বিশেষ লেখা

বাঙালির প্রাণভোমরা

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

যতীন সরকার

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন অনেক আগেই। বলতে গেলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার গোড়া থেকেই। আওয়ামী লীগের অন্যতম স্থপতিরূপে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানের চিন্তা ও কর্মের ধারাবাহিক বিশ্নেষণের মধ্য দিয়েই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থেকে পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু পাকিস্তানের মতো একটি কৃত্রিম রাষ্ট্রের থাবা থেকে মুক্ত হতে না পারলে তৎকালীন পূর্ববাংলায় যে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়- সে কথা ১৯৪৮ সনে বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত আসার সময় থেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ক্রমান্বয়েই তার উপলব্ধিতে আসে যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে বৈষম্যের পাহাড় গড়ে তুলে পূর্ববাংলাকে কার্যত একটি উপনিবেশে পরিণত করে ফেলেছে। এর পর ১৯৫৮ সনে পাকিস্তানে আইয়ুবি সামরিক শাসন জারি হবার পর পাকিস্তান সম্পর্কে শেখ মুজিবের পুরোপুরি মোহমুক্তি ঘটে যায়। তখন থেকে তিনি বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকেই তার রাজনৈতিক সংগ্রামের লক্ষ্যবিন্দুরূপে নির্ধারিত করে ফেলেন। এই লক্ষ্যের কথাটি শেখ মুজিব স্পষ্ট ভাষায় প্রথম ব্যক্ত করেন ১৯৬১ সনের নভেম্বরে, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে একটি গোপন বৈঠকে। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের নীতি ও কর্মপদ্ধতি স্থির করার উদ্দেশ্যে। বৈঠকে আওয়ামী লীগের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মণি সিংহ ও খোকা রায়। বৈঠকে কমরেড খোকা রায় সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও রাজবন্দির মুক্তিসহ মোট চারটি জনপ্রিয় দাবির ভিত্তিতে আন্দোলন গড়ে তোলার অভিমত ব্যক্ত করেন। কিন্তু শেখ মুজিব এইটুকুর মধ্যেই আন্দোলন সীমিত রাখার পক্ষপাতী ছিলেন না। তাই খোকা রায়কে তিনি বলেন, এসব দাবি কর্মসূচিতে রাখুন, কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু দাদা, একটা কথা আমি খোলাখুলি বলতে চাই- আমার বিশ্বাস, গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন- এসব কোনোভাবেই পাঞ্জাবিরা মানবে না। কাজেই স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির মুক্তি নেই। তাই স্বাধীনতার দাবিটা আন্দোলনের কর্মসূচিতে রাখা দরকার। মুজিবের বক্তব্যের জবাবে মণি সিংহ ও খোকা রায় জানান, কমিউনিস্ট পার্টি নীতিগতভাবে স্বাধীনতার প্রস্তাব সমর্থন করলেও আমরা মনে করি এখনও এমন দাবি উত্থাপনের সময় হয়নি। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর শেখ মুজিব কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য মেনে নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি যে স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তারই প্রমাণ পাওয়া যায় ছেষট্টির ছয় দফা ঘোষণায়, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে, একাত্তরের সেই দুনিয়া কাঁপানো দিনগুলোতে এবং ১৬ ডিসেম্বরে যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়ার দিকে শেখ মুজিবের সংশ্নিষ্টতার এ রকম সব প্রমাণই ইতিহাস সমর্থিত ও দৃষ্টিগ্রাহ্য। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এখনও তা সর্বজনগ্রাহ্যরূপে উঠে আসেনি। স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত, সাধারণের দৃষ্টির অন্তরালে থাকা এমন কয়েকটি গোপন সংগঠনের সঙ্গেও শেখ মুজিবের প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ সংযোগ ছিল। সেসব সংগঠনের কর্মকাণ্ডের অনেক অজানা কথাই বর্তমানে কিছু কিছু গবেষণার মাধ্যমে উদ্ঘাটিত হচ্ছে। সম্প্রতি সেসব গবেষণার অনুসরণে মোরশেদ শফিউল হাসান তার 'স্বাধীনতার পটভূমি :১৯৬০ দশক' নামের বইয়ে এমন কয়েকটি গোপন সংগঠনের পরিচয় যথাসম্ভব বিস্তৃতভাবে তুলে ধরেছেন। যেমন- ইনার গ্রুপ, ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন পার্টি, বেঙ্গল লিবারেশন অ্যাসোসিয়েশন, বঙ্গবাহিনী, অপূর্ব সংসদ, নিউক্লিয়াস বা ছাত্রলীগের স্বাধীনতা গ্রুপ। প্রবাসে বাঙালিদের স্বাধীনতার নানা উদ্যোগ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশিত হয়েছে এ গ্রন্থটিতে। এ রকম গোপন ও প্রকাশ্য অহিংস ও সহিংস নানা ধরনের কর্মপ্রয়াসের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জিত হলো। কিন্তু তারপর কী হলো?

