কার গাড়িতে কে চড়ে

প্রকাশ: ২২ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

অমিতোষ পাল

সমবায় অধিদপ্তরের গাড়ি ব্যবহারে নিয়মকানুনের বালাই নেই। যিনি গাড়ি পাওয়ার প্রাধিকারভুক্ত নন, তিনিও ব্যবহার করছেন বিলাসবহুল জিপ। আবার যার গাড়ি পাওয়ার কথা, তিনি গাড়িই পাচ্ছেন না। শীর্ষ কর্মকর্তার মা ও স্ত্রী ব্যবহার করছেন অধিদপ্তরের গাড়ি। মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের খুশি করতে গিয়ে অধিদপ্তরের গাড়িও মন্ত্রণালয়ে দিয়ে রাখা হচ্ছে। এক জেলার গাড়ি ব্যবহার হচ্ছে আরেক জেলায়। ব্যক্তিগত ভ্রমণেও ব্যবহার হচ্ছে অধিদপ্তরের গাড়ি। এ রকম নানা অনিয়ম চলছে সমবায় অধিদপ্তরের গাড়ি নিয়ে। আর এসব গাড়ির চালক ও জ্বালানির ব্যয় নির্বাহ করছে অধিদপ্তর।

এসব প্রসঙ্গে সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালকের পদ থেকে গত ২০ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পদে পদায়ন হওয়া আব্দুল মজিদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অধিদপ্তরের গাড়ির বিষয়ে তদারকির দায়িত্ব পালনকারী অধিদপ্তরের উপনিবন্ধক নূর মোহাম্মদ মামুন বলেন, সব বিষয় তার জানা নেই। মহাপরিচালক চাইলে এক জেলার গাড়ি আরেক জেলায় দিতে পারেন।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, শীর্ষ দু-একজন কর্মকর্তা যে কোনো ছুটিতেই বিভিন্ন স্থান ভ্রমণে যান। তখন আত্মীয়-স্বজন সঙ্গে নিয়ে যান। বিশেষ করে শুক্র-শনিবার ভ্রমণের ঘটনা বেশি ঘটে। গত ২১ এপ্রিল আত্মীয়-স্বজন নিয়ে রাঙামাটির সাজেকে যান এক শীর্ষ কর্মকর্তা। তিনি গত ২৬ এপ্রিল নাটোর-রাজশাহী ভ্রমণে যান। গত ঈদুল আজহার আগের দিন পুরো পরিবার নিয়ে নীলফামারী-পঞ্চগড় যান ওই কর্মকর্তা। শীর্ষ এক কর্মকর্তার স্ত্রী একটি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি। তাকে সমবায় অধিদপ্তরের পাবনা-১১-০০৫১ নম্বরের গাড়িটি ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে।

বরিশাল ক-২৬ নম্বর গাড়িটি বরিশালের জেলা সমবায় কর্মকর্তার জন্য বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও সেটা দেওয়া হয়েছে বগুড়ায়। এটা সাবেক নিবন্ধক ও মহাপরিচালক আব্দুল মজিদের মা ব্যবহার করছেন বলে সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাই দেখে এসেছেন বলে জানান একাধিক কর্মকর্তা। অথচ বরিশালের জেলা সমবায় কর্মকর্তার কোনো গাড়ি নেই।

জানা গেছে, সাবেক সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক আব্দুল মজিদের নামে একটি প্রাইভেটকার বরাদ্দ ছিল। তিনি সেই প্রাইভেটকারটি ব্যবহার করতেন। পাশাপাশি রংপুর ঘ-১১-০০৮৯ নম্বরের জিপটিও ব্যবহার করতেন। কুমিল্লা-১১-০১০৭ নম্বর গাড়িটি কুমিল্লায় ব্যবহারের কথা থাকলেও ব্যবহার করছেন যশোর জেলা সমবায় কর্মকর্তা মঞ্জুর হোসেন। নোয়াখালী ঘ-১১০০৬২ নম্বর জিপটি অতিরিক্ত নিবন্ধকের নামে বরাদ্দ থাকলেও সেটা বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে দিয়ে রাখা হয়েছে। কক্সবাজার ঘ-১১০০৫১ নম্বর জিপটি অফিসের সবার ব্যবহারের কথা থাকলেও সেটা একাই ব্যবহার

