অবৈধ অস্ত্রের নতুন রুট

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাহাদাত হোসেন পরশ

সীমান্তের কিছু পয়েন্ট অবৈধ অস্ত্র কারবারিদের চেনা রুট হিসেবে পরিচিত। তবে এবার সিলেটের গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি সীমান্ত হয়ে দেশে অস্ত্র ঢোকার একটি নতুন রুটের খোঁজ মিলেছে। এই রুটে প্রতি মাসে গড়ে অন্তত দুটি চালান দেশে প্রবেশ করত। এসব চালানে আসা অধিকাংশ অস্ত্র রিভলবার। এ রুটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো 'সীমান্ত হাটে' অস্ত্রের হাতবদল হতো। আর বাংলাদেশে আনার জন্য ১২ চেম্বারের বিশেষ রিভলবার তৈরি করা হয়েছিল। এ ধরনের বেশ কিছু রিভলবার এরই মধ্যে বাংলাদেশে ঢুকেছে।

গত বৃহস্পতিবার এই রুটের অস্ত্র কারবারিদের মধ্যে তিনজনকে যাত্রাবাড়ী থেকে গ্রেফতার করে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। বর্তমানে তাদের পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গ্রেফতাররা হলেন- আব্দুল শহীদ, দোলন মিয়া ও আনছার মিয়া। তাদের কাছ থেকে তিনটি অত্যাধুনিক রিভলবার পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুটি অস্ত্র পয়েন্ট ২২ ও একটি পয়েন্ট ৩১ বোরের। এ ঘটনা তদন্তে যুক্ত পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, এর আগে যেসব রুট হয়ে দেশে অস্ত্র ঢুকেছে তার মধ্যে রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোরের বেনাপোল, কুষ্টিয়া, হিলি, আখাউড়া, ঠাকুরগাঁও ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা। তবে এবারই প্রথম গোয়েন্দারা জানতে পারেন, সিলেটের গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি সীমান্ত হয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র অস্ত্র আনছে।

সীমান্তের ওপারে ভারতীয় অংশে 'লাকাট হাট' এলাকার এক ভারতীয় খাসিয়া অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। সপ্তাহে তিন দিন সীমান্ত হাট বসে। সেই হাটে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে মিলিত হন সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিকরা। ওই খাসিয়া সীমান্ত হাটে অস্ত্র হাতবদল করে গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দির নোয়াগাঁওয়ের ওয়াতির  আলীর ছেলে আরব আলীর কাছে দেন। আরব আলীর দৃশ্যমান পেশা কৃষি। তবে তার আড়ালে কয়েক বছর ধরে অস্ত্র কেনাবেচায় যুক্ত তিনি। আরব আলীর কাছ থেকে এ অস্ত্র কিনে নেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের মৃত আব্দুল জলিলের ছেলে আব্দুল শহীদ ও একই থানার ঘোষগাঁওয়ের আনছার মিয়া। শহীদ ও আনছারের কাছ থেকে হাতবদল হয়ে অস্ত্র যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের বাসিন্দা দোলন মিয়া ও আমিন মিয়ার কাছে। তারা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পেশাদার সন্ত্রাসীদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করেন।

গ্রেফতার তিনজন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানান, আরব আলীর কাছ থেকে প্রতিটি রিভলবার ২০-২৫ হাজার টাকায় কেনেন আনছার ও শহীদ। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দোলন ও আমিনের কাছে প্রতিটি বিক্রি করেন ৪০-৫০ হাজার টাকায়। তারা পেশাদার সন্ত্রাসীদের কাছে প্রতিটি অস্ত্র ৬৫-৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশি সন্ত্রাসীদের টার্গেট করেই অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে। পাহাড়ের গহিন জঙ্গলে এসব অস্ত্র কারবারিরা আত্মগোপনে থাকেন। লোকাল প্রযুক্তিতে এসব অস্ত্র তৈরি করা হলেও তার গায়ে লেখা থাকে 'ইউএসএ'। সিলেটের ওই রুট ব্যবহার করে মাসে অন্তত দুটি চালান আসত। একেকটি চালানে ৩-৫টি অস্ত্র ছিল। অস্ত্রের ওই চালানের সঙ্গে যুক্ত আব্দুল শহীদ সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি ও আনছার একই উপজেলার যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। শহীদ এক সময় পাথরের ব্যবসা করতেন। ব্যবসা মন্দা হওয়ায় অবৈধ অস্ত্রের কারবারে জড়িয়ে পড়েন। আর অস্ত্র সিন্ডিকেটের সদস্য আমিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে বিভিন্ন যানবাহন থেকে নিয়মিত মাসোহারা তুলে থাকেন। তার সহযোগী দোলন। তার দৃশ্যমান পেশা অটোরিকশা চালনা।

