সাক্ষাৎকার

অধিকার প্রতিষ্ঠায় ফিরে যাওয়ার বিকল্প নেই

জোসেফ ত্রিপুরা, মুখপাত্র, ইউএনএইচসিআর

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

জয়নাল আবেদীন

মিয়ানমার সরকারের তরফ থেকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, নিরাপদে বসবাস, এমনকি পর্যায়ক্রমে নিজেদের ভিটেমাটি ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে এ বিষয়ে প্রবল অবিশ্বাস কাজ করছে। তাদের মানসিকতার পরিবর্তন, সচেতনতা তৈরি তথা বিশ্বাস প্রতিস্থাপনে বিভিন্নভাবে  কাজ করা হলেও কাউকে প্রত্যাবাসনে রাজি করানো সম্ভব হয়নি।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর মুখপাত্র জোসেফ ত্রিপুরা সমকালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি বাস্তবায়নে সমানভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারেরও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার সরকার দায়বদ্ধ। তাদের উচিত রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের জন্য রাখাইনের পরিবেশ সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ সৃষ্টি করা। সবকিছু বিবেচনায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও উচিত নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়া।'

দু'বারের চেষ্টায়ও প্রত্যাবাসন চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জোসেফ বলেন, 'শরণার্থীরা সবসময়ই কয়েকটি দাবি নিয়ে কথা বলে আসছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো- তাদের নাগরিকত্ব, চলাফেরার স্বাধীনতা, জীবনের নিরাপত্তা এবং নিজেদের ভিটেমাটিতে বসবাসের সুযোগ দেওয়া। মিয়ানমার সরকারের দেওয়া আশ্বাসের ওপর ভর করে একজন শরণার্থীও ফিরতে রাজি নন। এখানে প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হওয়ার পেছনে অবিশ্বাস মূল অন্তরায়।'

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত একটি এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার জের ধরে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের ঘটনা শুরু হয়। জীবন ও সল্ফ্ভ্রম বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় তারা। ওই ঘটনায় ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শরণার্থী নাফ নদী পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবিরে আশ্রয় নেয়। এ ঘটনাকে 'জাতিগত নিধনের দৃষ্টান্ত' হিসেবে আখ্যা দেয় জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হলে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় মিয়ানমার। এ বিষয়ে স্বাক্ষরিত প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় প্রথম দফায় তারা মাত্র তিন হাজার ৪৫০ জন শরণার্থীকে ফেরত নিতে সায় দেয়। কিন্তু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ। বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে ইউএনএইচসিআর।

গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে শরণার্থীদের মানসিকতা যাচাই এবং প্রত্যাবাসনে তাদের আগ্রহের বিষয়টি নিশ্চিত করতে সাক্ষাৎকার নেন ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধিরা। অনেক শরণার্থী সাক্ষাৎকার এড়াতে ভয়ে পালিয়ে যান। সাক্ষাৎকার দেওয়া শরণার্থীরা বারবার রাখাইনের উদ্বেগজনক পরিবেশ ও নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরেছেন বলে জানান জোসেফ ত্রিপুরা। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, 'আমরা সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছি। তাদের নানাভাবে বুঝিয়েছি। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসনে একজন শরণার্থীও রাজি হননি। শরণার্থীরা বিশ্বাস করেন না যে, মিয়ানমারের বর্তমান অবস্থা তাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য অনুকূল। শরণার্থীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাদের মিয়ানমারে ফিরে আসার জন্য স্পষ্ট ঘোষণা থাকা দরকার। জাতিসংঘ প্রতিনিধি এবং সরকারের কর্মকর্তাদের কাছে তারা নিজেদের সুরক্ষা, স্বাধীনতা, নাগরিকত্বের পাশাপাশি রাখাইন উপদেষ্টা কমিশনের সুপারিশমালায় উল্লিখিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অধিকারেরও নিশ্চয়তার কথা তুলে ধরেছেন।'

কক্সবাজারে সবমিলিয়ে আশ্রিত ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপে স্থানীয়দের দুর্ভোগ কম না। তারা দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার পাশাপাশি উখিয়া-টেকনাফের ওপর সৃষ্ট চাপ সামাল দিতে রোহিঙ্গাদের জন্য নোয়াখালীর ভাসানচরে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে ভাসানচরে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও শরণার্থীদের নিজস্ব মতামতকে প্রাধান্য দিতে চায় জাতিসংঘ।

