শুভ জন্মাষ্টমী উদযাপিত

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির আয়োজনে বিকেলে রাজধানীর পলাশীর মোড় থেকে বের হয় জন্মাষ্টমীর মূল আকর্ষণ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা-ফোকাস বাংলা

বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় সারাদেশে শুক্রবার হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী উদযাপিত হয়েছে। হিন্দুদের প্রাণপুরুষ মহাবতার পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি উদযাপনকে ঘিরে দেশজুড়ে ছিল উৎসব ও আনন্দমুখর পরিবেশ।

এ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নেওয়া হয় নানা কর্মসূচি। অনুষ্ঠানমালায় ছিল গীতাযজ্ঞ, জন্মাষ্টমীর মিছিল ও আনন্দ শোভাযাত্রা, কৃষ্ণপূজা, ধর্মীয় আলোচনা সভা, কীর্তন, আরতি, প্রসাদ বিতরণ, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও কুইজ প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গীতিনৃত্য, নাটক, প্রসাদ বিতরণ প্রভৃতি।

বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার এবং বিভিন্ন বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বঙ্গভবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির আয়োজনে বিকেলে রাজধানীর পলাশীর মোড় থেকে বের হয় জন্মাষ্টমীর মূল আকর্ষণ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী এই শোভাযাত্রাকে ঘিরে বরাবরের মতো এবারও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা রাজধানীতে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে এই শোভাযাত্রার অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ সময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিষবৃক্ষ উৎপাটনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের যারা শত্রু, তারা বাংলাদেশেরও শত্রু। এই শত্রু হচ্ছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। আসুন, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপশক্তিকে প্রতিরোধ করি। সুদিনের প্রত্যাশায় সবাইকে উদ্দীপ্ত হতে হবে।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে সংখ্যালঘুরা সবচেয়ে নিরাপদ। এই সরকার সংখ্যালঘুবান্ধব সরকার। এই সরকার যতদিন আছে ততদিন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। অন্য উৎসবগুলোও শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হচ্ছে।

সেতুমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দিনদিন উন্নতির দিকে যাচ্ছে। এই সম্পর্ক এখন নতুন উচ্চতায় উন্নীত। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে আগামী অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফর করবেন। এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিরাজমান অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর সমাধান আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই জন্মাষ্টমীর উৎসবে অংশগ্রহণ করছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্লোগান 'ধর্ম যার যার উৎসব সবার'- আবারও প্রমাণ হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। সবার প্রতি অনুরোধ, কারও আচরণে যেন অন্যের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না লাগে। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি শৈলেন্দ্রনাথ মজুমদারের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত, সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জী, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কিশোর রঞ্জন মণ্ডল, রমেন মণ্ডল প্রমুখ।

উদ্বোধন শেষে বিকেল পৌনে ৪টায় জন্মাষ্টমীর আকর্ষণীয় শোভাযাত্রা শুরু হয়। বর্ষণমুখর আবহাওয়ার মধ্যেও হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর রঙবেরঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে এবং বেলুন, ব্যানার, ফেস্টুন ও শ্রীকৃষ্ণের প্রতিকৃতিসহ শোভাযাত্রায় অংশ নেন। ব্যান্ড পার্টি ও মাইকের তালে তালে নেচে গেয়ে শোভাযাত্রাকে উৎসবমুখর করে তোলেন তারা। হাতি আর অশ্বারোহীর হাতে জাতীয় পতাকা শোভা পেয়েছে। শতাধিক ধর্মীয় সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, মন্দির ও পূজা কমিটির ব্যানারে ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, ভ্যানসহ ছোট-বড় নানা যানবাহনে চেপে ও হেঁটে শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন ভক্তরা। হাতি ও ঘোড়ার গাড়ি টমটম, রথের বহর এবং দেড় শতাধিক ঢাকের সমন্বয়ে বর্ণাঢ্য বাদ্য প্রদর্শনীও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই শ্রীকৃষ্ণ, রাধা ও কংসসহ বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়ে এবং বর্ণাঢ্য ডিসপ্লের মাধ্যমে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম, জীবন-কর্ম ও বাণীর বিভিন্ন দিক ফুটিয়ে তোলেন। যাত্রাপথে রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার মানুষ হাত নেড়ে স্বাগত জানিয়েছে শোভাযাত্রাকে।

শোভাযাত্রাটি পলাশী বাজার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মাজার, গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজার, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায় সাহেব বাজার হয়ে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় বিপুল জনসমাগমের কারণে বিকেল থেকে সংলগ্ন সড়কগুলোতে ব্যাপক যানজটও দেখা গেছে। শোভাযাত্রার যাত্রাপথে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির দু'দিনের কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী উৎসবের অংশ হিসেবে গতকাল সকাল ৮টায় দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় গীতাযজ্ঞ ও রাত ৯টায় কৃষ্ণপূজা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে আগামী ১ সেপ্টেম্বর ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে বিকেল ৪টায় আলোচনা সভা ও সন্ধ্যায় ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠান আয়োজিত হবে।

রাজধানীর স্বামীবাগ আশ্রমে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে গতকাল জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা ছাড়াও মঙ্গল আরতি, দর্শন আরতি, গুরুপূজা, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পাঠ, হরিনাম সংকীর্তন, শ্রীকৃষ্ণ লীলামৃত, পদাবলি কীর্তন, আলোচনা সভা, গৌর আরতি, অধিবাস কীর্তন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।

রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মন্দির চত্বর থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা ছাড়াও কৃষ্ণপূজা, পদাবলি কীর্তন, ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠান ও নাম সংকীর্তনের আয়োজন করে। রাজারবাগের বরদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশানে নগর কীর্তন ও পরিক্রমা, চণ্ডী পাঠ, মঙ্গল ঘট ও বিগ্রহ স্থাপন, জন্মাষ্টমী পূজা, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পাঠ, কৃষ্ণপূজা, মহাপ্রসাদ বিতরণ, পদাবলি কীর্তন, ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠান ও নাম সংকীর্তন অনুষ্ঠিত হয়। মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরে জন্মাষ্টমী উৎসবে গতকাল নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এছাড়া রাজধানীর স্বামী ভোলানন্দগিরি আশ্রম, প্রভু জগদ্বন্ধু মহাপ্রকাশ মঠ, রাধামাধব জিও দেব বিগ্রহ মন্দির, রাধাগোবিন্দ জিও ঠাকুর মন্দির, রামসীতা মন্দির এবং মাধব গৌড়ীয় মঠসহ বিভিন্ন মন্দির ও ধর্মীয় সংগঠন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।