নজিরবিহীন আদেশ জনপ্রশাসনে

বদলির পরও পদোন্নতির আদেশে আগের পদ

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

দেলওয়ার হোসেন

জনপ্রশাসনে ডিসি পদে বদলি নিয়ে তুঘলকি কাণ্ড ঘটেছে। গত ১১ জুন ১৩ জেলার জেলা প্রশাসককে (ডিসি) সরিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে উপসচিব পদে বদলি করে সরকার। এর ছয় দিন পর ১৬ জুন যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতির আদেশে তাদের আগের পদেই (ডিসি) বহাল রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতির আদেশে বদলি আদেশাধীন পদের কথা উল্লেখ করার কথা ছিল। কিন্তু সেটা না করে ওই আদেশে বদলির আগের পদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। আবার বদলির আদেশ বহাল থাকার পরও ওই কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পর ডিসি হিসেবেই ইনসিটু (আগের পদে বহাল) করা হয়েছে। এটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা বলে উল্লেখ করে প্রশাসনের কেউ কেউ। এ নিয়ে জনমনেও সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের বিভ্রান্তি। প্রশাসন-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, দক্ষতা উন্নয়নে সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিলেও তার সুফল সত্যিকার অর্থে কর্মকর্তারা কতটুকু পাচ্ছেন, তা ভেবে দেখা দরকার। কারণ খোদ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে এ ধরনের বিভ্রান্তি দেখা দিলেও অন্যরা কী করবেন- এমন প্রশ্নও রেখেছেন তারা।

জনপ্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ জুনের এক আদেশে নারায়ণগঞ্জের ডিসি রাব্বী মিয়াকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব পদে, গোপালগঞ্জের ডিসি মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান সরকার ও মুন্সীগঞ্জের ডিসি শায়লা ফারজানাকে স্থানীয় সরকার বিভাগে, ফরিদপুরের ডিসি উম্মে সালমা তানজিয়াকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে, সিরাজগঞ্জের ডিসি কামরুন নাহার সিদ্দিকাকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে, বাগেরহাটের ডিসি তপন কুমার বিশ্বাসকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে, মৌলভীবাজারের ডিসি মো. তোফায়েল আহমেদ ও রংপুরের ডিসি এনামুল হাবিবকে জননিরাপত্তা বিভাগে, রাজশাহীর ডিসি এস এম আবদুল কাদেরকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে, রাজবাড়ীর ডিসি মো. শওকত আলীকে সুরক্ষা সেবা বিভাগে, যশোরের ডিসি মো. আব্দুল আওয়াল, ময়মনসিংহের ডিসি ড. সুভাস চন্দ্র বিশ্বাস এবং গাজীপুরের ডিসি ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীরকে বিসিএস প্রশাসন একাডেমির পরিচালক পদে বদলি করা হয়। বদলির পর অনেকেই তাদের কর্মস্থল থেকেও বিদায় সংবর্ধনা নেন। ঠিক এর ৬ দিনের মাথায় তাদের যুগ্মসচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হলে ওই আদেশে তাদের কর্মস্থল ডিসি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। নিয়ম মোতাবেক তাদের পদোন্নতির আদেশে বদলি হওয়া পদের কথা উল্লেখ করার কথা ছিল। এদিকে, পদোন্নতির পর ওই কর্মকর্তাদের আবার ডিসি হিসেবে পদায়ন করা হয়। যেটা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। কারণ আগের বদলির আদেশ বহাল থাকার পরও কীভাবে তাদের পদোন্নতির আদেশে পূর্বের পদের কথা উল্লেখ এবং একই পদে পদায়ন করা হলো, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আদেশে স্বাক্ষরিত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. তমিজুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, এ আদেশ নিয়ে যে একটা বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হবে, সেটা আমরা আগেই জানতাম। এ জন্য সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই এ আদেশ দেওয়া হয়েছে। বদলির পর তারা যে যোগদান করেননি, সেটাও কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হয়েছে। ফলে তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বদলি হওয়ার পর যোগদান না করায় পদোন্নতির সময় তাদের ডিসি হিসেবে কর্মরত দেখানো হয়। তিনি আরও বলেন, পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বদলির পর সংশ্নিষ্ট দপ্তরে যোগদান না করায় তাদের বদলির আদেশ কার্যকর হয়নি। এর মধ্যে তাদের পদোন্নতি হয়ে গেছে। ফলে পদোন্নতির পর স্ব স্ব জেলায় ডিসি পদে তাদের ইনসিটু পদায়ন করা হয়েছে। আর আগের মন্ত্রণালয় ও বিভাগে তাদের যুগ্মসচিব হিসেবে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে।

