কর্মকর্তাদের নারী কেলেঙ্কারি

নামেই তদন্ত

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

দেলওয়ার হোসেন

প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একের পর নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলেও খুব কম ক্ষেত্রেই শাস্তি পাচ্ছেন তারা। মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ডিসি, ইউএনও ও এসিল্যান্ডের নামে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রায়ই যৌন হয়রানি ও যৌন সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করার লিখিত অভিযোগ দিচ্ছেন তাদের সহকর্মী ও সেবাগ্রহীতা নারীরা। যৌন হয়রানির প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলার ঘটনাও ঘটেছে।

তবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা বিভাগীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তদন্ত হয় কেবল নামেই। জনপ্রশাসনে এসব গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি 'ওএসডি'। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জামালপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীরের বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির দুটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর গতকাল রোববার তাকে বদলি করে 'বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা' (ওএসডি) হিসেবে পাঠানো হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। এ ছাড়া গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন অধিশাখা) মুশফিকুর রহমানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অথচ জামালপুরের এই ডিসিকে চলতি বছর বিভাগীয় পর্যায়ে সেরা হিসেবে শুদ্ধাচার পুরস্কার দিয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগের তৎকালীন কমিশনার মাহ্‌মুদ হাসান।

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, ওএসডি হওয়ার আগে শনিবার মধ্যরাতে একটি মাইক্রোবাসে করে সপরিবারে জামালপুর ছেড়েছেন ওই জেলা প্রশাসক। ওই কেলেঙ্কারিতে জড়িত ডিসি অফিসের নারী কর্মচারীরও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকের ধারণা, ওই কর্মচারীকে ডিসি আত্মগোপনে পাঠিয়েছেন। এদিকে পরিকল্পনামন্ত্রীর একান্ত সচিব মোহাম্মদ এনামুল হককে জামালপুর জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

গুরুপাপে লঘুদণ্ড : গত বছরের অক্টোবরে নাটোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) গোলামুর রহমানের বিরুদ্ধে এক নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। ওই নারী ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযোগ, ডিসি তাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কুপ্রস্তাব ও রাতে সার্কিট হাউসে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। কুপ্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় তাকে দাপ্তরিকভাবে হয়রানি করেন। এর প্রতিকার চেয়ে ওই ম্যাজিস্ট্রেট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। ওই যৌন হয়রানির অভিযোগের এক মাস পর গোলামুরকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করা হয়। আর নারী কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়।

ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে প্রায় এক বছর ধরে এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ করে আসছিলেন উপসচিব একেএম রেজাউল করিম রতন। এ ঘটনার মামলায় চার্জশিট প্রকাশের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর আগে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার অভিযোগ ওঠে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে। প্রতারণার শিকার নারী সুবিচার প্রার্থনা করে ওই সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করে। মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায়। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মাঠ প্রশাসনকে তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশ দেয়। দুই দফা তদন্ত শেষ হলেও এখন পর্যন্ত ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী চাকরিচ্যুত করার বিধান রয়েছে। এমনকি সরকারি কর্মচারী আপিল ও শৃঙ্খলা বিধিতেও এসব ঘটনায় গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরিচ্যুতের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তাকেই এমন শাস্তি দেওয়ার নজির নেই। তবে এবার জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উদাহরণ সৃষ্টির মতো শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তাও বলেছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুত হবেন ওই কর্মকর্তা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে প্রশাসনের দুই হাজার ৭৪৮ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারিসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অভিযোগ তদন্ত করে মাত্র ৩৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক সত্যতা পায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এরপর প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে সংশ্নিষ্ট বিধিমালার আলোকে ৩৬৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এর আগেসহ এ নিয়ে সর্বমোট ৪৪০টি বিভাগীয় মামলার মধ্যে গত ১০ বছরে ৬৭ জন কর্মকর্তাকে গুরুদণ্ড, ১২৬ জন কর্মকর্তাকে লঘুদণ্ড, ২০৩ জন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট ৪৪টি বিভাগীয় মামলার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগই বেশি। নিজ সহকর্মী ও সরকারি সেবাগ্রহীতা নারী, জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষও অভিযোগ করছেন। লঘুদণ্ড হিসেবে বেশিরভাগেরই সর্বোচ্চ শাস্তি হয়েছে মৌখিক সতর্কতা। কয়েকজন কর্মকর্তার শাস্তি হিসেবে কেটে নেওয়া হয়েছে দুটি করে ইনক্রিমেন্ট। তারা আবার এই দণ্ডেও সন্তুষ্ট না হয়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন। অনেকে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের বিচারে সন্তুষ্ট না হয়ে হাইকোর্টেও যাচ্ছেন। তবে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তাধীন থাকলে পদোন্নতি বন্ধ থাকে। এ ছাড়া অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগের বেশিরভাগ তদন্ত পর্যায়ে নিষ্পত্তি হওয়া, বিভাগীয় মামলা হলেও দায়সারা শুনানি শেষে শাস্তি ছাড়া নিষ্পত্তি এবং শুরুতে অনেক অভিযোগ আমলে না নেওয়ার ফলে পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হচ্ছে না। ফলে নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা কমছে না বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।

কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠনের সুপারিশ করা হলেও তা গুরুত্ব পায়নি। কর্মকর্তাদের অভিযোগ কর্মকর্তারাই তদন্ত ও বিচার করছেন। ফলে চূড়ান্ত তদন্ত নিয়েও পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে জামালপুরের ডিসির বিরুদ্ধে উদাহরণ সৃষ্টির মতো শাস্তি হবে। এই বিষয়টি অনেকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, এটা অনৈতিক কর্মকা। এজন্য খুব ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাকে ওএসডি করেছি। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে এটা করা হয়েছে। এরপর তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলি ইমাম মজুমদার সমকালকে বলেন, কর্মকর্তাদের অসদাচরণে ওএসডি একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। তবে এটি আইনগত কোনো শাস্তি নয়। তদন্তের পর অভিযুক্ত হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার না হওয়া একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অন্যায়ের অভিযোগ এলে তা তদন্ত করে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া উচিত। এটি না হলে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে জুনিয়র কর্মকর্তাদের ওই কাজে উৎসাহিত করা হয়। এ জন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো অভিযোগ আমলে নিয়ে তা তদন্ত করা উচিত। তবে আবার এমন কোনো কাজ করা উচিত নয় যাতে কর্মকর্তারা সরকারি কাজ করতে নিরুৎসাহিত হবেন, সেটিও মাথায় রাখার প্রয়োজন।