ঘুরেফিরে একই প্রস্তাব প্রতিবছর

ডিসি সম্মেলন শুরু রোববার

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

শরীফুল ইসলাম

সমাজের নানা পর্যায়ে সংঘটিত ফৌজদারি অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা চান জেলা প্রশাসকরা (ডিসি)। বর্তমানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের আওতার বাইরে ম্যাজিস্ট্রেটদের সামনে কোনো অপরাধ হলে তারা তা আমলে নিতে পারেন না। ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। এ জন্য তারা সিআরপিসির ১৯০(৪) ধারা মতে, অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা চান। ডিসি সম্মেলন সামনে রেখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এ প্রস্তাবসহ ৩৩৩টি প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।

একই সঙ্গে ডিসিরা প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার বাঁধা ছকের বাইরে কাজ করতে গিয়ে যে সব অসুবিধা ও সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন সেসবও তুলে ধরেছেন। অবশ্য প্রতি বছরই ঘুরেফিরে অতীতে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোই তুলে ধরেন তারা। কারণ সেগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। তবে এবারের সম্মেলন নতুন মাত্রা পেতে চলেছে স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে ডিসিদের পৃথক কার্য অধিবেশনের মধ্যে দিয়ে। আগের কোনো সম্মেলনে এ ধরনের অধিবেশন হয়নি।

পাঁচ দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন আগামী রোববার সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের 'শাপলা' হলে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। পরে তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেবেন। সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের নানা প্রতিবন্ধকতা ও সমস্যা তারা প্রধানমন্ত্রীর সামনে অনেকটা খোলামেলাভাবেই তুলে ধরবেন। সম্মেলনে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগেরও কার্য অধিবেশন হবে।

জুডিসিয়াল সার্ভিস আলাদা হওয়ার পর থেকে প্রতি বছরই ডিসি সম্মেলনের আগে ফৌজদারি অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা চেয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দাবি জানিয়ে আসছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বিশেষ করে ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৮, ১০৮, ১১০, ১৪৪, ১৪৫ ও ১৪৭ ধারার ক্ষমতা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অর্পণের এখতিয়ার সরকারের পাশাপাশি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়ার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করার দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। কিন্তু কোনোবারই সরকারের পক্ষ থেকে এ ইস্যুতে সাড়া মিলছে না। এবারও দেওয়া হয়েছে সেই একই প্রস্তাব।

বাস্তবায়ন হয় না সিদ্ধান্ত :প্রতি বছর ঘটা করে ডিসি সম্মেলন করা হলেও এর সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন আটকে থাকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়। বাস্তবায়নাধীন, চলমান অথবা বাস্তবায়ন হয়নি- এসব শব্দের আবরণে চাপা পড়ে ডিসি সম্মেলনে গৃহীত উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত। গত বছর ডিসি সম্মেলনে নেওয়া বেশিরভাগ সিদ্ধান্তের ভাগ্যেও জুটেছে এসব বিশেষণ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এ প্রতিবেদন মতে, কাগজে-কলমে গত বছরের ডিসি সম্মেলনে গৃহীত ৯২ শতাংশের বেশি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ চিত্র ৬০ শতাংশেরও নিচে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা।

ডিসিরা মাঠ প্রশাসনে কাজ করতে গিয়ে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হন, সমাধানের জন্য তা সম্মেলনে তুলে ধরেন। এসব সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু যেসব সমস্যার সঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রশাসন জড়িত, সেগুলোর বেশিরভাগই আটকে থাকে। ডিসিরা উদ্যম নিয়ে সম্মেলনে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েন। জেলার সার্বিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হয় না।

ডিসিদের বিভিন্ন সুপারিশ :সম্মেলনে ডিসিদের পক্ষ থেকে অপরাধ দমনে সংক্ষিপ্ত বিচারিক ক্ষমতা, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য 'জনপ্রশাসন ব্যাংক' নামে স্বতন্ত্র ব্যাংক স্থাপন, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ, জেলা প্রশাসকদের বাসভবনের জন্য বাবুর্চির পদ সৃজন, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষায়িত একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকদের জন্য বাসভবন নির্মাণ, বিভিন্ন দিবস পালনের জন্য জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে প্রতি জেলায় বার্ষিক এক কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া, জেলার ভৌগোলিক সীমার মধ্যে এক কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রকল্প নেওয়ার আগে জেলা সমন্বয় কমিটির সম্মতি বা অনুমোদন, মাঠ প্রশাসনে ভালো কাজের স্বীকৃতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদকে আইনি কাঠামোতে আনা, সরকারি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস গঠন, অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের আদালত অবমাননার মামলায় হাজিরা দেওয়ার ক্ষেত্রে যাতায়াত ভাতার ব্যবস্থা, পার্বত্য এলাকার ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিটিতে জেলা প্রশাসকদের সদস্য হিসেবে নেওয়া, মজুদবিরোধী আইন শক্তিশালী করা ও কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ভালো কাজের স্বীকৃতি চান ডিসিরা :একাধিক ডিসি সমকালকে বলেন, এ সম্মেলনে তারা যেসব সুপারিশ তুলে ধরবেন, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ভালো কাজে স্বীকৃতি দেওয়া। তারা বলেন, মাঠ পর্যায়ে কোনো কর্মকর্তা ভালো ভূমিকা রাখার পর সরকারের স্বীকৃতি মিললে তারা আরও উৎসাহ নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু এমন কোনো প্রথা না থাকায় ভালো কাজে প্রতিযোগিতা কম দেখা যায়। অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে চান না। প্রশাসন ছাড়া অন্যান্য প্রায় সব ক্যাডার কর্মকর্তাকে ভালো কাজে স্বীকৃতি দেওয়ার বিধান রয়েছে। যেমন, পুলিশে ভালো কাজে পিপিএমসহ নানা ধরনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