গ্রেফতাররা পুলিশকে জানান, সীমান্ত হাটের দিন উভয় দেশের সীমান্তে নিরাপত্তায় কিছুটা ঢিলেঢালা ভাব থাকে। এই সুযোগ ব্যবহার করে মাদক ও অস্ত্র কারবারিরা। বিছনাকান্দির আরব আলী প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করেন। অস্ত্র কারবারে যুক্ত হলেও তিনি কখনও শহরে আসতেন না।

পুলিশ সূত্র বলছে, পেশাদার সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কাছে পিস্তলের চেয়ে রিভলবার বেশি পছন্দ। কারণ পিস্তল ব্যবহার করে গুলি করলে অনেক সময় তা ম্যাগাজিনে আটকে যায়। পরে আবার গুলি করতে হলে কয়েক মিনিট সময় লাগে। তবে রিভলবারে একটি গুলি ব্যর্থ হলে পরেরটি সময়ক্ষেপণ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বের হয়ে যায়। দেশের ব্যবহূত রিভলবারের ৯৯ শতাংশ ৬ চেম্বারের। তবে এর আগে ডা. জাহিদুল আলম কাদির নামে ময়মনসিংহ থেকে গ্রেফতার একজনের কাছে ৮ চেম্বারের রিভলবার পাওয়া যায়। কিশোরগঞ্জের একটি লেদ মেশিনে বিশেষ অর্ডার দিয়ে ওই রিভলবার তৈরি করা হয়েছিল। জানা গেছে, দেশে লাইসেন্স করার অস্ত্র হলো পয়েন্ট ২২, পয়েন্ট ৩২ ও সেভেন পয়েন্ট ৬৫ বোরের। পয়েন্ট ২২ বোরের অস্ত্রের গুলি পাওয়া সহজ ও দাম কম। তাই পয়েন্ট ২২ বোরের অস্ত্রের চাহিদা বেশি।

দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, সম্প্রতি অবৈধ অস্ত্রের হাতবদলের ঘটনা বেড়েছে। এর আগে গত জুলাইয়ে ওয়ারী থেকে একে-২২ অটোম্যাটিক রাইফেলসহ দু'জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ভারত থেকে আসা অস্ত্রটি কয়েকটি হাত ঘুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়ার কথা ছিল। কুমিল্লার এক জামায়াত নেতা ওই অস্ত্র কিনতে অর্থায়ন করেছিলেন। ওই জামায়াত নেতা এর আগেও একবার কুমিল্লায় র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন। এছাড়া বোমা বানাতে গিয়ে তার হাতের আঙুলও উড়ে যায়। তার বিরুদ্ধে অন্তত দশটি মামলা রয়েছে। ওই জামায়াত নেতাকে খোঁজা হচ্ছে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, অবৈধ অস্ত্রের কারবারিদের নতুন রুটের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের বের করার চেষ্টা চলছে। একে-২২ জব্দ করার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন গোয়েন্দারা। কারণ ২০১৬ সালে হলি আর্টিসানে হামলা, নারায়ণগঞ্জে নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর আস্তানা, বগুড়া ও রংপুর থেকে একই ধরনের ভারী অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল। তবে তা অটোম্যাটিক রাইফেল ছিল না।

বৃহস্পতিবারের গ্রেফতার অভিযানে ছিল সিটিটিসির স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের আর্মস এনফোর্সমেন্ট টিম। অ্যাকশন গ্রুপের ডিসি ছানোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, অস্ত্র কারবারিদের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দু'জন রয়েছে। চাইলে তারা আখাউড়া রুট ব্যবহার করে অস্ত্র আনার চেষ্টা করতে পারতেন। আগে যেসব রুট দিয়ে দেশে অস্ত্র ঢুকত, সেখানে নজরদারি থাকায় অস্ত্র কারবারিরা নতুন রুট খুঁজে বের করেছেন।

স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের এডিসি জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, এই প্রথম ১২ চেম্বারের অত্যাধুনিক রিভলবার জব্দ করা হয়েছে। যে রুট ব্যবহার করে অস্ত্র আসছিল সেটি একেবারে নতুন। অস্ত্র কারবারিরা এই রুট ব্যবহার করছেন তা আগে জানা ছিল না। এ চক্রের অন্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।