হুজিবি এখন দলছুট জঙ্গি সংগঠন

২০১৭ সালে মুফতি হান্নানসহ তার দুই সহযোগীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর হুজিবি নেতৃত্বশূন্য ও দুর্বল হয়ে পড়ে

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাহাদাত হোসেন পরশ

নব্য জেএমবি, পুরনো জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের জঙ্গিরা গোপনে এখনও তৎপর থাকলেও হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ (হুজিবি) প্রায় নিষ্ফ্ক্রিয়। এক সময়ের সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন হুজিবির অনেক সদস্য বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। অপেক্ষাকৃত কম বয়সীরা হয় নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে, না হয় ভিড়ছে অন্য জঙ্গি সংগঠনে। এভাবে হুজিবি পরিণত হয়েছে 'দলছুট' সংগঠনে।

জঙ্গি কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখেন এমন একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, হুজিবি নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। ২০১৩-১৪ সালে নারায়ণগঞ্জসহ দেশের একাধিক এলাকায় এ সংগঠনের বড় আস্তানা মেলে। সেসব স্থানে অনেক বিস্ম্ফোরক এবং বোমা তৈরির সরঞ্জামও পাওয়া যায়। সেসব অভিযানের পর হুজিবি দুর্বল হতে থাকে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এডিসি রহমত উল্লাহ চৌধুরী বলেন, হুজিবি মৃতপ্রায় একটি সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এখন বড় কোনো হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা এর নেই। তবু পুলিশ সংগঠনটির কার্যক্রমের ওপর নজর রাখছে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ছাড়াও দেশে অন্তত ১৩টি হামলায় হুজিবির জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এতে ১০১ জন নিহত ও সাত শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। ২০১৭ সালে হুজিবির দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানসহ তার দুই সহযোগীর ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়ার পর সংগঠনটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য ও দুর্বল হয়ে পড়ে। একই বছর টঙ্গীতে মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে হুজিবির জঙ্গিরা। তখন তাদের ব্যবহূত বোমাটি ছিল দুর্বল। ওই আলামত দেখে গোয়েন্দারা জানিয়েছিলেন, শক্তিশালী কোনো বোমা তৈরির রসদও হুজিবির হাতে নেই।

মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনায় জড়িত হুজিবির সদস্যরা 'কাট-আউট' পদ্ধতিতে অপারেশন চালায়। তাই অংশগ্রহণকারীরা একে অন্যের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানত না। তবে মোস্তফা কামাল নামে গ্রেফতার হুজিবির এক সদস্য পুলিশকে জানায়, টঙ্গীর জঙ্গি অপারেশনে নরসিংদীর ইমদাদুল উলুম মাদ্রাসার তিন ছাত্র ছিল। এছাড়া ওই মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষক ফোরকানও হুজিবির সঙ্গে সম্পৃক্ত। মুফতি হান্নানকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় অংশগ্রহণকারীরা আশুলিয়ার সদরপুরের নির্জন এলাকায় টিনশেড একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিল। ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে চারটি স্কেচ ম্যাপ পাওয়া যায়।

এর আগে ২০১৬ সালে হুজিবির ছয় নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।

তাদের মধ্যে ছিল কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক কমান্ডার সাজ্জাদুল আলম মুক্তি, মেজবাউর রহমান, বাশার, আশরাফ, আজিজ ও শফিক। তখন বেরিয়ে আসে প্রগতিশীল ব্যক্তিদের হত্যার ছক কষছে হুজিবি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা করতে চায় তারা। সংগঠনের পক্ষ থেকে কারাবন্দি হুজিবি সদস্যদেরও নানাভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। প্রগতিশীল ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা পাওয়া যায় তাদের কাছে। এ সময় জানা যায়, পাকিস্তানের লস্কর-ই তৈয়বার আদলে আবারও সক্রিয় হয়ে ঢাকায় বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করছিল তারা।

আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের খোস্ত রণাঙ্গনে হুজির জন্ম হয়। লক্ষ্য ছিল যেখানে জিহাদ হবে সেখানেই সদস্য পাঠানো হবে। মিয়ানমারের আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের পক্ষে লড়তে বাংলাদেশে সংগঠনটি হুজিবি নামে যাত্রা শুরু করে। ১৯৮৯ সালে যশোরের মাওলানা আবদুর রহমান ফারুকীর হাত ধরে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯২ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনটির ব্যাপারে ঘোষণা দেওয়া হয়। যাত্রা শুরুর পর থেকে বিভিন্ন সময় এ জঙ্গি সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন আবদুর রহমান ফারুকী, মঞ্জুর হাসান, মুফতি আবদুল হাই, কমান্ডার মঞ্জুর আহম্মদ, মুফতি আবদুস সালাম, মওলানা মঞ্জুর হাসান, কমান্ডার বাসেদ, মুফতি শহীদুল ইসলাম ও মুফতি হান্নান।

বিভিন্ন সময় অন্তত ১৩টি জঙ্গি হামলা চালায় হুজিবি। ২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলা চালানোর পর ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডা থেকে মুফতি হান্নানকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। তাকে টানা চার মাস রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময়েই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা স্বীকার করে জড়িত অন্যদের নামও জানায় সে। হুজিবির প্রথম বোমা হামলা ছিল ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে। এরপর খুলনায় আহমদিয়া মসজিদ, সিলেটে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার হত্যাচেষ্টা, সিপিবির সমাবেশ, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচজনকে হত্যা, কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রাখা, রমনার বটমূলে হামলাসহ অন্তত ১৩টি ঘটনায় জড়িত ছিল হুজিবি। তবে নতুন জঙ্গিবাদীদের কাছে হুজিবি উগ্রপন্থি সংগঠন হিসেবে কোনো 'ভালো' প্ল্যাটফর্ম নয়। তাই সংগঠনটি নতুন সদস্যও টানতে পারছে না।