সম্মেলনে ডিসিরা ভালো কাজে প্রণোদনাসহ সনদ দাবি করবেন। এ ছাড়া তারা অপরাধ দমনে সংক্ষিপ্ত বিচারিক ক্ষমতা দাবি করবেন। এ ব্যাপারে ডিসিদের ব্যাখ্যা হচ্ছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় একজন ম্যাজিস্ট্রেটের শাস্তি দেওয়ার বিধান থাকলেও তারা বিচার করতে পারছেন না। এ জন্য তাদের আদালতে পাঠানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনি দুর্বলতার সুযোগে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ডিসিদের সামনে অন্যায় কিছু ঘটলেও তাদের মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে। অথচ তাদের বিচারিক ক্ষমতা থাকলে অপরাধের সংখ্যা অনেক কমে যেত। অপরাধীরাও শাস্তি পেত। এ কারণে তারা ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশ সংশোধন করে ডিসিদের সংক্ষিপ্ত বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানাবেন।

সম্মেলনে ডিসিরা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পাশাপাশি সব সরকারি অফিসের সম্পৃক্ততার দাবি জানাবেন। তাদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের লোকবল ঘাটতিসহ নানা প্রতিবন্ধকতা থাকায় গত ১৫ বছরে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর সঙ্গে সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করলে জনসংখ্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা সহজীকরণে পাঠ্যপুস্তকে ভূমি আইন অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাবেন তারা।

সম্মেলনে ৫৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং একটি কার্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে অধিবেশনগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। এবারের সম্মেলনে সবচেয়ে বেশি প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগ সম্পর্কিত (২৯টি), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের (২৬টি) ও ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত (২০টি)। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কিত বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের পাঠানো উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে- কক্সবাজার, কুমিল্লা, বাগেরহাট ও চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সার্বিক নিরাপত্তা, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও সার্কিট হাউসের নিরাপত্তার জন্য জেলা প্রশাসকের অধীন একটি বিশেষায়িত সার্বক্ষণিক পুলিশ ফোর্স নিয়োগ। চট্টগ্রামের ডিসি বলেছেন, বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যানরা মেয়াদপূর্তির ৬ মাস বা এক বছর আগে ইউনিয়নের সীমানা সংক্রান্ত বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে মামলা করে থাকেন। এর ফলে জটিলতা দেখা দেয়। তখন নির্বাচিত সংশ্নিষ্ট চেয়ারম্যানরা দীর্ঘদিন ধরে বিনা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হলে প্রশাসক নিয়োগ চান তিনি।

দূরত্বের কারণে বেশিরভাগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিয়মিত জেলা অফিসে এসে সেবা নিতে পারেন না। ফলে প্রতিটি উপজেলায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করেছেন নেত্রকোনা ও বগুড়া জেলার ডিসি। যশোরের ডিসি বলেছেন, নারীর ক্ষমতায়নসহ সমৃদ্ধি আনয়নের লক্ষ্যে ফুলচাষে চার শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া সরকারি সেবা সহজে পাওয়ার লক্ষ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মার্টকার্ড দেওয়ার প্রস্তাবও করেছেন তিনি।

সকল বিদ্যালয়ে সপ্তাহে একদিন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে নিরাপদ থাকার কৌশল সম্পর্কিত ব্যবহারিক ক্লাস প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন বাগেরহাটের ডিসি। এনজিওর কার্যক্রম তদারকির সুপারিশ করেছেন গাইবান্ধা ও নারায়ণগঞ্জের ডিসি। অধিকাংশ মাদ্রাসায় প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত অবকাঠামো না থাকায় মানসম্পন্ন পাঠদান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কোনো মাদ্রাসায় বিজ্ঞানাগার না থাকায় ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারিক বিষয়ে জ্ঞানদান সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মাদ্রাসাগুলোর জন্য মানসম্মত অবকাঠামো নির্মাণের সুপারিশ করেছেন গাইবান্ধার ডিসি। পঞ্চগড়ের সদর ও তেঁতুলিয়া উপজেলায় থেকে স্টোন ক্রাশিং করে প্রচুর পাথর প্রতিনিয়ত বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় জনসাধারণ ও পথচারীরা শ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে এ এলাকায় বিজ্ঞানসম্মত একাধিক 'স্টোন ক্রাশিং জোন' তৈরির প্রস্তাব করেছেন এই জেলার ডিসি।

রাঙামাটির ডিসি বিদেশগামী কর্মীদের স্মার্টকার্ড ও বহির্গমন ছাড়পত্র জেলা পর্যায় থেকে দেওয়ার প্রস্তাব করে বলেন, বিদেশগামী কর্মীদের ঢাকা থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র দেওয়ায় অর্থ ও সময়ের ক্ষতি হচ্ছে। ঠাকুরগাঁওয়ের ডিসি জাল-জালিয়াতি এবং বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি রোধে বিয়ে নিবন্ধন কার্যক্রম জন্মনিবন্ধনের মতো অনলাইন ভিত্তিক করার প্রস্তাব করেছেন।

ঢাকার ডিসি চলন্ত অবস্থায় সব ট্রেনের বগির সংযুক্ত টয়লেটগুলোর বর্জ্য নির্গমন পথ উন্মুক্ত না রাখার সুপারিশ করেছেন। এছাড়াও তিনি ভূমিসেবা সহজলভ্য করতে কল সেন্টার স্থাপন করারও প্রস্তাব করেছেন।