সংশোধিত ড্যাপে নতুন ৫ কৌশল

ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকা ভেঙে সাজানো হবে নতুনভাবে, গেজেট হতে পারে এ মাসেই

প্রকাশ: ২১ জুন ২০১৯     আপডেট: ২১ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

অমিতোষ পাল

ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সংশোধিত বিশদ নগর অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) নতুন পাঁচটি কর্মপন্থা অন্তর্ভুক্ত করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূমি পুনঃউন্নয়ন, ভূমির পুনর্বিন্যাস, উন্নতি সাধন ফি, ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন ও উন্নয়ন স্বত্ব প্রতিস্থাপন।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী যেসব এলাকার জমির দাম অতিরিক্ত বেড়েছে, সেখানে আরোপ করা হবে বিশেষ কর। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য থাকবে বিশেষ সুবিধা। হেরিটেজভুক্ত বিশেষ এলাকা বা স্থাপনা হওয়ায় যারা তাদের অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে পারছেন না, তাদের অন্যখানে দেওয়া হবে জমি অথবা প্লট। ঘিঞ্জি এলাকাকে ভেঙে পরিকল্পিতভাবে সাজানোর পরিকল্পনাও রয়েছে এ ড্যাপে।

রাজউকের এক হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য ২০ বছর মেয়াদি এ পরিকল্পনা ২০৩৫ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া ঢাকা শহরের এ মাস্টারপ্ল্যান গেজেট আকারে চলতি মাসেই প্রকাশিত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল  ইসলাম বলেন, রাজউকের প্রথম ড্যাপ নিয়ে মানুষের অনেক অভিযোগ ছিল। সংশোধিত ড্যাপে সেসব সংশোধন করে এ শহরকে বাসযোগ্য করতে ভূমি পুনঃউন্নয়নসহ বেশ কিছু কর্মপন্থা দেওয়া হচ্ছে। এসব কর্মপন্থা নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আশা করি প্রধানমন্ত্রীর সহায়তায় এটা করা সম্ভব হবে।

সংশোধিত ড্যাপের এসব সুপারিশ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পল্গ্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজউক সংশোধিত ড্যাপে ভূমি পুনঃউন্নয়ন, ভূমি পুনর্বিন্যাস, ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়নসহ বেশ কিছু নতুন কর্মপন্থা সুপারিশ করছে। এটা ভালো উদ্যোগ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এসব পন্থায় উন্নতি করেছে। অনেক পরে হলেও এ দেশে এটা চিন্তা করা হচ্ছে। এসব বাস্তবায়ন করা গেলে ঢাকা শহরের অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটবে।

ভূমি পুনঃউন্নয়ন :সিঙ্গাপুর, জাপান, কোরিয়াসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ভূমি পুনঃউন্নয়ন কর্মপন্থা বাস্তবায়ন করে পুরনো শহরগুলোকে আধুনিক শহরে রূপান্তর করা হয়েছে। অকার্যকর ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ঘনত্ব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সুবিধাদির কারণে শহরের অনেক অংশই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজধানীর এ রকম নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ অংশে পুনঃউন্নয়ন প্রক্রিয়া সম্পাদন করলে তা সমগ্র শহরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় নির্দিষ্ট এলাকার কয়েকটি বেসরকারি পল্গটকে এক করে নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এ প্রক্রিয়া শেষে কর্তৃপক্ষ প্রতিটি বেসরকারি পল্গটের মালিককে নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনার নির্দিষ্ট অংশের ভাগ দেয় যা পূর্ববতী পল্গটের সমতুল্য।

ভূমি পুনর্বিন্যাস :ভূমি পুনর্বিন্যাস কর্মপন্থার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের একত্র করে সড়ক, উন্মুক্ত স্থান, পুকুর, ডোবা, খেলার মাঠসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা সৃষ্টি করা হবে। এতে বাসযোগ্য, সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বিনিময়ে সামান্য পরিমাণ জমি ছেড়ে দিতে হবে মালিকদের। এটা সরকারি বা বেসরকারি উভয় উপায়েই হতে পারবে। সমগ্র পরিকল্পনা প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন শেষে সরকার চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি ভূমির মালিককে ভূমির খ াংশ দেবে- যা আগের তুলনায় কিছুটা কম ও পূর্ববর্তী ভূমির খ াংশের তুলনায় আকারে ছোট হবে।

