জি কে শামীম ও খালেদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০১৯     আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

শামীম (বায়ে) ও খালেদ

অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন জি কে বিল্ডার্সের মালিক ও যুবলীগ নেতা এসএম গোলাম কিবরিয়া শামীম এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। 

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। এর মধ্যে শামীম অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ তার মা আয়েশা আক্তারের নামে রেখে নিজের মাকেও কলঙ্কিত করেছেন।

দুদকের অনুসন্ধানে শামীম ও তার মায়ের নামে ২৯৭ কোটি আট লাখ ৯৯ হাজার ৫৫১ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। খালেদ মাহমুদের নামে পাওয়া যায় পাঁচ কোটি ৫৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৯ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ।

গত রোববার ওই তিনজনের বিরুদ্ধে দুটি মামলার অনুমোদন দেয় কমিশন। এদিনই মামলার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ মামলা করার কথা থাকলেও বিশেষ কারণে তা হয়নি।

জানা গেছে, সোমবার দুদক উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বাদী হয়ে ২৯৭ কোটি আট লাখ ৯৯ হাজার ৫৫১ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে জি কে শামীম, তার মা আয়েশা আক্তারের বিরুদ্ধে ১০ নম্বর মামলাটি করেন। উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে পাঁচ কোটি ৫৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৯ টাকার অবেধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে খালেদ মাহমুদের বিরুদ্ধে ৯ নম্বর মামলা দায়ের করেন।

বেআইনি ক্যাসিনো ব্যবসার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হয় গত মাসের মাঝামাঝিতে। ওই অভিযানের পরপরই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। এই ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত অর্ধশতাধিক ব্যক্তির নাম রয়েছে দুদকের তালিকায়। ওই তালিকা থেকে গতকাল প্রথম মামলা করা হলো শামীম ও খালেদ মাহমুদের নামে।

জি কে শামীমের নামে অবৈধ সম্পদ: এজাহারে বলা হয়, ক্যাসিনো ব্যবসায়ী শামীম সর্বশেষ ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে ৫০ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। এর মধ্যে ৪০ কোটি ২১ হাজার ৪০ হাজার ৭৪৪ টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য তিনি তার আয়কর নথিতে প্রদর্শন করেছেন। বাকি ৯ কোটি ৭৮ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬ টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য তিনি আয়কর নথিতে উল্লেখ করেননি। অনুসন্ধানে ৫০ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি।

একই অর্থবছরে শামীম তার আয়কর নথিতে ৩৮ কোটি ৬৯ লাখ এক হাজার ৮৯ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্যে ব্যবসার মূলধন বাবদ ২০ কোটি ৫৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৩৮ টাকা, জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ নয় কোটি ৮০ লাখ টাকা, এফডিআর চার কোটি ৭৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৮১ টাকার, গাড়ি ক্রয় করা হয়েছে এক কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। অনুসন্ধানে তার নামে থাকা এই টাকার বৈধ উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এজাহারে বলা হয়, শামীমের মালিকানাধীন জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের নামে ৪৩ কোটি ৫৭ লাখ ৪০ হাজার ৮৩২ টাকার সম্পদ পাওয়া যায়। এই কোম্পানিতে তার নামে ৮০ শতাংশ ও মায়ের নামে ২০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। অনুসন্ধানে তার মায়ের নামে আয়ের কোনো উৎস পাওয়া যায়নি। শামীমের অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ কোম্পানিতে তার মায়ের নামে দেখিয়েছেন। কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা মোট টাকার বৈধ উৎস নেই।

সম্পতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে শামীমের অর্থসম্পদ জব্দ করা হয়। এর মধ্যে নগদ এক কোটি ৮১ লাখ ২৮ হাজার টাকা ও ৯ হাজার মার্কিন ডলার। অভিযানে একাধিক ব্যাংকে শামীমের মায়ের নামে ১৬৫ কোটি ২৭ লাখ ৬৫ টাকার বিপরীতে ১০টি এফডিআরের নথিপত্র জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ট্রাস্ট ব্যাংক নারায়ণগঞ্জ শাখায় ২৫ কোটি টাকা করে চারটি এফডিআর, ২৭ লাখ ৬৫ টাকার এফডিআর, ট্রাস্ট ব্যাংক কেরানীগঞ্জ শাখায় ২৫ কোটি টাকার এফডিআর, শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংক মহাখালী শাখায় তার মায়ের নামে ১০ কোটি টাকা করে চারটি এফডিআর রয়েছে।

ওই ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরের তথ্য অভিযোগ সংশ্লিষ্ট শামীম ও তার মা আয়েশা আক্তারের ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক আয়কর নথিতে প্রদর্শিত হয়নি। প্রকৃতপক্ষে এফডিআরের বর্ণিত ১৬৫ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জিত, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ। অন্যদিকে তার মা আয়েশা আক্তার জেনেশুনে ছেলে শামীম কর্তৃক অবৈধ উপায়ে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ১৬৫ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও দখলে সহায়তা প্রদান করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে দুদক আইন-২০০৪-এর ২৭(১) ধারা ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে, যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার নামে অবৈধ সম্পদ: এজাহারে বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা ও ক্যাসিনো ব্যবসায়ী খালেদ মাহমুদের নামে পাঁচ কোটি ৫৮ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৯ টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে তার আয়কর নথিতে মোট এক কোটি ৬৬ লাখ ১০ হাজার ৮০ টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেছেন। অনুসন্ধানে তার নামে চার কোটি ৫০ লাখ টাকার সম্পদের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ মেলে। বাকি দুই কোটি ৮৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯২০ টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়নি। তার নামে থাকা চার কোটি ৫০ লাখ টাকার সম্পদের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি।

খালেদ মাহমুদ একই অর্থবছরে তার আয়কর নথিতে মোট এক কোটি ৩২ লাখ ৭৬ হাজার ৭০৯ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে তার ব্যবসার মূলধন বাবদ ৯০ কোটি ১৬ লাখ ৭০৯ টাকা অর্জনের স্বপক্ষে বৈধ কোনো উৎস পাওয়া যায়নি।

এজাহারে বলা হয়, খালেদ মাহমুদ আয়কর নথি অনুযায়ী তিনি মেসার্স অর্পণ প্রোপার্টিজ ও ঢাকার ঠিকানায় রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করছেন। তার আয়কর নথিতে ওই ব্যবসা সম্পর্কিত কোনো হিসাব উল্লেখ করা হয়নি।

সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তার কাছ থেকে ১০ লাখ ৩৪ হাজার ৫৫০ টাকা ও বাংলাদেশি মুদ্রামানে সাত লাখ ৬৪ হাজার ৬০০ টাকার সিঙ্গাপুর ডলার, সৌদি রিয়াল, ভারতীয় রুপি, মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত, দুবাই দিরহাম ও থাইল্যান্ডের বাথ জব্দ করা হয়। ওইসব অর্থ অবৈধভাবে অর্জিত বলে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে দুদক আইন-২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় ওই মামলা করা হয়।