খতিয়ান বইয়ের পাতা ছিঁড়ে খাস জমি দখল

কুড়িগ্রামে ৮০.৫৭ একর হাতছাড়া

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

হকিকত জাহান হকি

খতিয়ান বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলে বেহাত করা হয়েছে ৮০.৫৭ একর খাস জমি। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা উঠে এসেছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষায়। এ ঘটনায় বিস্মিত খোদ ভূমিমন্ত্রী।

জমি বেদখলের জন্য জালজালিয়াতির এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভূমি অফিসের কর্মকর্তা ঘুষের বিনিময়ে বিভিন্ন সময় খতিয়ান বইয়ের (আরওআর) মূল পাতা ছিঁড়ে ফেলেছেন। সেখানে ভুয়া পাতা লাগিয়ে খাস খতিয়ানভুক্ত দাগগুলো অন্তর্ভুক্ত করে স্থানীয় অসাধু ব্যক্তিদের নামে আলাদা সাতটি খতিয়ান ও হোল্ডিং খুলে দিয়েছেন। এভাবে বেহাত হয়েছে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার সদর ইউনিয়ন শাখাহাতী মৌজার মোট ৮০.৫৭ একর জমি।

ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ সমকালকে বলেন, সরকারের খাস জমি দখলের কোনো সুযোগ নেই। যারা এ অপকর্ম করছেন, তাদের কোনো না কোনো সময় কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। আইন অনুযায়ী সরকারের জমি সরকারের কাছে ফেরত দিতে হবে। ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত ওই ৮০.৫৭ একর খাস জমি উদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা দল চিলমারী সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম নিরীক্ষার সময় খতিয়ান বই ছিঁড়ে নতুন করে লাগানো পাতা দেখতে পান। নিরীক্ষকরা তখন অনলাইনে আপলোড করা সন্দেহজনক এসব খতিয়ান যাচাই করেন। এভাবে তারা জমি-সংক্রান্ত তথ্যে গরমিল খুঁজে পান।

খাস খতিয়ানভুক্ত এসব জমি উদ্ধার করে সরকারের দখল ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকারি জমি উদ্ধারে প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে সরকারি জমি বেহাত ও আত্মসাতের প্রবণতা কমে আসে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা থেকে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের চিলমারী সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা মো. নুরুল আমিন সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে এই জালিয়াতি করেছেন। তিনি ইউনিয়ন ও উপজেলা ভূমি অফিসে রক্ষিত খতিয়ান (আরওআর) বইয়ের মূল পাতা ছিঁড়ে কম্পিউটারে কম্পোজ করে আঠা দিয়ে ভুয়া খতিয়ান পাতায় সাঁটিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় শাখাহাতী মৌজার আর এস রেকর্ডকৃত ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি খাস জমি স্থানীয় অসাধু ব্যক্তিদের খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে অবৈধভাবে খতিয়ান সৃষ্টি ও হোল্ডিং খুলে ৮০.৫৭ একর খাস জমি বেহাত করা হয়েছে। এ ধরনের কার্যকলাপ ফৌজদারি বিধি অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

জালিয়াতি করে খাস জমি বেহাতের অভিযোগে ওই ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. নুরুল আমিনকে এরই মধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরে তাকে জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়। তিনি নাগেশ্বরী সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগদানপত্র জমা দিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। তিনি কোথায় আছেন কেউ তা বলতে পারেন না। তার মোবাইল নম্বর বন্ধ। অনেক চেষ্টা করেও ওই জালিয়াতির ঘটনায় তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

চিলমারী সদর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষায় ২ নং তলববাকী রেজিস্ট্রারের খতিয়ান ও দাগের সঙ্গে খতিয়ান বইয়ের নিরীক্ষায় দেখা যায়, ৯৫, ১০৮, ২২৯, ১৭১, ২৪১, ২৪ এবং ৭১ নং খতিয়ানের পূর্বের ও পরের পাতার খতিয়ানের লেখার ডিজিট ও কালির পরিমাণে মিল নেই। এতে সন্দেহ হওয়ায় এসব খতিয়ান ও অনলাইনে আপলোড করা একই খতিয়ান যাচাই করা হয়। এতে ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও উপজেলা ভূমি অফিসে রক্ষিত খতিয়ান বহির সংশ্নিষ্ট খতিয়ানগুলোর ওপরে উল্লেখ করা দাগগুলোর সঙ্গে অনলাইনের খতিয়ানের দাগ ও জমির পরিমাণের ব্যাপক গরমিল পাওয়া যায়।