এই তারপর-এর বিষয়টি বুঝবার জন্যই তার আগের অনেক বিষয়ে পুনঃসমীক্ষা প্রয়োজন। বিশেষভাবে প্রয়োজন সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাসের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের দিকে দৃষ্টিপাত। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সনের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সাধারণভাবেই বাংলাদেশের সব মানুষের ভেতর বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঞ্চার ঘটালেও ধূর্ত-মতলববাজ অনেকের কাছেই এটা মর্মবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়াল। স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালে ঘটনাক্রমে বা বিশেষ মতলব হাসিলের সচেতন উদ্দেশ্য নিয়ে মুক্তিসংগ্রামী সেজেছিল যারা, তাদের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠল মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও জাতির অবিসংবাদিত নেতারূপে তার অধিষ্ঠান। তারা শুধু ঈর্ষাকাতরই হলো না, হিংস্র হয়ে উঠল। সেই হিংস্রতারই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটাল ১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্ট। তবে এই চূড়ান্ত হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্য করা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকা ছাড়া। প্রকৃত সত্য হলো, সশস্ত্র সংগ্রামের সফলতার চূড়ান্ত পর্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করেছিল। সেই সাম্রাজ্যবাদীদের মদদপুষ্ট অনেক মীরজাফরই মুক্তিযুদ্ধ শিবিরে অবস্থান করছিল; এবং স্বাধীন বাংলাদেশে এদের সম্মিলিত শক্তিই সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে পরাজিত পাকিস্তানের প্রেতাত্মাকে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। বঙ্গবন্ধু সেই অপশক্তি সম্পর্কে অবশ্যই সচেতন ছিলেন। সেই সচেতনতার কারণেই অপশক্তির হাত থেকে দেশটিকে রক্ষা করবার পথেরও সন্ধান করেছিলেন।

কিন্তু স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিরই সৃষ্টি হয়েছিল। সেসবের ছিদ্রপথে এবং বিশেষ করে ১৯৭৪ সনের দুর্ভিক্ষকে কেন্দ্র করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এদেশে নাক গলানোর সুযোগ পেয়ে যায়। কিউবায় চট রফতানি করার অজুহাতে চুয়াত্তরের জুন মাসেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে গম পাঠানো বন্ধ করে দেয়। আবার এর পরেই তারা নানা শর্তের বেড়াজালে বাংলাদেশকে আটকে ফেলার সুযোগ খুঁজতে থাকে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তাদের এই সুযোগপ্রাপ্তির পথের প্রতিবন্ধক। এমনকি সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেওয়া শর্তযুক্ত সাহায্য নিতে যে তিনি রাজি নন- সে কথাই বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারাকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর চলার পথে যে অনেক কাঁটা বিছিয়ে রাখা হয়েছিল এবং সেসব কাঁটা দূর করা যে মোটেই সহজ নয়- সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কিউবার বিপ্লবী রাষ্ট্রনায়ক ফিদেল কাস্ত্রো তাকে ১৯৭৩ সনেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন। সে বছর আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু যে বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত স্মরণীয় বক্তৃতা। খোলাখুলি ছিল তার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উচ্চারণ এবং তার কথার ভেতরে ছিল প্রচ্ছন্নতা। বঙ্গবন্ধুর এই গতিবিধি তার ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ সম্পর্কে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে তখনই নিঃসংশয় করেছিল। শওকত ওসমান এই কথাগুলো লিখে জানিয়েছিলেন যে, উক্ত সম্মেলনে বক্তৃতার পর ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন- শেখ, আপনি শত্রু সৃষ্টি করলেন, এমনকি আমাদের মধ্যেও।

