বড় সংস্কার আসছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে

দীর্ঘদিন বিদেশে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের আনা হবে দেশে, মহাপরিচালক পদমর্যাদায় উন্নীত হচ্ছেন ১৮ জন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাশেদ মেহেদী

ফাইল ছবি

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বড় সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান আবাসিক প্রতিনিধিসহ বিদেশে বিভিন্ন মিশনে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মরত রাষ্ট্রদূতদের দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। সেইসঙ্গে দীর্ঘদিন মন্ত্রণালয়ে কাজ করা কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিদেশে বিভিন্ন মিশনে পাঠানো হচ্ছে। এর বাইরে ১৮ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়ে মহাপরিচালক পদমর্যাদায় উন্নীত করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, গত দশ বছরের মধ্যে এটাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বড় ধরনের বদলি ও পদোন্নতির কার্যক্রম। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এ ব্যাপারে গতকাল সোমবার সমকালকে জানিয়েছেন, এটা নিয়মিত কার্যক্রমেরই অংশ। বিদেশে অনেকেই বিভিন্ন মিশনে পাঁচ বছর থেকে দশ বছর কর্মরত আছেন। তাদের দেশে এনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। তরুণ কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা বাড়ানো হচ্ছে। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে এ কার্যক্রম শেষ হবে বলে তিনি জানান।

যাদের বদলি চূড়ান্ত :সূত্র জানায়, সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেনকে ঢাকায় বদলি করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (এশিয়া-প্যাসিফিক) পদে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর বর্তমানে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমাকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি করা হচ্ছে।

মাসুদ বিন মোমেন ২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন। জাপান ও ইতালিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৫ সালে তিনি জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। অন্যদিকে রাবাব ফাতিমা ২০১৬ সাল থেকে জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি প্রায় দশ বছর লিয়েনে কমনওয়েলথ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থায় কর্মরত ছিলেন।

চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল করিমকে বদলি করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন ফরেন সার্ভিস একাডেমির প্রিন্সিপাল পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তার জায়গায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (এশিয়া-প্যাসিফিক) মাহবুবুজ্জামানকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

ফজলুল করিম ২০১৪ সাল থেকে চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। এর আগে তিনি মেক্সিকো, জর্ডান, সৌদি আরব এবং ইতালিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। মাহবুবুজ্জামান এর আগে কানাডা, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড ও জাপানে বিভিন্ন মিশনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ছয় মাস আগে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (এশিয়া-প্যাসিফিক) হিসেবে দায়িত্ব পান।

বেলজিয়ামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শাহাদাত হোসেনকে বদলি করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপাক্ষিক) করা হচ্ছে। অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব (দ্বিপাক্ষিক ও কনস্যুলার) কামরুল আহসানকে বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা হচ্ছে। শাহাদাত হোসেনও প্রায় ১৩ বছর ধরে দেশের বাইরে বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। কামরুল আহসান এর আগে লন্ডন, বেইজিং, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ মিশনে গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং দুবাইতে কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সূত্র জানায়, এর বাইরে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়া অঞ্চলের আরও প্রায় দশটি দেশে বিভিন্ন মিশনে যারা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্বে রয়েছেন তাদের পর্যায়ক্রমে বদলির সিদ্ধান্ত রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী একটি কর্মস্থলে তিন বছর থাকার কথা। কিন্তু গত দশ বছরে কয়েকজন কর্মকর্তাই তিন বছরের স্থলে পাঁচ বছর বা বেশি সময় একই কর্মস্থলে থেকেছেন। অনেক কর্মকর্তা এক যুগেরও বেশি সময় আগে দেশের বাইরে মিশনে গিয়ে বিদেশেই বিভিন্ন মিশনে বদলি হয়েছেন। এ ছাড়া যোগ্যতা বিচারের ক্ষেত্রেও নানা অনিয়ম-অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে চাপা অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। তবে এর আগে এই অসন্তোষ দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং কয়েকজন কর্মকর্তাকেই বারবার বিদেশে বিভিন্ন মিশনে বদলি করা হয়েছে। এবার বদলি ও পদোন্নতিতে সংস্কারের উদ্যোগের কারণে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ দূর হয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে আরও গতিশীলতা আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, যারা দীর্ঘ সময় ধরে দেশের বাইরে বিভিন্ন মিশনে কর্মরত আছেন তারা তাদের কাজের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত যোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন। এখন তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দেশে এসে তারা যেন কাজে লাগাতে পারেন সে জন্যই তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়ে এসে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে দেওয়া হচ্ছে। আবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত যোগ্য কর্মকর্তাদের বিদেশে বিভিন্ন মিশনে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এটা নিয়মিত কার্যক্রমেরই অংশ, বিশেষ কিছু নয়। তিনি আরও জানান, পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৮ জন কর্মকর্তাকে মহাপরিচালক পদমর্যাদায় উন্নীত করা হচ্ছে। তারা সবাই হয়তো মহাপরিচালক হিসেবে এখনই দায়িত্ব পাবেন না; কিন্তু সমমর্যাদায় দায়িত্বে থাকবেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বাণিজ্য কূটনীতিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর বিষয়টিও চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকা থেকে এমিরেটসের ফ্লাইটের ভাড়া অনেক বেশি হওয়ায় আমিরাতের কোম্পানিগুলো শ্রীলংকা এবং নেপাল থেকে শ্রমিক নিতে বেশি আগ্রহী। এ কারণে আমিরাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।