ডেঙ্গু আতঙ্ক

আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাজবংশী রায়

মশার কামড়ের ভয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিকল্পনা কমিশনের কার্যালয়ে না গিয়ে সচিবালয়ে অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের এমন তথ্য জানিয়ে তিনি বলেছেন, আগারগাঁওয়ে মশার প্রকোপ বেশি। আগে দুইবার তাকে কামড়ও দিয়েছে। প্রথমবার চিকুনগুনিয়া, পরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এ জন্যই আপাতত তিনি ওই এলাকায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

অর্থমন্ত্রীর মতো ডেঙ্গু নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দিনের পর দিন বাড়ছে। গত বছর এই সময়ে দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল চিকুনগুনিয়া। এবার ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু। প্রতিদিনই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ও মৃতের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার ১২৮ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত ২২ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরে গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত আট হাজার ৬৩৬ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৬৪৮ জন রাজধানীসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতাল ছেড়েছেন ৬ হাজার ৯৭৮ জন। জুন ও জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। জুনে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৭০ জন। আর চলতি মাসে গত শুক্রবার পর্যন্ত ৩ হাজার ৫৩২ জন আক্রান্তের খবর মিলেছে।

এরপরও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কের কিছু দেখছেন না। সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে মেয়র বলেছিলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে। ডেঙ্গু নিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়াতে সাংবাদিকদের প্রতি তিনি আহ্বানও জানান।

এদিকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেরও দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম এতদিন ছিল না। এমনকি দুই সিটিতেই মশা নিধনের জন্য কেনা ওষুধের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ওই ওষুধ প্রয়োগের পরও মশা নিধন হচ্ছে না। এ কারণেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তবে গতকাল মেয়র আতিকুল ইসলাম ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। সেখান থেকেই তিনি উত্তর সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিলের ঘোষণা দেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম এ পর্যন্ত চোখে পড়েনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্নিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা ডেঙ্গু সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিলেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক নিশ্চুপ রয়েছেন। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশ নিলেও মন্ত্রী ডেঙ্গুর বিষয়ে কোনো কথা বলেননি।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক ব্যাধি শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আমরা আগেভাগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেছি। সেখানে সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করেছেন। এরপরও পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। এখনও প্রতিদিন কোনো না কোনো সভা-সেমিনার করছি। চেষ্টা করছি যত দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

এবার ডেঙ্গুর ধরন উদ্বেগজনক :ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা একে উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ জানান, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে এবার ডেঙ্গু জ্বরকে ব্যতিক্রমী বলে মনে হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মস্তিস্ক, হৃদযন্ত্র, যকৃৎ ও কিডনির মতো নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হচ্ছে। জ্বর সেরে যাওয়ার পরও অনেক রোগীর অবস্থার অবনতি হয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেও অনেকে আবারও অসুস্থ হচ্ছেন।

ডেঙ্গু আক্রান্তদের ফলোআপে থাকার পরামর্শ দিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, জ্বর হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসককর কাছে যেতে হবে। জ্বর থেকে সুস্থ হওয়ার পরও কিছুদিন চিকিৎসকের পরামর্শে থাকতে হবে। গর্ভবতী, শিশু, বৃদ্ধ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও লিভারের রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ডেঙ্গুর লক্ষণ তুলে ধরে ডা. আব্দুল্লাহ আরও বলেন, জ্বর না কমে আরও খারাপের দিকে যাওয়া, বমি হওয়া, পেটে তীব্র ব্যথা, রক্তক্ষরণ, মাথাব্যথা, চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়া, নিদ্রাহীনতা ও আচরণের আকস্মিক পরিবর্তন ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ। ডেঙ্গু মোকাবেলায় সচেতন হতে হবে। বাসাবাড়ি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