উন্নয়ন সাধন ফি :উন্নয়ন সাধন ফি হচ্ছে সরকার আরোপিত এক ধরনের রাজস্ব। কোনো এলাকায় সরকারি বিপুল বিনিয়োগের ফলে সেখানকার মূল্য অনেকগুণ বেড়ে গেলে এটা ধার্য করা হয়। এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হলে সরকার পরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিতে পারবে। যেমন- কোনো এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বা জনসাধারণের জন্য বিভিন্ন অবকাঠামো (লেক, রাস্তা, ব্রিজ) নির্মাণের ফলে যেসব জমির মূল্য আগের চেয়ে বেড়েছে, সেসব জমির ওপর আরোপিত কর। উন্নয়ন সাধন ফি বা করারোপের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে যে নির্মাণ ব্যয় হয়, তার অংশবিশেষ উদ্ধার করা হয়ে থাকে। এ পন্থায় অতি সম্পদের মালিকদের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি আদায় করা যাবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, যা সরকার অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রমে ব্যবহার করতে পারবে।

ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন : ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়ন কর্মপন্থা হচ্ছে মেট্রোরেল বা এ ধরনের স্টেশনগুলোকে পরিকল্পিতভাবে অপেক্ষাকৃত লাভজনক কাজে ব্যবহার করা। যেখান থেকে কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো সম্ভব। গণপরিবহন জনসাধারণের রাইডার ব্যবহার বাড়িয়ে এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে যাতায়াতের সুবিধা দেয়। এভাবে ট্রানজিট স্টেশন বা স্টেশনকে কেন্দ্র করে বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়ন করা সম্ভব।

উন্নয়ন স্বত্ব প্রতিস্থাপন : উন্নয়ন স্বত্ব প্রতিস্থাপন পন্থার মাধ্যমে জনস্বার্থে ব্যবহূত ভূমির ক্ষতিগ্রস্ত মালিকরা ক্ষতিপূরণ পাবেন। যেমন- উন্মুক্ত স্থান, কৃষি জমি, বন্যাপ্রবাহ এলাকা, পরিবেশগত সংবেদনশীল এলাকা অথবা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যেখানে সাধারণভাবে উন্নয়ন প্রক্রিয়া অনুমোদিত নয় বা সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত, এমন স্থানের ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের অন্যখানে জমি দেওয়া হবে। এ উন্নয়ন স্বত্ব গ্রহণকারী নতুন স্থানে তার বিদ্যমান স্থাপনার চেয়ে উঁচু স্থাপনা তৈরি করতে পারবেন।

এ বিষয়ে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, রাজউকের সংশোধিত ড্যাপে ভূমি পুনঃউন্নয়ন, ভূমি পুনর্বিন্যাসসহ কিছু নতুন কর্মপন্থা রাখা হয়েছে বলে জেনেছি। ঢাকা শহরকে বাঁচাতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বের অনেক দেশ এসব কর্মপন্থা বাস্তবায়ন করে ঘিঞ্জি জনপদে আধুনিক শহর গড়ে তুলেছে। ঢাকাকেও সেভাবে উন্নত করা সম্ভব।

এ ছাড়াও রাজউকের সংশোধিত ড্যাপে জনবান্ধব আরও কিছু কর্মপরিকল্পনা থাকছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ড্যাপ গেজেট আকারে প্রকাশ হওয়ার পর মেট্রোপলিটন এলাকার উন্নয়নমূলক কাজে জড়িত সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এবং পেশাজীবীদের সঙ্গে রাজউক সমন্বয় সভা করবে। ওই সভায় ড্যাপের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও করণীয় উপস্থাপন করা হবে। ড্যাপের পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি-না অথবা বাস্তবায়নকারী সংস্থার চিন্তা-ভাবনা বোঝার জন্য প্রতি ছয় মাস অন্তর ড্যাপ রিভিউ সভা হবে। এসব সভায় সুপারিশগুলোর পরিমার্জন বা পরিবর্ধন লাগবে কি-না সে ব্যাপারে যৌক্তিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। এই ড্যাপ প্রতি পাঁচ বছর অন্তর হালনাগাদ করা হবে। ড্যাপভীতি দূর করতে এর গেজেট ও ম্যাপ রাজউকের আওতাধীন এলাকার সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা বরাবর পাঠানো হবে। এ ছাড়া ড্যাপের পরিকল্পনা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হবে।

বিষয় : ঢাকা রাজউক ড্যাপ