এ বিষয়ে ইউএনএইচসিআর মুখপাত্র বলেন, 'বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই জানিয়েছে, শরণার্থীদের ভাসানচরে স্থানান্তরও হবে স্বেচ্ছামূলক। জাতিসংঘ এ প্রক্রিয়ায় সরকারের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে জড়িত রয়েছে। আমরা মনে করি, ভাসানচরে স্থানান্তরের আগে সেখানে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত দিকটা খতিয়ে দেখতে হবে।'

শরণার্থীদের ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা প্রত্যাবাসন ব্যর্থ হওয়ার পেছনে কোনো ভূমিকা রেখেছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'সে রকম কিছু মনে হয়নি। কারণ, রোহিঙ্গাদের মনে এখনও ভীতি কাজ করছে। তাদের মনে অন্য কিছু থাকার কথা না। তারা শুধু রাখাইনের পরিবেশ নিয়েই ভাবছেন।'

বর্তমান চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যেহেতু শরণার্থীরা স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনে অনাগ্রহী, সে ক্ষেত্রে চুক্তিতে কোনো পরিবর্তন বা নতুন চুক্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইউএনএইচসিআর মুখপাত্র। শরণার্থীরা কোনো গোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত কি-না, সে প্রশ্নেও নিরুত্তর জোসেফ।

প্রত্যাবাসন সফল করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পরবর্তী করণীয় কী হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এ বিষয়ে সঠিক উত্তর সরকারের সংশ্নিষ্টরাই দিতে পারবেন। তবে আমরা তাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে জাতিসংঘ প্রস্তুত রয়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'শরণার্থীদের মানসিকতার পরিবর্তনে আমরা ভূমিকা রাখতে চাই। ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে একমত হয়ে প্রত্যাশা করে যে, প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছাসেবী, নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাবান হবে। এই নীতিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কাজ এগিয়ে নিলে সুফল মিলতে পারে। আমরা শরণার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এমন বিষয় অনুধাবন করেছি।'

মিয়ানমার সরকারের দায়িত্বের কথাও তুলে ধরেন জোসেফ। তিনি বলেন, 'রোহিঙ্গাদের মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকারের সর্বোচ্চ ভূমিকা প্রয়োজন। তারা রোহিঙ্গাদের প্রতি দায়বদ্ধ। তাদের অনুভব করতে হবে কেন শরণার্থীরা নিজ দেশে ফেরত যেতে ভয় পাচ্ছে, তাদের অবিশ্বাসের মূল কারণগুলো কী। রাখাইন উপদেষ্টা পরিষদের সুপারিশে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো স্পষ্ট করতে হবে। মিয়ানমারে অবাধে চলাফেরা এবং মৌলিক অধিকারের সুরক্ষার বিষয়ে সেখানে উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়টি রোহিঙ্গাদের দাবির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ফলে মিয়ানমার চাইলে এদিক থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।'

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মনে বিদ্যমান অনাস্থার জন্য মিয়ানমারের দায় কতটা- এমন প্রশ্নের জবাবে জোসেফ বলেন, 'এটি স্পষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা বেশকিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখিয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমার সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দল গত জুলাই মাসে বাংলাদেশ সফর করে এবং শরণার্থীদের মুখোমুখি হয়। এটি শরণার্থীদের কল্যাণে সংলাপ প্রতিষ্ঠার পথে এক ধাপ অগ্রগতি। বৃহত্তর বোঝাপড়া, আস্থা তৈরি এবং শরণার্থীদের অনেক উদ্বেগ সমাধানের জন্য এ জাতীয় প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে ইউএনএইচসিআর। আমরা মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি যেন তারা শরণার্থীদের এমন একটি সুযোগ দেয়, যাতে তারা রাখাইন রাজ্যে গিয়ে সেখানকার পরিবেশ সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করতে পারেন। স্বচক্ষে পরিস্থিতি দেখে আসার পরে শরণার্থীরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে বেগ পাবে না।'

জোসেফ বলেন, 'আমরা মনে করি শরণার্থীদের কাছে বেশকিছু সুযোগ আছে, তারা রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিতে পারে। নিজস্ব উৎসের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েও তারা প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমরা মনে করি, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়াই হবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য উত্তম পথ।'