আন্দোলনে উত্তপ্ত দুই বিশ্ববিদ্যালয়

ভিসি অপসারণ দাবিতে ছাত্র-শিক্ষক মাঠে

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাব্বির নেওয়াজ

একসঙ্গে দেশের দুই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে আন্দোলন। ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে শুরু হওয়া ছাত্র-শিক্ষকদের কর্মসূচি বর্তমানে পরিণত হয়েছে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেছে সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সংগঠন ও ফোরাম। এ দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বশেমুরবিপ্রবি। তবে এখনও শিক্ষার্থীরা হল ও ক্যাম্পাস ত্যাগ করেননি।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি নিকটাত্মীয়ের চিকিৎসার প্রয়োজনে বর্তমানে ভারতে আছেন। ২৫ সেপ্টেম্বর তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইন সমকালকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত ঘটনাবলি তাদের নজরে আছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। মন্ত্রী দেশে ফিরলে তার পরামর্শমতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের জন্য এরই মধ্যে নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল।

দুর্নীতির অভিযোগে উত্তপ্ত জাবি :দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ তুলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন গত মাসে। শুরুতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ হলের তিন পাশ থেকে হল সরানো, মাস্টারপ্ল্যান পুনর্বিবেচনা করাসহ কয়েকটি দাবিতে ক্যাম্পাসে আন্দোলন চলছিল। এ আন্দোলন চলার সময়েই বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে দুই কোটি  টাকা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে। এ সময় অনুসন্ধানের স্বার্থে প্রশ্ন করতে গিয়ে উপাচার্যের কার্যালয়ে লাঞ্ছিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'জন সাংবাদিক। দুর্নীতিবিরোধী তিন দফা দাবি নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করতে থাকেন।

উপাচার্য ফারজানার কাছে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে তাদের পদ থেকে সরে যেতে হয়। তবে তারা অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো অধ্যাপক ফারজানার বিরুদ্ধে শাখা ছাত্রলীগের নেতাদের অর্থ দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। নিজেদের নির্দোষ দাবি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা এক চিঠিতে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, 'জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অভিযোগ আপনার (প্রধানমন্ত্রী) কাছে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপাচার্যের স্বামী ও ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে কাজের ডিলিংস করে মোটা অঙ্কের কমিশন-বাণিজ্য করেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ঈদুল আজহার পূর্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে এক কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হয়।'

এরই মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রাব্বানী ও সাদ্দাম হোসেনের ফাঁস হওয়া আলোচিত ফোনালাপ পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এতে উপাচার্যের কাছ থেকে ছাত্রলীগ এক কোটি টাকা কমিশন পেয়েছে বলে রাব্বানীকে জানান সাদ্দাম হোসেন। পরের দিন শাখা ছাত্রলীগের দুই নেতা টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও উপাচার্য বলেন, তিনি কোনো টাকা দেননি। এরই মধ্যে আন্দোলনকারীদের তিনটি দাবির দুই দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মেনে নেয়। যদিও তৃতীয় দাবি দুর্নীতির তদন্তের বিষয়ে প্রশাসন ও আন্দোলনকারীদের আলোচনা ব্যর্থ হয়। পরে দুর্নীতির অভিযোগে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেন আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। উপাচার্যকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের জন্য ১ অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে তারা বলেছেন, না হলে আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হবে। তবে আন্দোলনকারীদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে উপাচার্য ফারজানা ইসলাম বলেছেন, সরকারের নির্দেশ না পেলে তিনি পদত্যাগ করবেন না।

গতকাল রোববার থেকে শুরু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। অবশ্য আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, ভর্তি পরীক্ষায় কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি না করেই তারা তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। কিন্তু যেহেতু তারা বর্তমান উপাচার্যকে আর নৈতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী মনে করছেন না, সেহেতু ভর্তি পরীক্ষা চলার সময় সব ভবনে তাকে অবাঞ্ছিত বিবেচনা করা হবে।

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, তিনি কাউকে টাকা দেননি। এগুলো মিথ্যা গল্প। তারা ষড়যন্ত্র করে এসব করছে। আর পদত্যাগ শুধু আন্দোলনকারীদের কথায় হবে না। কারণ, আরও অংশীজন আছেন। আচার্য যদি বলেন, তখন তিনি পদত্যাগ করতে পারেন; এর আগে নয়।

আন্দোলন ঠেকাতে বশেমুরবিপ্রবি বন্ধ ঘোষণা : উপাচার্য খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বন্ধ ঘোষণা করেছে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এদিন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগতদের হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার জের হিসেবে গত ১১ সেপ্টেম্বর আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাতেমা-তুজ-জিনিয়াকে সাময়িক বহিস্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপাচার্যের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যানসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপাচার্য বরাবর জিনিয়ার বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার চেয়ে একটি লিখিত আবেদন করেন। উপাচার্য বহিস্কারাদেশ তুলে নেন। তবে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে জোর আন্দোলন গড়ে তোলেন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৪টি সিদ্ধান্ত রেজিস্ট্রার মো. নুরউদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত একটি আদেশে প্রকাশ করে। ওই আদেশের ৪ নম্বরে বলা হয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ ছাড়া কাউকে বহিস্কার করা হবে না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ডেকে এনে অপমান করা হবে না। আদেশের ১২ নম্বরে বলা হয়, ফেসবুকে স্ট্যাটাস ও কমেন্টকে কেন্দ্র করে কোনো শিক্ষার্থীকে বহিস্কার করা হবে না।

ভিসি অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে গত পাঁচ বছরের বিভিন্ন সময় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পাঁচ বছরে অতিরিক্ত মূল্যে ভর্তি ফরম বিক্রি করে তিনি প্রায় ২০ কোটি টাকা লোপাট করেছেন। শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য তিনি বাসের ১৮টি ইঞ্জিন কিনে গোপালগঞ্জে বসেই নিম্নমানের বডি বানিয়ে সেখান থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। গাছ কেনার নামে দুর্নীতি করেছেন ২৫ কোটি টাকার। জিনসেং নামে একটি গাছ সাত লাখ টাকায় কিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে রোপণ করেন তিনি। এ গাছের মূল নাম 'ফাইবাস বনসাই'। এটির বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা। টাকা লুটপাটের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত টেবিল বেঞ্চ তৈরি করেন তিনি। সেগুলো এখন খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ভিসি সমর্থক জুনিয়র শিক্ষকদের চেয়ারম্যান পদে বসানোর অভিযোগ রয়েছে।