মিয়ানমারের মনগড়া তথ্যে বাড়ছে আস্থার সংকট

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাশেদ মেহেদী

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের আস্থার সংকট বাড়ছে। প্রত্যাবাসন বিষয়ে উদ্যোগ এবং রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে মিয়ানমারের দেওয়া তথ্য একাধিকবার প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় আস্থার সংকট প্রবল হয়ে উঠছে। চীনের মধ্যস্থতায় এটা কাটানোর জন্য এখন প্রচেষ্টা চলছে।

সংশ্নিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, এখন পরিস্থিতি এমন যে মিয়ানমারের দেওয়া কোনো তথ্যের ওপরই নির্ভর করা যাচ্ছে না। সর্বশেষ এ আস্থার সংকটের বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হলে মিয়ানমার আসিয়ান দেশের রাষ্ট্রদূতদের রাখাইন সফরের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে এর দিনক্ষণ এখন পর্যন্ত জানায়নি নেপিদো। সংকট নিরসনে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার ত্রিপক্ষীয় বৈঠককেই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সমকালকে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের আন্তরিকতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাদের কথা ও কাজের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। এর ফলে রোহিঙ্গা সংকট প্রকট হচ্ছে। তবে এ সংকট উত্তরণে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

যেসব তথ্যে গরমিল :কূটনৈতিক সূত্র জানায়, কয়েকটি ক্ষেত্রে মিয়ানমারের দেওয়া তথ্যে গরমিল পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রথমত, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায় মিয়ানমার। ভারত ও চীন রোহিঙ্গাদের জন্য ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছে এবং প্রত্যাবাসনের পর রোহিঙ্গাদের নিরাপদ বসবাসের নিশ্চয়তার কথাও মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। কিন্তু সম্প্রতি একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের গ্রামে বরং মিয়ানমারের নতুন সরকারি স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

মিয়ানমার জানিয়েছিল, এখন রাখাইন পরিস্থিতি শান্ত এবং সেখানে তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর আর কোনো অভিযান নেই। কিন্তু কয়েকদিন আগে আবারও রোহিঙ্গাদের একাধিক দল বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করার ঘটনায় এ তথ্য কতটুকু সত্য তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বরং সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক একাধিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, রাখাইনে এখন পর্যন্ত ভীতিকর পরিস্থিতির অবসান হয়নি।

জানা গেছে, ভারত ও চীনের ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার খবর সঠিক। তবে রোহিঙ্গাদের সেখানে নিরাপদে রাখার জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য এখন পর্যন্ত দিতে পারেনি মিয়ানমার।

মিয়ানমারকে বার বার অনুরোধ করা হয়, রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে ফেরার ব্যাপারে বোঝানোর জন্য। কিন্তু সে কাজটিও ধারাবাহিকভাবে মিয়ানমার করেনি। তাদের একটি উচ্চ পর্যায়ের দল কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে রোহিঙ্গাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়। এরপর এ ব্যাপারে মিয়ানমারের আর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ ২২ আগস্ট থেকে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি রোহিঙ্গাদের তীব্র অনাস্থার কারণে তা ভেস্তে যায়।

সূত্র জানায়, প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু না হওয়ার দায় বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়ে মিয়ানমারের অপপ্রচার আস্থার সংকট আরও বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় অপপ্রচার বন্ধ করে মিয়ানমারকে রাখাইন পরিস্থিতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ থেকে আবারও আহ্বান জানানো হয়। এর জবাবে মিয়ানমার কয়েক দিন আগে জানায়, তারা আসিয়ান দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের রাখাইন সফরের ব্যবস্থা করবে। তবে তারা সফরের দিনক্ষণ এখন পর্যন্ত জানায়নি।

দৃষ্টি এখন চীনের দিকে :সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এখন দৃষ্টি চীনের দিকে। চীনের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মধ্যস্থতায় কূটনীতি চালানো হচ্ছে। সর্বশেষ গত ২২ আগস্ট থেকে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরুর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর চীনের কাছে মিয়ানমারের বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার অসঙ্গতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। চীনের একজন প্রতিনিধি উপস্থিত থেকে সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থার সংকটের বিষয়টিও প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তিনি নিজেও তখন এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ আস্থার সংকট নিরসনে চীন এখন নিয়মিত দূতিয়ালির ভূমিকায় রয়েছে। আগের চেয়ে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের বিষয়টিতে চীন অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও সূত্র জানায়।

এ পরিস্থিতিতে নিউইয়র্কে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বৈঠকের আয়োজন করেছে বেইজিং। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধান কতটা ত্বরান্বিত হবে, এ বৈঠকের ওপরই তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বলে সূত্র জানায়।

কথা-কাজে অসঙ্গতি :পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন সমকালকে জানান, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ সব সময় প্রস্তুত। এ সংকট আরও প্রকট হওয়ার আগেই বাংলাদেশ এর স্থায়ী সমাধান চায়। কিন্তু মিয়ানমারের দিক থেকে সংকট সমাধানে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। তাদের কথায় এবং কাজে অসঙ্গতি রয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে। রোহিঙ্গাদের আস্থায়ও তারা আসতে পারেনি। ফলে প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি এবং সংকট নিরসনেও অগ্রগতি দেখা যায়নি।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক একাধিক সংস্থাও রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে ফিরে যেতে নিরুৎসাহিত করছে। তাদের কাছে এরই মধ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড না করার জন্য বার্তা দেওয়া হয়েছে। কিছু সংস্থা রোহিঙ্গাদের মানবিক চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলছে। বাংলাদেশ তার সামর্থ্যের মধ্যে রোহিঙ্গাদের সব ধরনের মানবিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু বেশিদিন এ সংকটের বোঝা বহন করার সামর্থ্যও বাংলাদেশের নেই। অতএব যেসব দেশ ও সংস্থা তাদের মানবিক চাহিদা নিয়ে বেশি চিন্তিত, রোহিঙ্গাদের সেসব দেশে নেওয়া হলে বাংলাদেশের কোনো আপত্তি থাকবে না।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চীন এ সংকট নিরসনে আন্তরিক বলে জানিয়েছে। নিউইয়র্কে ত্রিদেশীয় বৈঠক থেকে ভালো কিছু আশা করা হচ্ছে। আশায় বুক বেঁধে আছি। তিনি আরও বলেন, এ সংকট দীর্ঘ হলে তা এ অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ বিষয়টি বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জোর দিয়ে বোঝানোর কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং দ্রুত সংকট নিরসনে সব ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।