সাতটি খতিয়ানে জমি বেহাতের বিবরণ :১. ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষা থেকে জানা যায়, অনলাইনে আপলোড করা ৯৫ নং আর এস খতিয়ানের তিনটি দাগে (নং ২২২৯, ২২৩২ ও ২২৮৫) মোট জমির পরিমাণ ৭.১৭ একর। অথচ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রক্ষিত আরওআর বইয়ের ৯৫ নং খতিয়ানে ছয়টি দাগে দেখানো হয়েছে ১২.১৮ একর জমি। ছয়টি দাগের মধ্যে তিনটি দাগ (নং ২০৭২, ২০৯৪ ও ২০৮২) খতিয়ান থেকে আনা হয়েছে। এগুলোতে খাস জমির পরিমাণ ৫.০১ একর। জালিয়াতি করে ৯৫ নং হোল্ডিং খুলে ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল ০৫৬৪৪১৩ নং দাখিলার মাধ্যমে স্থানীয় হায়দার আলীর কাছ থেকে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করায় সরকারের এই ৫.০১ একর জমি বেহাত হয়।

২. অনলাইনে আপলোড করা ১০৮ নং আর এস খতিয়ানের মূল মালিক স্থানীয় জামাল উদ্দিন ও ছায়দার হোসেন। এ খতিয়ানের একটি দাগে (নং ১৪৮৪) জমির পরিমাণ ৬.৩৫ একর। অথচ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রক্ষিত আরওআর বইয়ের ১০৮ নং খতিয়ানের পাতায় দেখানো হয়েছে তিনটি দাগ (নং ১৪৮৩, ১৪৮২ ও ১৪২১)। এ তিনটি দাগে জমির পরিমাণ ১৫.৩০ একর- যা খাস খতিয়ানভুক্ত। ব্যক্তির নামে ১০৯ নং হোল্ডিং খুলে খাস খতিয়ানভুক্ত এসব জমির অনুকূলে ২০১৭ সালের ১৯ মে, একই বছরের ১৯ জুলাই ও গত বছরের ৭ আগস্ট যথাক্রমে ০৫৬৪৪২৭, ০৫৬৪৪২৮ ও ০৫৬৪৪৩১ নং দাখিলার মাধ্যমে আব্দুল খালেক ও তার দুই ছেলে রাশেদ মিয়া ও আব্দুর রাজ্জাকের কাছ থেকে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা হয়েছে। এভাবে এ জমি বেহাত করা হয়েছে।

অন্যদিকে অনলাইনে আপলোড করা আর এস ১০৮ নং খতিয়ানে ১৪৮৪ দাগের ৬.৩৫ একর জমির মালিক জামাল উদ্দিনের নামেও গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ৪৭৩০৭৯ নং দাখিলা কেটে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা হয়েছে।

৩. অনলাইনে আপলোড করা ২২৯ নং আর এস খতিয়ানের মূল মালিক স্থানীয় রফিকুল ইসলাম। এ খতিয়ানের ২২২৪ নং দাগে জমির পরিমাণ ১.৫৪ একর। অন্যদিকে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রক্ষিত আরওআর বইয়ের ২২৯ নং খতিয়ানে ২২টি দাগে ২৯.১৪ একর জমি দেখানো হয়েছে। এ খতিয়ানের হিসাবে মোট জমি হবে ২৬.৫৭ একর। ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আরওআর বইয়ের ২২৯ নং খতিয়ানে উল্লিখিত দাগগুলো (নং ৬৮৫, ৪৩৮, ৪৩৪, ৫৩৬, ৬৮৪, ৬৩২, ৬৩১, ৬৩০, ৫৩৫, ৫৩৪, ৫৩১, ৫২৯, ৫২৭, ৫২৬, ৫৩৩, ৪২৫, ৪২৯, ৪১৮, ৪১৭, ৫৪২ এবং ৫৪৩) ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত। ২২৯ নং খতিয়ানে উল্লেখ করা খাস দাগগুলো সংযুক্ত করে ব্যক্তিমালিকানার নামে ২৩০ নং হোল্ডিং খুলে গত বছরের ১৭ অক্টোবর ৪৭৩০৮৯ নং দাখিলার মাধ্যমে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা হয়েছে। এতে হাতছাড়া হয়েছে ২৫.০৩ একর সরকারি খাস জমি।

