিলবে। প্রকল্পের সঙ্গে নদী বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করতে হবে। উত্তোলিত বালু সরকারি নিচু জমি, রাস্তা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কবরস্থান, এতিমখানা অথবা ব্যক্তিমালিকানার নিচু জমিতে ফেলা যেতে পারে। কৃষিজমিতে মাটি ফেলা যাবে না। কোন স্থানে খনন কার্যক্রম চলবে ও উত্তোলিত বালু কোথায় ফেলা হবে, তা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জানাতে হবে। শুকনো স্থানে বালু ফেলতে মাটির ডাইক এবং পানিতে বালু ফেলার সময় বাঁশের বেড়া শক্ত করে নির্মাণ করতে হবে। সিইজিআইএস কর্মকর্তাদের মাঠে থেকে সঠিকভাবে তদারকি করতে হবে, যাতে প্রতিবছর সমসংখ্যক মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং করা না লাগে।