১১ জুন জারিকৃত আদেশে বলা হয়, জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। এর পরও সেই আদেশ এখনও কার্যকর করা হয়নি। অথচ সরকারের কোনো আদেশ জারির পর তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর করতে হয়। আর পরবর্তী কোনো আদেশ সর্বশেষ আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ সার্ভিস রুলের ৮১ ধারায় বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয় বা বিভাগের বদলি আদেশের পর নতুন কর্মস্থলে যোগদানের প্রস্তুতির জন্য একজন কর্মকর্তা সর্বোচ্চ ছয় দিন সময় পাবেন। তবে একই শহরে বদলির আদেশ হলে প্রস্তুতির কোনো সময় পাবেন না।

এদিকে, সংশ্নিষ্টরা ডিসি পদ ছেড়ে বদলিকৃত দপ্তরে যোগদান না করায় যুগ্মসচিব পদে পদান্নতির পর তাদের ডিসি পদে ইনসিটু হিসেবে (নিচের পদে) পদায়ন করা হয়েছে। কারণ, ডিসি পদটি হলো উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের। ফলে ইনসিটু হিসেবে পদায়ন না করলে পদোন্নতির পর তাদের কোনো কাজই বৈধতা পেত না। তবে একই সঙ্গে তাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যুগ্মসচিব হিসেবেও পদায়ন করা হয়েছে।

এমন বদলি আদেশের ফলে ১৩ জেলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) বদলি হওয়ার ১৩ দিন পরও সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যোগদান করেননি। ফলে নতুন নিয়োগ পাওয়া ডিসিরাও তাদের কর্মস্থলে যোগদান করতে পারেননি। অথচ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২৩ জুনের মধ্যে প্রত্যেক কর্মকর্তাকে তাদের পুরাতন কর্মস্থল ছেড়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরও আজ শেষদিন পর্যন্ত ১৩ ডিসির কেউই রিলিজ না করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনাও অমান্য করছেন। এতে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের রদবদলের ক্ষেত্রে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈরাজ্য তৈরি হচ্ছে। যদিও বিভিন্ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে পদায়নের ক্ষেত্রে এ ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে ঘটে আসছে।

গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর চাঁদপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসককে বদলি করার ১২ দিন পর আবার সেই জেলার ডিসি হিসেবেই বহাল রাখা হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক অতুল সরকারকে জয়পুরহাট এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কাজী আবেদ হোসেনকে ঠাকুরগাঁওয়ের ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সেই আদেশটিও বাতিল করা হয়। ফলে এবারের এমন আদেশে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এর মধ্যে নওগাঁ থেকে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক হিসেবে বদলি হওয়া কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান গত ১৫ জুন ১৫ দিনের জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণে গেছেন। এতে তার রিলিজ ও নিয়োগ নিয়ে দুই জেলাতেই জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। ঝালকাঠি থেকে রাজশাহী জেলায় জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. হামিদুল হক সমকালকে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরও দেরি আছে। হলে জানতে পারবেন।

লালমনিরহাট থেকে যশোরে নিয়োগ পাওয়া মোহাম্মদ শফিউল আরিফ বলেন, সোমবার যশোর যাব, মঙ্গলবারে যোগদান করব। এরপর আগের ডিসি রিলিজ করতে সময় লাগলে কয়েকদিন যশোরে ঘোরাঘুরি করব। তবে যোগদান নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, যশোরের বর্তমান ডিসির অধীনে আমি আগেও কাজ করেছি।

যশোরের ডিসি মো. আব্দুল আওয়াল বলেন, নতুন জেলা প্রশাসক এলেই আমি রিলিজ হবো।

বিষয়টি জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, সরকারের যে কোনো আদেশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর করা উচিত। আদেশ জারির সময়ও বলা হয়, জনস্বার্থে জারিকৃত আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে। এটি অমান্য করা কাঙ্ক্ষিত নয়।