৪. অনলাইনে আপলোড করা ১৭১ নং খতিয়ানের মূল মালিক স্থানীয় বাদশাহ মিয়া। ওই খতিয়ানের ২০৪৯ ও ৬৮৪ নং দাগে জমির পরিমাণ ৬.৭৫ একর। অন্যদিকে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রক্ষিত আরওআর বইয়ের ১৭১ নং খতিয়ানে পাঁচটি দাগে ১১.৫০ একর জমি দেখানো হয়েছে। এগুলোর মধ্যে তিনটি দাগ (নং ৬৮৯, ১৪৭৪ ও ১৪৭৫) ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত। ১৭১ নং খতিয়ানে বর্ণিত খাস দাগগুলো সংযুক্ত করে ব্যক্তিমালিকানার নামে ১৭২ নং হোল্ডিং খুলে ২০১৭ সালের ৩ মে, একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর ও গত বছরের ২১ ডিসেম্বর ভূমি উন্নয়ন কর (দাখিলা নং ০৫৬৪৪০৯, ০৫৬৪৪৩৮, ০৫৬৪৪৪১) আদায় করা হয়েছে। এভাবে আত্মসাৎ করা হয় ৪.৭৫ একর সরকারি খাস জমি।

৫. অনলাইনে আপলোড করা ২৪১ নং আর এস খতিয়ানের মূল মালিক স্থানীয় রুহুল আমিন। ওই খতিয়ানের ১৫০৩ নং দাগে জমির পরিমাণ ১.২৫ একর। অন্যদিকে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রক্ষিত আরওআর বইয়ের ২৪১ নং খতিয়ানে ৯টি দাগে ৬.৮০ একর জমি দেখানো হয়েছে। ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আরওআর বইয়ের ২৪১ নং খতিয়ানের কয়েকটি দাগ (নং ২১৬১, ২১৬২, ২১৬৩, ২০২৮, ২০২৯, ২০০৫, ২০১৭ ও ২০২৫) ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত। ব্যক্তির নামে ২৪১ নং হোল্ডিং খুলে এসব খাস দাগ থেকে ২০১৭ সালের ২০ জুন ০৫৬৪৪১৭ নং দাখিলার মাধ্যমে ভূমি উন্নয়ন কর আদায় করা হয়েছে। এতে ৫.৩৮ একর সরকারি খাস জমি বেহাত হয়েছে।

৬. অনলাইনে আপলোড করা ২৪ নং আর এস খতিয়ানের প্রকৃত মালিক স্থানীয় আব্দুল জলিল। এ খতিয়ানের ২০৬৮ ও ২২৭০ নং দাগে জমির পরিমাণ ১.৫০ একর। অন্যদিকে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রক্ষিত আরওআর বইয়ের ২৪ নং খতিয়ানে ১৯টি দাগে ১৯.৬০ একর জমি দেখানো হয়েছে। ইউনিয়ন ভূমি অফিসের আরওআর বইয়ের ২৪ নং খতিয়ানে উল্লিখিত দাগগুলো (নং ৬৩০, ৬৩১, ৬৩২, ৫৩৪, ৫২৯, ৫৯৭, ৪৩৮, ৪৩৪, ৫৩৬, ৫৩২, ৫৩১, ২০৮৮, ২০৮৯, ২০৯৫, ২০৯৮, ২১০৬ ও ২১০৭) ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত। ২৪ নং খতিয়ানে বর্ণিত খাস দাগগুলো সংযুক্ত করে ব্যক্তির নামে ২৫ নং হোল্ডিং খুলে ২০১৭ সালের ৭ আগস্ট ভূমি উন্নয়ন কর (দাখিলা নং ০৫৬৪৪৩৩) আদায় করায় ১৯.১০ একর সরকারি খাস জমি বেহাত হয়।

৭. অনলাইনে আপলোড করা ৭১ নং খতিয়ানের মূল মালিক এই এলাকার গোপন কুমার নন্দী ও বাদল কুমার নন্দী। এই খতিয়ানের ১৪২২ নং দাগে জমির পরিমাণ ৫.৭২ একর। অথচ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে রক্ষিত আরওআর বইয়ের ৭১ নং খতিয়ানে তিনটি দাগে জমি দেখানো হয়েছে ১২.১০ একর। এ তিনটি দাগের দুটি (নং ১৪৮০ ও ১৪৩৩) ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত। এ খাস দাগ দুটি সংযুক্ত করে ব্যক্তির নামে ৭১ নং হোল্ডিং খুলে গত বছরের ১২ আগস্ট ও একই বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর ভূমি উন্নয়ন কর (দাখিলা নং ৪৭৩০৬৬ ও ৪৭৩০৭৫) আদায় করায় সরকারি ছয় একর খাস জমি বেহাত হয়।