অনেক দেশ- নামে জোটনিরপেক্ষ, আসলে সাম্রাজ্যবাদের লেজুড়। সেই সাম্রাজ্যবাদের লেজুড় হতে চাননি বলেই বঙ্গবন্ধুর এই পরিণতি ঘটেছিল- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। আগস্টে ক্যু করে বন্দুকের জোরে চক্রান্তকারীরা বাংলাদেশের ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু দেখা গেল রাষ্ট্রপতির আসনে বসে আছে আওয়ামী লীগেরই নেতারা। যেমন খন্দকার মোশতাক ও শাহ মোয়াজ্জেমের মতো কতিপয় রাজনীতিবিদ। এরা ছিল আওয়ামী লীগের সেই অংশ, যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু করেছিল মুক্তিযুদ্ধের ভেতরেই। কিন্তু সে সময়ে তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল।

খন্দকার মোশতাক ছিল নেতৃত্বের লড়াইয়ে শেখ মুজিবের কাছে পরাজিত রাজনীতিক। শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা করলে পাকিস্তানপন্থি এই খন্দকার মোশতাক তার বিরোধিতা করেছিল। বহুদিন পর এই চক্রান্তকারীই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার কঠিন প্রতিশোধ নেয়।

এই সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কতগুলো বিষয় মনে রাখা দরকার। যে বিষয়গুলো সম্পর্কে বলতে গিয়েই আমি আমার এ রচনার উপসংহার টানতে চাই। উপসংহারে বলতে চাই- এক. মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে যারা হত্যা করেছে তাদের সহযোগী, সহমর্মী ও পৃষ্ঠপোষক সবার সম্পর্কেই অর্থাৎ সব খলনায়ক সম্পর্কেই আমাদের সদাসতর্ক থাকতে হবে। এবং এদের সবার নাটের গুরু যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সে যে আমাদের স্বাধীনতার অমৃত ফল অপহরণ করে নেওয়ার জন্য আগের মতো এখনও সক্রিয়- সে কথা মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হওয়া চলবে না। দুই. বিস্মৃত হওয়া চলবে না যে, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই আমাদের মুক্তির সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। 'এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম'- বঙ্গবন্ধু যে ১৯৭১-এর ৭ মার্চের সেই অমর কবিতায় উচ্চারণ করে গেছেন, সেই পঙ্‌ক্তিই আজ আমাদের জাতির বীজমন্ত্ররূপে ধারণ করতে হবে। এবং সেই মন্ত্রে প্রাণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রযত্ন গ্রহণ করতে হবে। তিন. স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাণভোমরায় যে রাখা আছে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় চেতনা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র- এই প্রাণভোমরাটির একটি পাখাও ছিঁড়ে পড়ে গেলে কিংবা তার পরিবর্তে অন্য কিছু যুক্ত করলে তার প্রাণ আর অবশিষ্ট থাকে না।

এমনটি আমরা ইতিমধ্যে করে ফেলেছি কি-না, অর্থাৎ সেই প্রাণভোমরার সংহারে উদ্যত হয়েছি কি-না- আমাদের প্রত্যেককেই সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।

বিষয় : জাতীয় শোক দিবস ২০১৯ বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা যতীন সরকার