আওয়ামী লীগের সেমিনার

১৫ ও ২১ আগস্টের ভয়াবহতার কথা শুনলেন কূটনীতিকরা

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

সেমিনারে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন— সমকাল

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাতুর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতার কথা বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সামনে তুলে ধরল আওয়ামী লীগ। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নিয়েও কথা হয়েছে।

শুক্রবার রাজধানীর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনে এক সেমিনারে কূটনীতিকদের এসব বিষয়ে অবহিত করা হয়। আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপ-কমিটি 'বাংলাদেশের ওপর ১৫ আগস্টের প্রভাব' শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে। আলোচনা শেষে কূটনীতিকরা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিস্মারকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

সেমিনারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু কী পরিকল্পনা করে গেছেন, সেটি সবার জানা উচিত। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে কৃষিজমির খাজনা হ্রাস এবং ১৬ হাজারের বেশি যুদ্ধবিধ্বস্ত স্কুল পুনর্নির্মাণ ও সরকারের অধিভুক্ত করেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান বিশ্বের জন্য বিস্ময়। স্বাধীন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান তৈরি করতে প্রায় ১১ বছর, ভারতের প্রায় ৩ বছর, পাকিস্তানের প্রায় ৯ বছর লেগেছিল। সেখানে মাত্র নয় মাসে বাংলাদেশের সংবিধান তৈরি হয়েছে কেবল বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কারণে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে ড. মোমেন বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্র এর আগে বঙ্গবন্ধুর একজন খুনিকে হস্তান্তরও করেছে। আশা করছি, বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকীর আগেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশে অবস্থান করা আত্মস্বীকৃত আরেক খুনিকেও বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে।'

তিনি আরও বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বঙ্গবন্ধুর এক খুনিকে বাংলাদেশে ফেরত আনতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে চিঠি দিয়েছেন। আইন ও শাসনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি রয়েছে, তাতে আমরা আশাবাদী এই খুনিকে ফেরত পাঠাবে দেশটি।'

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, কানাডায় বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের একজন রয়েছেন। কানাডা সরকার বলেছে, তাকে সেখানে আশ্রয় দেওয়া হয়নি। কিন্তু কানাডা মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে না বলেই মৃত্যুদণ্ডদের আসামিদের হস্তান্তর করতে চায় না।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ভয়াবহতার কথা বর্ণনা করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী আবদুর রহমান শেখ (রমা) বলেন, "যখন ঘাতকরা গুলি করতে করতে ঘরে ঢোকে, তখন শেখ রাসেল ও আমাদের নিয়ে বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব আরেকটি ঘরে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি আমাদের তার পেছনে থাকতে বলেন। পরে ঘাতকরা দরজা খুলে দিতে বললে তিনি সেটাই করেন। তাকে ওপরের ঘরে যেতে বলে সৈন্যরা। কিন্তু সিঁড়ির কাছে স্বামীর লাশ দেখতে পেয়ে ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বলেন, 'আমাকে মেরে ফেলতে চাইলে এখানেই মেরে ফেলো।' সেখানে থাকা সৈন্যরা তখন ব্রাশফায়ার করে বেগম মুজিবকে হত্যা করে।"

তিনি বলেন, "এরপর ওই সৈন্যরা আমাদের ও শেখ রাসেলকে বাড়ির সামনের আম গাছের কাছে নিয়ে বসায়। তখনও দোতলার ঘরগুলোতে গুলির আওয়াজ ও মেয়েদের চিৎকার-আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিলো। সেনা সদস্যদের নির্মমতার সঙ্গে তখনো পরিচিতি না থাকায় শেখ রাসেল তখন কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞাসা করছিলো, 'ওরা কি আমাকেও মেরে ফেলবে?' একটু পরে আর্মির বড় অফিসার ট্যাঙ্ক নিয়ে সেখানে প্রবেশ করলে মায়ের সঙ্গে দেখা করানোর কথা বলে শেখ রাসেলকে ওপরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বেশ কিছু সময় শেখ রাসেলের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। এরপর চার-পাঁচটা গুলির শব্দ শুনি। ব্যাস, একেবারে নিঃশব্দ। আর কোনো কান্নার আওয়াজ ছিল না।"

আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য সচিব অ্যাম্বাসেডর মো‏হাম্মদ জমিরের সভাপতিত্বে সেমিনারে আরো বক্তব্য দেন দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও উপ-কমিটর সদস্য সচিব ড. শাম্মী আহম্মেদ। সঞ্চালনা করেন উপ-কমিটির সদস্য নাদিয়া শারমিন।

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, স্পেন, সুইজারল্যান্ড ও জাপানসহ ৩০টি দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারসহ কূটনীতিকরা সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।