সব খাওয়া শেষ, এবার নজর ড্রাগসের জমিতে

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২৬ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মসিউর রহমান খান

রংপুর ড্রাগস অ্যান্ড কেমিক্যালস কো-অপারেটিভ সোসাইটি (আরডিসিসিএস) লিমিটেডের ৫০ কোটি টাকা মূল্যের জমি গিলতে যাচ্ছেন প্রভাবশালীরা। অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে এই সমবায় সমিতির প্রধান আয়ের উৎস ওষুধ তৈরির কারখানা। আগুনে পুড়ে গেছে সমিতির সদস্য তালিকাসহ জমির দলিলপত্র। একে একে লুট হয়েছে সব স্থাপনা। কয়েক বছর আগে তহবিল গঠনের নামে অর্ধকোটি টাকায় এর শতাধিক গাছ কেটে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

৭০ বছরের পুরনো এই প্রতিষ্ঠানটির জমি ছাড়া এখন আর কিছুই নেই। রংপুর সিটি করপোরেশনের আলমনগরে ৪ দশমিক শূন্য ৩ একর জমিতে এই সমিতি প্রতিষ্ঠিত। এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য ৫০ কোটি টাকা। তা ছাড়া পাশের উপজেলা মিঠাপুকুরে সমিতির নামে আরও ৫২ বিঘা চার কাঠা জমি থাকলেও তা এখন পুরোপুরি বেদখলে। আলমনগরের সম্পত্তি দখলের লড়াইয়ে নেমেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির নেতা ও একাধিক সাবেক এমপি। একে অপরের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরেই সমিতির কর্তৃত্ব নিজেদের কবজায় রাখতে সচেষ্ট তারা। বর্তমানে এখানে তিনটি গ্রুপ সক্রিয়, যারা পরস্পরের বিরুদ্ধে অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলছে।

এদিকে, সম্পত্তি অবৈধ দখলে যাওয়ার আশঙ্কায় সমবায় অধিদপ্তর থেকে অবসায়নের (প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম গুটিয়ে দায়দেনা নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, অবসায়কের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বর্তমান কমিটি বলছে, এ আদেশ অবৈধ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা এ সম্পত্তি দখলের চক্রান্ত করছেন। তারাই প্রভাব খাটিয়ে অবসায়নের আদেশ জারি করিয়েছেন। সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বর্তমান কমিটি আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।

১৯৪৫ সালে শুরু হওয়া এ সমিতির সদস্য সংখ্যাও নিয়ে রয়েছে বিভ্রান্তি। কেউ বলছে সদস্য সংখ্যা ২০ হাজার, কেউ বলছে দুই হাজার ৮০০। আবার কেউ বলছে দুই হাজার ৪০০। সমবায় অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সমিতির সদস্য সংখ্যা দুই হাজার ৪২৯ জন। সর্বশেষ ৮৫ জন সদস্য নিয়ে নির্বাচন হয়। সমিতির শেয়ার মূলধনের পরিমাণ ১১ লাখ ১৭ হাজার ৯৮৩ টাকা।

বিবদমান তিন পক্ষের এক পক্ষ বলছে, বর্তমান কমিটির কেউই সমিতির সদস্য নন। সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাঁর যোগসাজশে এ কমিটি করা হয়েছে। আর বর্তমান কমিটির সভাপতির দাবি, 'এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের লিখিত আবেদন ছাড়া অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল ক্ষমতাসীন দলের নেতা হিসেবে সমিতি দখলের চেষ্টা করছেন।' বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি ও স্থানীয় পত্রিকা দাবানলের সম্পাদক খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুলের বিরুদ্ধেও সমিতির সভাপতি থাকার সময় শতাধিক গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সরকারের তরফে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় সংসদের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির একাধিক বৈঠকে আলোচনা হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। কমিটির পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে আরও আলোচনার কথা রয়েছে।

বৈঠকের কার্যপত্রে সমিতির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে, খায়েরুজ্জামান নামের এক সদস্যের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৮ মার্চ প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। রংপুর সদর উপজেলার সমবায় কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে অবসায়ক নিয়োগ করা হয়। কিন্তু সমিতির সভাপতি মির্জা আওরঙ্গজেব লাভলু তার কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেননি।

এ বিষয়ে আওরঙ্গজেব লাভলু বলেন, এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের লিখিত আবেদন ছাড়া অবসায়ন করা যায় না। আওয়ামী লীগ নেতা তুষার কান্তি মণ্ডল প্রভাব খাটিয়ে অবসায়নের আদেশ জারি করিয়েছেন। তার অভিযোগ, সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল ও তুষার কান্তি মণ্ডলসহ আরও অনেকে মিলে বর্তমান কমিটিকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে নেমেছেন। বাটুল সভাপতি থাকার সময় সমিতির ১০৫টি গাছ কেটে তহবিল গঠনের নামে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। পাশের উপজেলা মিঠাপুকুরে ৫২ বিঘা চার কাঠা জমিও তিনি নগদ অর্থের বিনিময়ে বিভিন্নজনের কাছে ছেড়ে দিয়েছেন। সমিতির স্থাপনা বলতে এখন আর কিছু নেই। আলমনগরের ৪ দশমিক শূন্য ৩ একর জমি ছাড়া বাকি সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে।

বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি ও স্থানীয় পত্রিকা দাবানলের সম্পাদক খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান সংসদের বিরোধীদলীয় হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গাঁর যোগসাজশে বর্তমান কমিটি অবৈধভাবে গঠিত হয়েছে। গাছ কাটার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ওখানে কোনো দিনই ১০৫টি গাছ ছিল না। অভিযোগকারীরা এর কোনো প্রমাণ দিতে পারবে না। তিনি বলেন, সভাপতি থাকার সময় তিনি গাছ কেটে আলমনগরের জমির চারপাশে সীমানাপ্রাচীর তুলেছিলেন। মিঠাপুকুরের জমি সম্পর্কে বাটুল বলেন, এই জমি সমিতির টাকায় কেনা হলেও অনেক আগেই বেদখলে চলে গেছে। সরকারি রেকর্ডপত্রে সেসব এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের নামে। তিনি জানান, উলিপুরের জাতীয় পার্টির দলীয় সাবেক এমপি ও স্থানীয় পত্রিকা বায়ান্নর আলোর প্রকাশক আক্কাস আলীর মালিকানাধীন প্রাইম মেডিকেলকে এ জমি দেওয়ার জন্য মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ তৎপরতা চালাচ্ছেন।

প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান তুষার কান্তি মণ্ডল। তার দাবি, তিনি নিজে সমিতির সদস্য না হলেও এলাকাবাসীর স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন। তিনি বলেন, এ সমিতির সদস্য সংখ্যা ২০ হাজার। মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ প্রতিমন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে এটাকে আয়ত্তে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বর্তমান কমিটি তিনিই বানিয়েছেন। ২০ হাজার সদস্যের মধ্যে বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির কারোরই নাম নেই। তারা কত সালে সদস্য হয়েছেন, তারও কোনো রেকর্ড নেই। তিনি বলেন, লাভলু নিজেই সমিতির জমিতে বাড়ি করে অবৈধভাবে বসবাস করছেন। কিন্তু এই সাড়ে চার একর জমি কাউকে ভোগদখল করতে দেওয়া হবে না। তুষার কান্তি মণ্ডলের দাবি, সমিতির নামে মিঠাপুকুর ছাড়াও রংপুর শহরে অনেক দামি সম্পত্তি ছিল, যা এরই মধ্যে বেদখল হয়ে গেছে।

এ সম্পর্কে আওরঙ্গজেব লাভলু বলেন, মসিউর রহমান রাঙ্গাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে অভিযোগকারীরা পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চান। কারণ, সমবায় সমিতির কমিটি রয়েছে। তাহলে রাঙ্গাঁ এককভাবে সাবেক এমপি আক্কাস আলীকে কীভাবে এ জমি দেবেন?

সংসদীয় কমিটির বৈঠকের কার্যপত্রে দেখা গেছে, বৃহত্তর রংপুরের লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী জেলার সমবায়ী শেয়ারহোল্ডার সদস্যদের অর্থায়নে ১৯৪৫ সালে নগরীর আলমনগরে 'দি রংপুর কনজ্যুমার্স কো-অপারেটিভ স্টোরস লিমিটেড' নামে এ সমিতি যাত্রা শুরু করে। ১৯৫৫ সালে সমিতির নাম পরিবর্তন করে 'রংপুর ড্রাগস অ্যান্ড কেমিক্যালস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড' (আরডিসিসিএস) করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি আয়ুর্বেদীয়, দেশীয় ওষুধ বানিয়ে ও বাজারজাত করে সুনাম অর্জন করে। ৪ দশমিক শূন্য ৩ একর জমিতে ওষুধ কারখানা, অফিসঘরসহ সাতটি অবকাঠামোও নির্মাণ করা হয়। ১৯৮৪ সালে সরকারি ওষুধ নীতিমালার কারণে কোম্পানির অধিকাংশ পণ্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সমিতির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। ১৯৯০ সালে আগুন লেগে এর গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়ে যায়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সরকারি দেনা নারায়ণগঞ্জ জুট বোর্ডের কাছে ৫২ হাজার ৯০১ টাকা।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ১৯৮৯ সালে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল চুরির অভিযোগ উঠলে রংপুর জেলা প্রশাসকসহ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি হয়। সমিতির দায়িত্ব দেওয়া হয় সমবায় জেলা কার্যালয়কে। এর পর ২৭ বছরে আর কোনো নির্বাচন হয়নি। সমবায়ের জেলা কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সমিতির বিভিন্ন সম্পদ বেহাত হতে থাকে। ২০১৩ সালে কমিটির সভাপতি জেলা সমবায় কার্যালয়ের পরিদর্শক এ সম্পত্তিতে ঘর তুলে ভাড়া দিয়ে টাকা তোলেন। ২০১৪ সালে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাঁর হস্তক্ষেপে সমিতির নির্বাচন হয়। এ নির্বাচনের জন্য ১০৯ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়, যার মধ্যে ৪৮ জনই মৃত ব্যক্তি! ২০১৫ সালের ১৯ মার্চ কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৬ সালের ১০ জানুয়ারি কমিটি ভেঙে দিয়ে মিঠাপুকুর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়। এ সময় সমিতির জমিতে থাকা অবৈধ দখলদাররা সম্পত্তি হরিলুট করে।

২০১৭ সালের আগস্টে প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাঁর নির্দেশে জেলা সমবায় কার্যালয় সমিতির সদস্য মির্জা আওরঙ্গজেব লাভলুকে সভাপতি, মো. আলতাফ হোসেন ও এস এম মান্নান মণ্ডলকে সদস্য করে তিন সদস্যের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি অনুমোদন করা হয়। ২০১৮ সালের ১৩ জানুয়ারি সমিতির নির্বাচনে মির্জা আওরঙ্গজেব লাভলু সভাপতি, মো. হাসান ইমাম সহসভাপতি ও আবদুল্লাহ খান নান্নু সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছয়জন পরিচালকসহ কমিটির নয়জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।