হাসপাতালে রোগী আর রোগী :ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ও ভর্তি থাকা মানুষের তালিকায় দেখা যায়, ডেঙ্গু কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এ পর্যন্ত ৬৮০ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৪৬ জন এখনও চিকিৎসাধীন। মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩০৯ জনের মধ্যে ১৪১ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ১৬৮ জনের মধ্যে ৩৯ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৩৭৮ জনের মধ্যে ৮৫ জন, হলিফ্যামিলি হাসপাতালে ৩৯০ জনের মধ্যে ৭৩ জন, বারডেম হাসপাতালে ৮৬ জনের মধ্যে ১৭ জন, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ১০৪ জনের মধ্যে ১৩ জন, মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ১১৫ জনের মধ্যে ৫০ জন, পিলখানা বিজিবি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ২২ জন এখনও চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ১৪১ জন এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ১৬ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি ৫৭৫ জন সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এখনও ৮০ রোগী সেখানে ভর্তি রয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ২৫৪ জনের মধ্যে ৫০ জন, ইবনে সিনা হাসপাতালে ১৯৯ জনের মধ্যে ২৬ জন, স্কয়ার হাসপাতালে ২৭৩ জনের মধ্যে ৪ জন, গ্রিন লাইফ হাসপাতালে ৫৩ জনের মধ্যে ৩৫ জন, ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে ৩৭৮ জনের মধ্যে ৫৪ জন, ইউনাইটেড হাসপাতালে ১৪৩ জনের মধ্যে ১৫ জন, খিদমা হাসপাতালে ৭৫ জনের মধ্যে ১২ জন, সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৫৪ জনের মধ্যে ৩৭ জন, অ্যাপোলো হাসপাতালে ১৪৩ জনের মধ্যে ২৬ জন, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৮৬ জনের মধ্যে ২৭ জন, বিআরবি হাসপাতালে ৫৫ জনের মধ্যে ১৪ জন, আজগর আলী হাসপাতালে ১৫৯ জনের মধ্যে ৩৩ জন, উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৭৯ জনের মধ্যে ১২ জন, সালাউদ্দিন হাসপাতালে ২০০ জনের মধ্যে ২৯ জন, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ১৭১ জনের মধ্যে ২০ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ২৩ জন, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ৪০ জন, শমরিতা হাসপাতালে চার রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

ঢাকার বাইরেও আতঙ্ক :ডেঙ্গু এবার ঢাকার বাইরেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর, নারায়ণঞ্জসহ সাভার, কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জেও ডেঙ্গু আতঙ্ক বাড়ছে। এসব জেলা ও শহরগুলোয় এ পর্যন্ত ২৬ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর মিলেছে। এ ছাড়া খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ১৭ জন এবং চট্টগ্রামে আটজনের এ পর্যন্ত আক্রান্ত হওয়ার খবর মিলেছে।

সংশ্নিষ্টরা বলেছেন, এর বাইরেও রাজধানীসহ সারাদেশে অনেক হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন। নির্দিষ্ট কয়েকটি হাসপাতালের তথ্য দিয়ে রোগীর যে সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে, বাস্তবে রোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি হবে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সব হাসপাতালে নির্দিষ্ট ফরম পাঠানো হয়েছে। হাসপাতাল থেকে পাঠানো রোগীর তালিকা ধরেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা নিরূপণ করা হয়েছে। এতে কোনো সমস্যা নেই।

মৃত্যুর সঠিক হিসাব নেই :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় বলা হয়েছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে স্কয়ার, বিআরবি, ইবনে সিনা, আসগর আলী, অ্যাপোলো হাসপাতালে একজন করে মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া এই রোগে এ পর্যন্ত ২২ জনের মৃত্যুর খবর বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী ও ঢাকা শিশু হাসপাতালে দু'জন, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চারজন, ল্যাবএইড হাসপাতালে একজন, গ্রিন লাইফ হাসপাতালে তিনজন, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে দু'জন, ইউনাইটেড হাসপাতালে একজন, স্কয়ার হাসপাতালে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি তালিকায় শুধু স্কয়ার হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের মৃত্যুর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু পর্যালোচনা কমিটি ৯টি মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। তাদের মধ্যে পাঁচটি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে। অন্য চারটি মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ডেঙ্গুর ইতিহাস :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু রোগ দেশে ২০০০ সালে প্রথম দেখা যায়। ওই বছর এতে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। পরপর দুই বছর আতঙ্ক ছড়ালেও তৃতীয় বছর থেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার কমতে থাকে। কয়েক বছর পর মৃত্যু শূন্যের কোটায় নেমে আসে। গত বছর থেকে আবারও ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা যায়। তবে চিকুনগুনিয়ার দাপটে ডেঙ্গু তেমন আলোচনায় আসেনি। এরপরও ডেঙ্গুতে গত বছর ২৬ জনের মৃত্যু হয়।