করছেন অতিরিক্ত নিবন্ধক আহসান কবীর। এ প্রসঙ্গে আহসান কবীর বলেন, গাড়িটি অন্যদের পাশাপাশি তিনিও ব্যবহার করেন।

ফরিদপুর ঘ-১১-০০৫২ জিপটি যুগ্ম নিবন্ধক রুহুল আমিন ও উপনিবন্ধক মৃণাল কান্তি বিশ্বাসের অফিসে যাতায়াতের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেটা মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। আর যুগ্ম নিবন্ধক অঞ্জন কুমার সরকার ও উপ-নিবন্ধক নূর মোহাম্মদ মামুনের জন্য বরাদ্দ করা ঢাকা মেট্রো ঘ-১৫-১৬৪৬ নম্বর জিপটি ব্যবহার করেন ঢাকার যুগ্ম নিবন্ধক রুহুল আমিন। এ প্রসঙ্গে রুহুল আমিন সমকালকে বলেন, গাড়িটি তিনি একা ব্যবহার করেন না। অফিসের আরও লোক ব্যবহার করেন। তবে তার নামেই গাড়িটি বরাদ্দ। আর বরাদ্দের কাজটি দেখেন উপনিবন্ধক নূর মোহাম্মদ মামুন। তিনি এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। নূর মোহাম্মদ বলেন, তিনি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি দেখেন। বরাদ্দ দেওয়ার দায়িত্ব তার নয়। এটা মহাপরিচালক ও আরেকজন দেখেন।

সহকারী নিবন্ধক গোলাম কিবরিয়া ও উপ-নিবন্ধক কাজী মেজবাহ উদ্দিন আহমেদের যাতায়াতের জন্য বরাদ্দ করা সিলেট ঘ-১১-০২৭০ নম্বর জিপটি মন্ত্রণালয়ে দিয়ে রাখা হয়েছে। আর উপনিবন্ধক মোহাম্মদ হাফিজুল হায়দার চৌধুরী ও সহকারী নিবন্ধক শরিফ উল ইসলামের যাতায়াতের জন্য বরাদ্দ দেওয়া গাড়িটির কোনো হদিসই নেই।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, সাবেক অতিরিক্ত নিবন্ধক মোমিনুল হক তালুকদার অবসরকালীন ছুটিতে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন অধিদপ্তরের গাড়ি ব্যবহার করেছেন। অধিদপ্তরের প্রভাবশালী কর্মকর্তা হওয়ার কারণে তাকে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এমনকি অবসরে যাওয়ার পরও তার আচরণ ছিল তিনি যেন অধিদপ্তরেরই কর্মকর্তা। বর্তমানেও তিনি প্রায় নিয়মিতই অধিদপ্তরে যাতায়াত করেন। এ প্রসঙ্গে মোমিনুল হক তালুকদার বলেন, অবসরে যাওয়ার পর কেন আমাকে গাড়ি দেবে। অবসরকালীন ছুটিতে যাওয়ার পর কিছু দিন বিভিন্ন স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য অধিদপ্তরে মাঝেমধ্যে গিয়েছেন। এখন আর তেমন যান না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, নিয়ম অনুযায়ী গাড়িগুলোতে ভিআইপি হর্ন সংযোজনের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু কয়েকটি মাইক্রোবাস ছাড়া প্রতিটি গাড়িতেই ভিআইপি হর্ন লাগানো হয়েছে। কর্মকর্তারা নিজের মতো করে এসব সংযোজন করেছেন, যাতে রাস্তা দিয়ে চলার সময় ভিআইপি মুডে তারা চলাফেরা করতে পারেন।

বিষয় : কার গাড়িতে কে চড়ে